লাশ চাই না, সমঝোতা চাই

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৭
প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নিজ নিজ হীনস্বার্থের বেড়াজালে বন্দী দেশের সাধারণ জনগণ। সমঝোতার বিপরীতে সরকার ও বিরোধীদলের পাল্টা কর্মসূচি ও নতুন নতুন ফরমুলা এবং প্রস্তাবনা দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাত্রাকে বেগবান করছে এবং জনগণের ভেতরে একধরনের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বেড়েই চলছে। যদিও এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, এখন এদেশের অধিকাংশ জনগণ জানেন না সংবিধান কি, সংবিধান সংশোধন কি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কি বা নির্বাচন বিষয়ক নিয়ম-নীতি কি? আর এসব বিষয় নিয়ে অধিকাংশই তেমন কোন মাথা ব্যথা নেই। তারা কেউ ক্ষমতায়ও যেতে চায় না, তারা চায় শুধু একটু সুখ, শান্তি ও স্বস্তিতে নিজনিজ কর্ম করে চলার মতো রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত একটি স্বস্তিদায়ক সুন্দর পরিবেশ। কিন্তু আজ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের মতো এইসব আমজনতাকে তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পুঁজি করে দেশে একধরনের অচলাবস্থার সৃষ্টি করছে। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষ দারুণ উত্কণ্ঠা ও একপ্রকার দমবন্ধকর পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে দিন অতিবাহিত করছে এবং সামনের দিনগুলোর কথা চিন্তা করে তাদের মনে অধিক উদ্বেগ ও ভীতির জন্ম দিচ্ছে। ভাবতে কষ্ট লাগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলি জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের জাহির এবং জনগণের জানমালের হেফাজতের কথা বলে সমঝোতার পথ পরিহার করে একের পর এক শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে পথে-ঘাটে জনগণকে রাজনীতির বলির পাঠা বানাচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাতে আজ যারা মারা যাচ্ছে তাদের দায়ভার কে নেবে সরকার নাকি বিরোধীদল? আজ প্রধান দুই শাসক গোষ্ঠির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দেশের জনগণ জিম্মিদশায় পরিণত হয়েছে এবং পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক সংঘাতে দেশ ক্রমশ: অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীক শ্রেণী, শিক্ষার্থী ও খেটে খাওয়া দিনমজুররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দেশে রাজনৈতিক দলগুলোরতো এহেন কর্মকাণ্ড ঘটানোর কথা নয়। দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের নেতারা কোন ধরনের গণতন্ত্র এবং তা সমুন্নত রাখার কথা বলে আমার এই ক্ষুদ্র জ্ঞানে তা একেবারেই মাথায় আসে না। দেশ ও দেশের রাজনীতি আজ এতটাই রসাতলে গেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্রুত এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে একে অপরের প্রতি আস্থা অর্জনে এবং রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে দেশ ও জাতির স্বার্থে সকলকে একইবৃত্তে আসা একান্ত জরুরী বলে মনে করি। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের প্রধান দুই নেত্রী নিজেদের রাজনৈতিক বাণিজ্য ঠিক রাখতেই দেশ ও দেশের জনগণকে দুই শিবিরে বিভাজন করে রেখেছে তা উভয়ই আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত দূর করবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো যে যখন ক্ষমতায় থেকেছে তখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিপক্ষে আবার যখন বিরোধী দলে থেকেছেন তখন তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয় বলে দেশ ও দেশের জনগণকে ভয়াবহ সংকটে পতিত করেছে এই ইতিহাস প্রায় সকলেরই জানা। উভয়ের ভিতর আস্থাহীনতার প্রধান কারণ হচ্ছে দলগুলো ক্ষমতায় বসেই সর্বস্তরে ঢালাওভাবে দলীয়করণ করার হীন প্রবণতা। যার হাত থেকে রক্ষা পায়নি নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী বিভাগগুলোও। ফলে যারা বিরোধী দলে থাকছে তারা উক্ত বিভাগগুলোর নিরপেক্ষতার বিষয় নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলছে এবং তাদের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ছে। