প্রিন্স চার্লস ও বৃটিশ সিংহাসন

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৫
বৃটিশ রাজসিংহাসনের উত্তরসূরী হিসাবে বিবেচিত প্রিন্স চার্লস নাকি রাজত্বের ‘কারাগারে’ বন্দী হইতে অনিচ্ছুক আর এই খবরটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী টাইম-এ প্রিন্স চার্লসের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজনের বরাত দিয়া প্রকাশিত হইয়াছে। যুক্তরাজ্যের বা বৃটিশ সিংহাসনের আইনানুগ উত্তরাধিকারী হিসাবে প্রিন্স চার্লসের নামটিই যে সর্বাগ্র-গণ্য ইহাতে সন্দেহ কী! এইক্ষেত্রে প্রথা মতো রাজা বা রাণীর জ্যেষ্ঠ সন্তানই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী বা ন্যায্য দাবিদার হিসাবে স্বীকৃত হইয়া আসিতেছে। তবে প্রিন্স চার্লসকে লইয়া তদীয় মাতা ও বর্তমান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং বৃটিশ রাজপরিবারের মধ্যে নানা রকম টানাপড়েনের সংবাদ বিগত অনেকগুলি বত্সর ধরিয়াই পত্র-পত্রিকা মারফত বিশ্বে চাউর রহিয়াছে। ফলে রাজসিংহাসন অধিকারের দাবি তাহার ক্ষেত্রে অনেকটা গৌণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে বলিয়াই সংশ্লিষ্ট সকলে মনে করিয়া থাকে। প্রিন্সেস ডায়ানার কিংবা আরও কতিপয় নারীর সহিত চার্লসের সম্পর্ককে কেন্দ্র করিয়া তিনি খানিকটা সমালোচনার পাত্রও হইয়াছেন। সব কিছু মিলাইয়া বৃটেনের ভবিষ্যত্ রাজা হিসাবে চার্লসের সিংহাসন আরোহণের বিষয়টি ধোঁয়াশা হইয়াই রহিয়াছে। ঠিক এমনই এক সময়ে টাইম সাময়িকীতে প্রকাশিত খবরটি যে খানিক কৌতূহল সৃষ্টি করিবে ইহাতে আর বিচিত্র কী! খবরটি যদি সত্য হইয়া থাকে তাহা হইলে প্রিন্স চার্লসের এই মনোভাবকে অযৌক্তিক মনে করার কোন কারণ নাই। কেননা, শুধু বৃটিশ সিংহাসনেরই নহে বিশ্বে রাজ-রাজড়াদের ইতিহাসে এমন অনেক রাজা ও রাজপুত্র বা যুবরাজের দেখা পাওয়া যায় যাহারা রাজতন্ত্রের নিয়ম বিধি-বিধান প্রথা ইত্যাদি সব পালন করিতে গিয়া এমনই হাফাইয়া উঠিয়াছেন যে কোন এক পর্যায়ে এই বন্দিত্ব হইতে মুক্তির জন্য আকুল হইয়া রাজ্যভার অন্যের উপর ন্যস্ত করিতেও দ্বিধা করেন নাই। এই ধরনের বিষয়কে অবলম্বন করিয়া চমত্কার সব চলচ্চিত্র, নাটক, নভেল ইত্যাদিও কম রচিত হয় নাই। হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র রোমান হলিডে’র কথা এইক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মর্তব্য। সেইখানে এক প্রিন্সেস রাজকীয় সব আচার-অনুষ্ঠান আর নিয়ম-শৃঙ্খলার লৌহ-কঠিন বন্ধন হইতে মুক্তির জন্য কী অভিনব কাণ্ডই না করিয়া বসিয়াছিলেন, আবার মার্ক টোয়েনের সেই সুবিখ্যাত উপন্যাস ‘প্রিন্স এ্যান্ড পপার’ এর কথাও নিশ্চয়ই বিস্মৃত হইবার নহে! অবিশ্যি এই উপন্যাসে প্রকৃত প্রিন্সের শৃঙ্খলিত জীবন হইতে মুক্তির আকুলতা প্রকৃত পপারকে প্রিন্সরূপে অধিষ্ঠিত হইবার সুযোগ আনিয়া দিয়াছে। তথাপি, এইখানে রাজকীয় বিভা-বৈভব আর আনুষ্ঠানিক বাধ্য-বাধকতায় হয়রান যুবার মুক্ত-স্বাধীন জীবনের প্রতি ব্যাকুলতা ঔপন্যাসিক আশ্চর্য নিপুণতায় ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। এইসব কাহিনী চিত্রে, নাট্যে বা উপন্যাসে মানুষের মুক্ত স্বাধীন জীবনের প্রতি অপার আগ্রহের কথাই ফুটিয়া উঠিয়াছে। বিশ্বে রাজ-রাজড়াদের ইতিহাস, সেতো যুদ্ধ-বিগ্রহ আর নিষ্ঠুর-নির্মমতায় সিংহাসন বা রাজ্য দখলের ইতিহাস মাত্র! বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে রাজতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হইয়া এই বিশ্বের অগণিত মানুষের জীবন দাস, সেবাদাস, ক্রীতদাস কিংবা রাজার অনুগত প্রজারূপে নিষ্পেষণ ও শোষণের খোরাক হইয়াছে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাই বুর্জোয়াতন্ত্রের উত্পত্তি এবং বিকাশের যুগে ক্ষোভের অনল জ্বলিয়া উঠিয়াছে। ‘কিং ক্যান ডু নো রং’ এই বলদর্পী অহংকার বৃটেনে প্রজাতন্ত্রের দাবি লইয়া আগুয়ান ক্রোমওয়েলের আন্দোলনে মিসমার হইয়া এক সময় রাজা প্রথম চার্লসকে ফাঁসির রজ্জু পরাইয়াছে। কিন্তু রাজতন্ত্রের পুনঃ উত্থান ঘটিয়াছে আবার ক্রোমওয়েলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়া। অন্যদিকে প্রেমাষ্পদের পাণি গ্রহণের প্রবল তাড়না হইতে মুক্ত হইতে না পারিয়া প্রিন্স চার্লসেরই মাতামহের ভ্রাতা অষ্টম এডোয়ার্ড তাহার নীল রক্তের আভিজাত্য ত্যাগ করিয়া ইতিহাস হইয়া রহিয়াছে। এতকিছুর পরও রাজতন্ত্রের ঐতিহ্যকে বৃটেনরা কিছুতেই পরিহার করিতে চাহে নাই। রাজতন্ত্রের ঐতিহ্যের মধ্যেই বৃটেনের অধিবাসীরা অন্তত তাহার স্মৃতির বা ইতিহাসের পথ বাহিয়া সেই বৃটিশ সাম্রাজ্যের কথা স্মরণে আনিয়া গৌরব বোধ করিতে চাহে যে বৃটিশ সাম্রাজ্যে একদিন সূর্য অস্ত যাইতো না। এমতাবস্থায় এমন ঐতিহ্যিক আভিজাত্য পরিহার করিতে চার্লসের আজ কেন এই অনাগ্রহ উহা স্পষ্ট হইতে আরও কিছু সময়ের প্রয়োজন পড়িবে নিশ্চয়ই!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন