রাজনৈতিক সহিংসতায় গত পাঁচদিনে প্রাণ হারাইয়াছেন ২১ জন। আহত হইয়াছেন সহস্রাধিক ব্যক্তি। সেই সাথে অপরিমেয় আর্থিক ক্ষতি, সম্পদহানি এবং অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগ তো আছেই। চিত্রটি শুধু ২৫ হইতে ২৯ অক্টোবরের। গত বুধবার ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় এই পাঁচদিনের ক্ষয়ক্ষতির বিশদ বিবরণ তুলিয়া ধরা হইয়াছে। তাহা পাঠ করিয়া জনমনে বিরাজমান উদ্বেগের মাত্রা নিঃসন্দেহে আরও বৃদ্ধি পাইবে। সেই সাথে ভুক্তভোগী জনগণ নূতন করিয়া ক্ষতবিক্ষত হইবেন অসহায়ত্বের চাবুকে। কারণ তাহারা ভালো করিয়াই জানেন যে, তাহাদের শত আহাজারি কিংবা আবেদন-নিবেদনেও পরিস্থিতির কোনো হেরফের হইবে না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ইতিমধ্যে দেশিবিদেশি নানা মহল হইতে অজস্র উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা ব্যক্ত করা হইয়াছে। দেওয়া হইয়াছে বিস্তর সুপরামর্শ। কিন্তু তাহাতেও কোনো কাজ হয় নাই। সর্বোপরি, আছে নিকট অতীতের ভয়াবহ তিক্ত অভিজ্ঞতাও। তবু শান্তি ও সমঝোতার পথ এখনও উপেক্ষার অন্ধকারে ঢাকা পড়িয়া আছে। অন্যদিকে অশান্তি, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার মাত্রা যে দিনদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০১৩ সালেই রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হইয়াছে ২৫৯ জন। তন্মধ্যে বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলির সম্ভাবনাময় অনেক নেতাকর্মী যেমন আছেন, তেমনি রহিয়াছেন নিরীহ নিরপরাধ বহু সাধারণ মানুষও— যাহাদের সাথে রাজনীতির দূরতম সম্পর্কও ছিল না। পেটের দায়ে ঘরের বাহির হইয়া অসহায়ভাবে প্রাণ হারাইতে হইয়াছে এইসব হতদরিদ্র মানুষকে। উপার্জনক্ষম একমাত্র সদস্যটিকে হারাইয়া এইভাবে কতো পরিবার যে পথে বসিতেছে সেই খবর কেহ না রাখিলেও সংবাদপত্রে প্রায়শ ছাপা হইতেছে সেইসব মর্মস্পর্শী সংবাদ। কিন্তু তাহা বিদ্যমান অসহিষ্ণুতার রাজনীতির অচলায়তনে সামান্য আঁচড় কাটিতেও সক্ষম হইতেছে না।
অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, আপাতত কোথাও কোনো আশা দেখা যাইতেছে না। বরং আসন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করিয়া পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কাই প্রবল হইতে প্রবলতর হইতেছে। সান্ত্বনা শুধু এইটুকু যে গণতন্ত্রের পথ মসৃণ নহে। বিশ্বের সুপ্রতিষ্ঠিত বহু গণতন্ত্রকেও বর্তমান অবস্থায় আসিবার জন্য দীর্ঘ রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছে। সেই তুলনায় আমাদের গণতন্ত্র বয়সে নবীন। পারিপার্শ্বিক অবস্থাও খুব একটা অনুকূল নহে। এইসব যুক্তি দেখাইয়া আমরা বলিতে পারি যে, নানা বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও গণতন্ত্র যে এখনও টিকিয়া আছে ইহাই বা কম কী! তবে নিকট অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, আত্মতুষ্টিতে ভুগিবার কোনো অবকাশ নাই। এখনই সতর্ক না হইলে সকল অর্জন বিফলে যাইতে পারে। মনে রাখিতে হইবে যে সহিংসতা কোনো সমাধান নহে। গণতন্ত্র ও সহিংসতা কখনোই একসাথে চলিতে পারে না। সংঘাত কেবল অধিকতর সংঘাতকেই অনিবার্য করিয়া তোলে। আর একবার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দুষ্টচক্রে জড়াইয়া পড়িলে তাহার পরিণতি কতোটা ভয়াবহ হইতে পারে তাহার অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই আছে। নগর পুড়িলে যে দেবালয়ও রক্ষা পায় না— তাহাও কোনো নূতন কথা নহে। আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিকগণও বিষয়টি ভালো করিয়াই জানেন। বিভিন্ন সময়ে তাহারা নিজেরাও ইহার মারাত্মক কুফল ভোগ করিয়াছেন। সর্বোপরি, বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও দরিদ্র একটি দেশের পক্ষে অব্যাহত রাজনৈতিক সহিংসতার দায়ভার বহন করা যে কোনোভাবেই সম্ভব নহে— তাহাও তাহাদের অজানা নহে। অতএব, তাহাদের কোনো প্রকার পরামর্শ দেওয়ার স্পর্ধা যেমন আমাদের নাই, তেমনি তাহা আমাদের অভিপ্রায়ও নহে। আমরা শুধু এইটুকু বলিতে পারি যে জীবন ও সম্পদের এই মর্মান্তিক অপচয় অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার এবং তাহা যতো তাড়াতাড়ি হয় ততোই মঙ্গল।