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় আজকে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আস্থাহীনতার সংকট দেখা দিয়েছে এর জন্য দায়ীকে? এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা হয়তো বলবেন, এর জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক দলই দায়ী। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দলীয়করণ করার বিষয়টি আজ উভয় দলের আস্থাহীনতা ও রাজনৈতিক সংকটের জন্য অধিক দায়ী বলে মনে করেন। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিরপেক্ষতা ও নিজেদের স্বার্থে সকলপ্রকার রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে শুধুমাত্র এদেশে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন তৈরি করতে পারতো তবে নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চতা ও আস্থাহীনতার জায়গাটা সৃষ্টি হয়েছে তা কিছুটা হলেও রহিত করা যেত। অন্তত যেকোন সরকার আমলেই উক্ত নির্বাচন কমিশনের অধিনেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব হতো ফলে এমন সংকটে দেশ, জাতি তথা রাজনৈতিক দলগুলোকে পড়তে হতো না। আমরা চাই না আর এভাবে জনগণের জানমাল রক্ষার নামে তাদের ক্ষতি সাধিত হোক। যদিও উক্ত দলগুলো নিজ নিজ হীনস্বার্থে দেশের জনগণকে রাজনৈতিকভাবে বিভাজন করে রাজনৈতিক মাঠ গরম করছে এতে জনগণ রাজপথে নেমে আসছে আর প্রতিপক্ষের দ্বারা নির্মম পরিণতির স্বীকার হচ্ছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন জনগণকে করুণ পরিণতির স্বীকার হতে হবে। আজ দুইদলের একঘোঁয়েমি অবস্থান, সংলাপ সংলাপ খেলা ও সংঘাতময় কর্মকাণ্ড আর কতদিন চলবে। সেই আশির দশক থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক দল দুটির মধ্যে সেই দ্বন্দ্ব যা কিনা এখনও বলবত্ আছে আর এর খেশারত দিচ্ছে জনগণ যা সত্যিই বেদনাদায়ক। তাদের একে অপরের প্রতি আস্থাহীনতা দেশ ও দেশের জনগণকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং দলগুলো দিনদিন তাদের নিজেদেরকে এক গভীর সংকটে পতিত করছে। ভাবতে কষ্ট লাগে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারে কিন্তু একে অপরের প্রতি সেই আস্থা রাখতে পারে না যা সত্যি বেদনাদায়ক। দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে আস্থার সংকট অতি দ্রুত দূর হবে এবং জনপ্রত্যাশা পূরণ হবে। আপনাদের কাছে জাতির এমনটিই প্রত্যাশা। সকল মহলের প্রত্যাশা একটি সুন্দর সমঝোতা, সেই লক্ষ্যে আপনারা কাজ করুণ। আর যেন সংঘাতে কোন মার কোল খালি না হয় এবং দেশের অর্থনীতি ধ্বংস, কাউকে যেন কর্মহীন ঘরে বসে থাকতে না হয়। গণতান্ত্রিক দেশে পাঁচ বছরে একবার নয়, প্রতিদিন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ফোনালাপ দেখতে চাই। যদি আপনারা সত্যিকারের দেশ ও জনগণের মঙ্গল চান তবে আপনারা একে অপরের প্রতি একটু উদারতার পরিচয় দিয়ে আপনাদের মাঝে তৈরি হওয়া দূরত্ব ও দ্বন্দ্বের অবসান করুণ। এতে হয়তো দেশ, জাতি উপকৃত হবে। আমরা আশা করবো দলগুলি পরস্পরের প্রতি আস্থা অর্জন করে একটি স্বাধীন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন তৈরির দিকে অধিক মনোনিবেশ করবেন। কেননা একটি স্বাধীন প্রভাবমুক্ত নির্বাচন কমিশন থাকলে যে কোন সরকারের অধীনেই দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। চলমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অবসানে প্রধান দুই রাজনৈতিকদলসহ সকল দলের সমঝোতার মাধ্যমে দেশ ও দেশের জনগণকে সংকট থেকে উত্তোরণ করবে— এমনটিই সকলের আশা। লেখক :লাইব্রেরিয়ান, বিইউএফটি [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন