পাকিস্তানে ড্রোন হামলা বন্ধ হইবে কী?

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০১
প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফের সদ্য-সমাপ্ত যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে পাকিস্তানের মাটিতে মার্কিন ড্রোন হামলার বিপক্ষে নানামুখী কথাবার্তা হইয়াছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ড্রোন হামলাকে যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করিবার সম্ভাব্যতার কথা ব্যক্ত করিয়াছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সহিত আলাপকালে ড্রোন হামলা বন্ধ করিবার উপরে গুরুত্ব আরোপ করিবার কথা জানাইয়াছেন নেওয়াজ শরীফ। এতদসত্ত্বেও ড্রোন হামলা বন্ধ হইবে কিনা তাহা এতটুকু স্পষ্ট হইতেছে না। বিশেষ করিয়া দুই নেতার সাক্ষাত্অন্তে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে হরেক বিষয়ে আলোচনা থাকিলেও ড্রোন হামলার বিষয়ে কোন ধরনের উল্লেখ না থাকাটাই ড্রোন হামলা বন্ধের সম্ভাব্যতাকে অস্পষ্ট করিয়া তুলিয়াছে। হিসাব মতে, ২০০৪ সন হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ড্রোন হামলাতে প্রাণ হারাইয়াছেন আড়াই হইতে সাড়ে তিন হাজার পাকিস্তানী যাহাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের শাসনামল ও পরবর্তীতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) আমলে ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে পাক কর্তৃপক্ষ সময়ে সময়ে কথাবার্তা বলিয়াছে বটে কিন্তু তাহাতে কোন ফলোদয় হয় নাই। সময়ের পরিক্রমাতে ড্রোন হামলার বিষয়টি পাক-রাজনীতিতে সরকার বিরোধিতার অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হইয়াছে। গত নির্বাচনে পিপিপিকে হারাইতে শরীফের মুসলিম লীগসহ সকল বিরোধীরাই এই হাতিয়ার ব্যবহার করিয়াছিল। নির্বাচনে জিতিলে শরীফ ড্রোন হামলা বন্ধ করাইবার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে অঙ্গীকার পূরণের কোন নিশানা তৈয়ার করিতে পারিয়াছিলেন বলিয়া মনে হইতেছে না। ইসলামাবাদে থাকিতেই ওয়াশিংটন ডিসিতে পৌঁছিয়া ড্রোন বিষয়ে শোরগোল তুলিবেন বলিয়া জানান দিয়াছিলেন শরীফ। তদস্থলে হাজির হইয়া একই কথা বলিয়াছেন। ওবামার সহিত একান্ত আলোচনাতেও এই প্রসঙ্গটি আনিবার কথা সাংবাদিকদের জানিয়াইছেন পাক প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইতেছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, ড্রোন বিষয়ে গত মে মাসে ওবামার বক্তব্যের পর হইতে হামলার সংখ্যা কমিয়া আসিলেও, বহুকথিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে এই উপায়টি অবলম্বন বন্ধ করিয়া দেওয়ার ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসন এখন অবধি কোন সিদ্ধান্ত লয় নাই। আর এই কারণেই দুই নেতার যৌথ বিবৃতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নিরবচ্ছিন্ন অংশীদারিত্ব, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদবিরোধিতা, পরমাণু অস্ত্র নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতার মত বিষয় উল্লেখিত হইলেও ড্রোন হামলা প্রসঙ্গে একটি শব্দও স্থান পায় নাই। তবে ড্রোন হামলা বন্ধ না হইবার জন্য এককভাবে মার্কিন প্রশাসনকে দূষিতে অনিচ্ছুক কিছু বিশ্লেষক মনে করেন রাজনৈতিক কারণে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করিলেও পাকিস্তানের রাজনীতিক নেতৃত্ব ও সামরিক কর্তৃপক্ষ গোপনে সময়ে সময়ে ড্রোন হামলার ব্যাপারে সম্মতি জানাইয়া আসিতেছে। প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টে এই বিষয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হইয়াছে বৃহস্পতিবার। পোস্ট দাবি করিয়াছে তাহাদের হস্তগত গোপন কাগজপত্র হইতে এই কথাই প্রমাণিত হইয়াছে যে, বিগত দিনের ড্রোন হামলাগুলির ব্যাপারে পাক কর্তৃপক্ষ অবগত ছিলেন, এমনকি তাহারা সম্মতিও দিয়াছিলেন। এই তথ্য যদি সত্য হইয়া থাকে তাহা হইলে পাকিস্তানে ড্রোন হামলা পুরাপুরি বন্ধ হইবার সম্ভাবনা পরাহত। ইহার অর্থ হইতেছে বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি অব্যাহত থাকা এবং এই হামলার বিরোধিতাকে পুঁজি করিয়া ক্রমশ দুর্বল হইতে থাকা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির স্থলে উগ্রবাদীদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি হওয়া।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন