[ রা জ নী তি ]

আলোচনা হবে তো?

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০১
দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং তাদের নিজ নিজ দল ও পরিবারের স্বার্থ রক্ষার্থে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার উচিত হবে আলোচনায় বসা ও আলোচনাকে সফল করা। এজন্য তাদের উভয়কে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে এসে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য সমাধানে উপনীত হতে হবে। অন্যথায় আমাদের নিকট অতীত বলে দেবে ঘটনা কোনদিকে মোড় নিতে পারে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট নিরসনের পরিবর্তে আরও ঘনীভূত হয়েছে। তবে আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২৬ অক্টোবর বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেন এবং ‘আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য’ তাকে ২৮ অক্টোবর গণভবনে আমন্ত্রণ জানান। আলোচনার তারিখ চূড়ান্ত না হলেও খালেদা জিয়া আলোচনায় যোগ দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে আলোচনার জন্য টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানানোর আগে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট সমাধানকল্পে ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন এবং সেই অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়ার জন্য বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের নাম দেবার আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের আমলে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তন আনা হয় তা হলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিলুপ্তি। ১৯৯৬ সালে মূলত তত্কালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দাবিতে বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল ও দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের বিধান প্রতিষ্ঠা চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালে যে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন তা একেবারে নতুন নয়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলের ফলে সৃষ্ট সংকট নিরসনের উপায় হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এর আগে ২০১২ সালের ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় বিএনপিও অংশগ্রহণ করতে পারবে। নির্বাচনের সময় সরকার গঠনে বিএনপি যদি অংশীদারিত্ব চায় সেটা দিতে পারি। সবাই মিলে আমরা নির্বাচন করতে পারি। একটা ছোট মন্ত্রিসভা করে ইলেকশন করতে পারি।’ বিরোধী দল প্রধানমন্ত্রীর ১৮ অক্টোবরের ভাষণে উল্লিখিত সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং ২২ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের জন্য একটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করেন। এই প্রস্তাব অনুযায়ী (ক) ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে ১০ জনকে নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে, (খ) ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল পাঁচজন করে নাম প্রস্তাব করবে? এবং (গ) সরকার ও বিরোধী দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন সম্মানিত নাগরিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত হবেন। প্রস্তাবিত আলোচনা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে কি না এবং হলে তা সফল হবে কি না এসব নিয়ে ইতিমধ্যে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে। সংশয়ের কারণগুলো হলো—এক. প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রস্তাবের মধ্যে অনেক বেশি দূরত্ব ও ব্যবধান এবং এই দুই প্রস্তাবকে ভিত্তি ধরে সমাধান খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। দুই. আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বিরোধ যতটা না দলীয়, তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক এবং পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী দুই নেত্রীর ফোন-আলাপের সময় তা প্রকাশ পেয়েছে। তিন. প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত তারিখে বিরোধী দলীয় নেত্রী আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত না হওয়ায় তিনি পুনরায় তাকে (বিরোধী দলীয় নেত্রীকে) আমন্ত্রণ জানাবেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা নতুন করে বিরোধী দলীয় নেত্রীকে আলোচনার জন্য আহবানের সম্ভাবনা ইতিমধ্যেই নাকচ করে দিয়েছেন। এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেছেন, সংলাপের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। অন্যথায় বুঝতে হবে এই বিষয়ে তাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা নেই। চার. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে তার দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতাদের নিয়ে আলোচনায় যোগ দিতে অনুরোধ জানিয়েছেন এবং তাদের একটি তালিকা চেয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মহাজোটের এক সভায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনায় বসার বিরোধিতা করা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি ছাড়া আলোচনায় যোগ দেয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাঁচ. কোনো কোনো পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট মোতাবেক বিএনপির একটি অংশ চায় না যে খালেদা জিয়া আলোচনার জন্য শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় বসুন এবং তারা তাকে আলোচনায় বসা থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। ছয়. আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার অতীতের আলোচনা যেমন ১৯৯৪ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও সরকারি দল বিএনপির মধ্যে আলোচনা, ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ভোটার তালিকায় ভুয়া ভোটার বাদ দেয়ার ইস্যু নিয়ে সংসদ ভবনে আওয়ামী লীগের তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল ও বিএনপির তত্কালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার মধ্যে আলোচনা সফল হয়নি। তাই প্রস্তাবিত আলোচনার সফলতা নিয়ে সন্দেহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। আলোচনা অনুষ্ঠানে এইসব প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও চলমান সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রীর মধ্যে আলোচনা হতেই হবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং শীর্ষ পর্যায়ে মুখোমুখি আলোচনা ছাড়া সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করছেন, শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার আগে উভয় দলের মহাসচিব/সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। এতে দুই দলের প্রধানদের মধ্যে আলোচনার ভিত তৈরি সহজ হবে এবং তা আলোচনা সফল করতে সহায়ক হবে। দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়াকে যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, জনগণের নিকট তা প্রশংসিত হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। অন্যদিকে আলোচনার জন্য ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ পাওয়ার পরেও ২৭ অক্টোবর সকাল হতে আহূত ৬০ ঘন্টার লাগাতার হরতাল প্রত্যাহার না করায় বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সমালোচিত হয়েছেন। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। খালেদা জিয়া অবশ্য হরতাল প্রত্যাহার করা সম্ভব না হওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যদি আগের দিন (২৫ অক্টোবর) ফোন করতেন এবং আশ্বাস দিতেন, তাহলে তিনি জোট নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে হরতাল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিতেন। কারণ এই হরতালের সিদ্ধান্ত তিনি একা নেননি। পুলিশের তাড়া খেয়ে জোট নেতারা আত্মগোপনে আছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের একত্র করে হরতাল প্রত্যাহারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব নয়। তাই ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টায় হরতাল কর্মসূচি শেষে যে কোনো সময় আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানালে তিনি প্রয়োজনীয় লোকদের নিয়ে আলোচনায় যোগ দেবেন। হরতাল প্রত্যাহার না করার যে যুক্তি দেখানো হোক, বিরোধী নেত্রীর উচিত হবে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে তার আলোচনায় যোগ দেয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়ে দেয়া এবং উভয়ের সুবিধাজনক তারিখ ও সময়ে যতটা সম্ভব শিগগির আলোচনায় বসা। তবে একইসঙ্গে আলোচনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগও নিতে হবে। সরকারের উচিত হবে বিরোধী দলকে দমনের সব কার্যক্রম বন্ধ করা। অন্যদিকে বিরোধী দলকে হরতাল, অবরোধ, সমাবেশসহ সকল প্রকার উস্কানিমূলক কার্যকলাপ হতে বিরত থাকতে হবে। সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং তাদের নিজ নিজ দল ও পরিবারের স্বার্থ রক্ষার্থে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার উচিত হবে আলোচনায় বসা ও আলোচনাকে সফল করা। এজন্য তাদের উভয়কে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে এসে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য সমাধানে উপনীত হতে হবে। অন্যথায় আমাদের নিকট অতীত বলে দেবে ঘটনা কোনদিকে মোড় নিতে পারে। এতে তাদের দল এবং তারা নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। লেখক :সাবেক সচিব E-mail:[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন