গত কয়েকদিনের হরতালে ক্ষয়-ক্ষতি হইয়াছে ব্যাপক। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী গত ৬০ ঘণ্টার হরতালে রাজধানীর অন্তত ২৪০টি স্পটে ৭২০টি হাতবোমা বা ককটেল বিস্ফোরিত হইয়াছে। ইহাতে শিশু, সাংবাদিক, পুলিশ, শ্রমজীবী মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মী হইতে শুরু করিয়া অনেকেই হতাহত হইয়াছেন। এইবার একাধিক মন্ত্রী, এমপি ও বিরোধী দলীয় নেতাদের বাসভবনেও ককটেল ছুঁড়িয়া মারা হইয়াছে। এমনকি বিচারপতি, সিইসি ও আইনজীবীদের টার্গেট করা হইয়াছে। এইসবই হরতালের নূতন ডাইমেনশন বা মাত্রা। ইহাছাড়া এইবার ৬০ ঘণ্টার হরতালে শুধু রাজধানীতে পোড়ানো ও ভাঙচুর করা হইয়াছে যথাক্রমে ৫৪টি ও ৬০টি যানবাহন। ইহাতে ক্ষতি হইয়াছে ৩০ কোটি টাকা। সারাদেশ ও সামগ্রিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা বিবেচনায় আনিলে এই ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকারও বেশি। তথাপি এইখানেই সবকিছু শেষ হইতেছে না। সামনে আরও সিরিজ হরতাল বা অবরোধের ন্যায় কঠোর কর্মসূচি আসিতেছে বলিয়া আভাস পাওয়া গিয়াছে।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৬২ সাল হইতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল হইয়াছে ১৫দিন। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত ৫দিন, ১৯৮১-৮৭ সাল পর্যন্ত ৫৯ দিন, ১৯৯১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ২৬৬ দিন, ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত ২১৫ দিন (তন্মধ্যে বিএনপির হরতাল ৫৯ দিন), ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত মোট হরতালের সংখ্যা জানা না গেলেও আওয়ামী লীগ আহূত হরতাল হয় ১৭৩ দিন এবং ২০১০-২০১৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিএনপি আহূত হরতাল হইয়াছে ১৭ দিন। এইভাবে দেখা যায়, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে হরতাল হইয়াছে সর্বাধিক ৬৭১ দিন। রাজনীতি ও গণতন্ত্রের আর্টস বা শিল্প হইল সমঝোতা। কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী জোটগত দুই মতাদর্শের মাঝে এইখানে সমঝোতা হইলেও হইতে পারে, তবে সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাহাছাড়া ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণের মারপ্যাঁচেও পড়িয়া গিয়াছি আমরা। ফলে যতই বলা হউক না কেন, সফল আলোচনা ও সমঝোতা এবং রাজনৈতিক সংকটের সমাধান ও উন্নয়ন সত্যিই দুরূহ ও কঠিন।
এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, হরতাল আমাদের ভাগ্য বা ললাটের লিখনে পরিণত হইয়াছে। অর্থাত্ আমাদের কপাল পোড়া। ব্যবসায়িক মহলসহ সমাজের সচেতন জনগোষ্ঠী হরতালের বিরুদ্ধে অনবরত বক্তব্য দিয়া যাইতেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার সমাধান কোথায়? আইন করিয়া হরতাল বন্ধের কথাও কেহ কেহ বলিতেছেন। তবে সবকিছুই অরণ্যে রোদনের ন্যায় প্রতিভাত হইতেছে। প্রকৃতপক্ষে যেইখানে আদর্শিক সংগ্রাম থাকে, সেইখানে শত অনুরোধ করিয়াও কোন লাভ নাই। এইক্ষেত্রে আদর্শ রক্ষায় সকলে নিজ নিজ অবস্থান হইতে কৌশল অবলম্বন করিয়া যাইতেছেন। এইভাবে বলিতে গেলে সমাধান হইবে সেইদিন যেইদিন একপক্ষ ধ্বংস হইয়া যাইবে বা দুর্বল হইতে দুর্বলতর হইবে। অথবা যেইদিন এই দুনিয়া ইসরাফিলের ফুত্কারে ফানাফিলা হইয়া যাইবে, সেইদিনই সকল বিরোধ ও মীমাংসার অবসান হইবে! ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের তকদির বদলানো যাইতে পারে। তবে তাহার জন্য দরকার শত সাধনা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা। ইহাতে আল্লাহ চাহেন তো যে কাহারও ভাগ্য পরিবর্তিত হইতে পারে। কিন্তু আমাদের কপাল লিখন বা ভাগ্য সহসা পরিবর্তন হইবে বলিয়া মনে হয় না। কেননা আমাদের কাজেকর্মে তাহার কোন লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। অতএব, হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও, সংঘাত-সংঘর্ষ, হতাহতের ঘটনা ইত্যাদি চলিতেই থাকিবে।
