মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইউরোপের বিভিন্ন মিত্র দেশে ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ অব্যাহত রহিয়াছে। সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি জাতীয় নেতাদের ব্যক্তিগত ফোনেও আড়ি পাতা ও গুপ্তচরবৃত্তির বিরুদ্ধে এখন তুমুল সমালোচনা চলিতেছে। বিভিন্ন স্থানে চলিতেছে বিক্ষোভও। কয়েকদিন আগে খোদ ওয়াশিংটনের ক্যাপিটাল হিলে বিক্ষোভ মিছিল হইয়াছে। প্রতিবাদকারীরা যুৃক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) নজরদারির প্রকৃতি ও ব্যাপকতা নিয়া প্রশ্ন তুলিয়াছে। কেননা ইহা ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়া বলিয়াছে যে, মিত্র দেশের ওপর গোপন নজরদারি করা কোন দেশেরই উচিত নহে। এইজন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধানকে শীঘ্রই কংগ্রেসের মুখোমুখি দাঁড় করানো হইতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অন্তত ইউরোপের মিত্র দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের ফোনে আড়ি পাতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করিতে পারেন।
সমপ্রতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রানসিস হোল্যান্ড ও জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের টেলিফোন আলাপ ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ওঠে। ইহাছাড়া একমাসেই এনএসএ স্পেনের ছয় কোটি নাগরিকের ফোনে আড়ি পাতিয়াছে এমন খবরও প্রকাশিত হইয়াছে গণমাধ্যমে। তাহাদের ফোনকল, এসএমএস ও ই-মেইল বার্তার ওপর নজরদারি করা হয়। অবশ্য এইসব অভিযোগের উত্স সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেনের দেওয়া নথি। তিনি অনেক গুপ্তচরবৃত্তির তথ্য ফাঁস করিয়া বর্তমানে নিজ দেশের রোষানলে পড়িয়াছেন এবং একরকম ফেরারি জীবন যাপন করিতেছেন। ইহার আগে মার্কিন কূটনীতিকদের গোপন তারবার্তা ফাঁসের অভিযোগে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জের ভাগ্যেও অনুরূপ পরিণতি ঘটে। ইহার পশ্চাতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনুঘটকের কাজ করিয়াছে নিশ্চয়ই। ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী ৩৫ জন ইউরোপীয় নেতার ফোনে আড়ি পাতা হইয়াছে। বিশেষ করিয়া অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের মোবাইল ফোনে আড়ি পাতার বিষয়টি অতি তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা বর্তমানে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী নারী রাজনীতিকও বটে। অথচ ২০০৫ সালে জার্মান চ্যান্সেলর নির্বাচিত হওয়ার তিন বত্সর আগে হইতে তাহার ফোনে আড়ি পাতা হইতেছে যাহা অনেকের নিকট বিস্ময়করও বটে।
এই প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮ জন নেতা সমপ্রতি এক যৌথ বিবৃতি দিয়াছেন। সেইখানে দেখা যাইতেছে, তাহারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়নের ওপরই জোর দিয়াছেন। ফ্রান্স ও জার্মানি যাহাতে আমেরিকার সহিত দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনা শুরু করে তাহার তাগিদ দিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলি আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। অথচ সন্ত্রাসবাদের অর্থ জোগানোর তথ্য বিনিময়ের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি হওয়ার বিষয়টি ঝুলিয়া আছে। তাহাছাড়া আগামী বত্সর মে মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। এই প্রেক্ষিতে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটেন চাহিতেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডাটা প্রটেকশন রুলস দ্রুত অনুমোদন করুক। ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগগুলি এমন মোক্ষম সময়েই করা হইতেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি এশিয়ার দেশসমূহের দিকে কেন্দ্রীভূত হইয়াছে। ইউরোপের সঙ্গে একপ্রকার আস্থার সংকট দেখা দেওয়ার কারণ ইহাও হইতে পারে। তবে আমেরিকার এখনও আন্তআটলান্টিকের শক্তিশালী অংশীদারদের একান্ত দরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল হইতে জার্মানি-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বিকশিত হইয়াছে। অবশ্য অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এই ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ জানাইবেন না। আসলে গুপ্তচরবৃত্তি পৃথিবীর আদিকাল হইতেই চলিয়া আসিতেছে। ফোনে আড়িপাতা তাহার আধুনিক সংস্করণ মাত্র। ভবিষ্যতেও শক্তিশালী দেশগুলি নিজেদের স্বার্থে মিত্র-অমিত্র সকলের ব্যাপারে বিভিন্ন বিষয়ে নিশ্চিত থাকিতে চাহিবে ইহাই স্বাভাবিক। এই ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের আইন প্রণেতা মাইক রজার্স মন্তব্য করিয়াছেন যে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা ও নাগরিকদের নিরাপদে রাখিবার চেষ্টার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সকলের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। বাস্তবতা আর কাহাকে বলে!
