পানিবন্দী জীবন যাপন করিয়া চলিয়াছেন সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বিশ হাজার পরিবারের কমপক্ষে আশি হাজার মানুষ। তিন মাস হইল পানিতেই তাহাদের বসবাস। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট সবখানেই পানি। বানভাসি মানুষের কোনো কাজ নাই। ব্যবসায়-বাণিজ্য, চাষবাস সবই বন্ধ। মাঠের ফসল; আবদ্ধ জলে গিয়াছে তাহাও। লাটে উঠিতে বসিয়াছে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা। ঘরেঘরে অভাব। খাবার নাই অনেক পরিবারে। বোধগম্য কারণেই, খাবার পানির সংকটও তীব্র। প্রায় তিনমাস ধরিয়া জমিয়া থাকা পানি যে ইতিমধ্যে পচিয়া বিষাক্ত হইয়া গিয়াছে, কোনো আক্কেলমন্দকে তাহা ব্যাখ্যা করিয়া বলিয়া বুঝাইবার প্রয়োজন পড়ে না। কার্তিকে সব নদী ও খালে যখন ভাটার টান, হৈমন্তি বাতাস যখন শীতের আমেজ লইয়া আসে তখনও পানিতে হাবুডুবু খাইতে হইবে, এমনটি এই এলাকার মানুষ কস্মিনকালেও ভাবেন নাই। যাহা ছিল কল্পনার অতীত তাহাই এখন ললাট লিখন হইয়া গিয়াছে যেন তাহাদের। তালাবাসীর অভিযোগ কপোতাক্ষ নদ হাজিয়া-মজিয়া যাইবার কারণেই তাহাদের জীবনে নামিয়া আসিয়াছে এই অভিশাপ। জানা যায় তালা উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি বলিতে গেলে সম্পূর্ণ পানিতে ডুবিয়া রহিয়াছে। বাকিগুলিও অংশত জলেডোবা।
দেশের আরও অনেক এলাকায় বিশেষ করিয়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট। সব জায়গায় জলাবদ্ধতার প্রকৃতি অবশ্য একরকম নহে। কেথাও মাসের পর মাস মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। কোনো এলাকায় সামান্য বৃষ্টিপাতে পানিতে সয়লাব হইয়া যায় পুরো এলাকা। চলতি সপ্তাহে এইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে বরিশাল ও পিরোজপুর জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলায়। টানা বর্ষণ এবং নিম্নচাপের প্রভাবে সাগরের পানি ফুলিয়া উঠিলে এই দুইটি জেলার বিভিন্ন জনপদে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একই রকমের খবর পাওয়া গিয়াছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা হইতেও।
প্রশ্ন হইল কেন, কেমন করিয়া সাংবাত্সরিক এই জলাবদ্ধতার সমস্যা সৃষ্টি হয়! সমস্যাটি কিন্তু একদিনে কিংবা হঠাত্ করিয়া দেখা দেয় নাই। জলাবদ্ধতার প্রধান কারণটি আমাদের অজানা নহে। বাংলাদেশের ছোট বড় নদী ও খালসমূহ নিঃশেষিত হইয়া যাইবার পরিপ্রেক্ষিতে বান-বর্ষা, বৃষ্টিপাত এবং জোয়ারের পানিতে জনপদ জলমগ্ন হইয়া যাইবার পর পানি আর নামিয়া যাইতে পারে না। পরিণামে জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগ অনিবার্য হইয়া দেখা দেয়। সমস্যাটিকে আরও প্রকট করিয়াছে প্রয়োজনে এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনেও পরিকল্পনাহীন ভাবে রাস্তা- বাঁধ নির্মাণ। কর্মসৃজন প্রকল্প, কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা টাকা কর্মসূচি কিংবা টেস্ট রিলিফের গম-চাউল দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তত্ত্বাবধানে পল্লী অঞ্চলে রাস্তা, বাঁধ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে গৃহীত এইসব প্রকল্প বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হইয়া থাকে অপরিকল্পিত। এইসব অপরিকল্পিত রাস্তার কারণে বহু স্থানে পানি নামিয়া যাইবার খাল কিংবা নালার মুখ বন্ধ হইয়া গিয়াছে। যেইখানে কালভার্ট বা স্লুইসগেট বসাইবার কথা সেইখানে তাহা হয় নাই। আবার স্লুইসগেট থাকিলেও উহা অচল হইয়া গিয়াছে। এইসব কারণে জলাবদ্ধতার সমস্যা তীব্রতর হইয়াছে।
এই বাস্তবতায় আমাদের বক্তব্য হইল, নদী খনন স্থানীয়ভাবে সম্ভব নহে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে যাহা সম্ভব তাহা এই যে, ইউনিয়ন পরিষদ যেই সব রাস্তাঘাট নির্মাণ করে সেইগুলি সুপরিকল্পিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেখানে সেখানে ছোট রাস্তা না বানাইয়া বত্সরে একটি ইউনিয়নে যদি সঠিক পরিকল্পনা মাফিক একটি রাস্তাও সম্পূর্ণ নির্মাণ করিতে পারা যায়, তবে তাহা হইবে শ্রেয়তর। রিলিফ বা কাবিখার টাকা দিয়া যেখানে প্রয়োজন সেখানে খালও খনন করা অসম্ভব নহে। কালভার্টও নির্মাণ করা হয়তো কঠিন হইবে না। এই জন্য দরকার দূরদৃষ্টি ও যথাযথ পরিকল্পনা। বিষয়টির প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট সকল মহলের কার্যকর দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
