বড় দুর্যোগের সময় এক ঝলক সুবাতাস বইয়ে দিলেন আমাদের ক্রিকেটাররা। রুবেলের মত তরুণের বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং আর হ্যাটট্রিক জানিয়ে দিলো পিকেটারের বোমা, রাজনীতির গ্রেনেড আর পাওয়ার গেমের চাইতেও শক্তিশালী আমাদের ক্রিকেট বল, আমাদের চেয়ে শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, পরিবেশ বা যেকোন ক্ষেত্রে একশভাগ এগিয়ে থাকা নিউজিল্যান্ডকেও ধরাশায়ী করতে পারে যে বলের ঘূর্ণি। এ কৃতিত্ব এই উজ্জ্বলতা সারা দেশের মানুষের মত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনেও এনে দিয়েছে স্বস্তি। আনন্দহীন অন্ধকার বাস্তবতার বিপরীতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই প্রত্যুত্তর কি দেশের বর্তমান অবস্থায় কোন প্রভাব ফেলতে পারবে? পারবে কি পজেটিভ ওয়েভ বা সদার্থক ঢেউ তুলতে? এ প্রশ্ন বা সংশয় জাগে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে, এমনকি মিডিয়ার ভূমিকা দেখেও মনে হয় আমরা আসলে কি করছি? কি চাই আমরা?
পৃথিবীর বহু দেশে এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশেও মিডিয়া নৈর্ব্যক্তিক খবর প্রচারে সংযত ভূমিকা পালন করে। ভবন ধসে পড়লে, পুল ভেঙ্গে পড়লে, ছোটখাটো বোমাবাজি বা দুর্ঘটনা ঘটলে তারা এড়িয়ে যায় না বটে, তবে এমনভাবে নিউজ করে যাতে মনে না হয় এটাই জীবন বা এ দুর্ঘটনাই সবচে বড় বাস্তবতা। অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া জগতেও এ জাতীয় সদার্থক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা দেখি, গোড়াতে মনে হতো এরা আত্মমগ্ন ও স্বার্থপর অথবা অন্যের কৃতিত্বে অনুদার, আসলে কিন্তু তা নয়। এখানকার মিডিয়া নিজেদের প্রশংসা, দেশের ভালো কাজে অর্জনে সাফল্যে সর্বদা মুখর। যখনই মন্দ কিছু ঘটে বা নেগেটিভ কিছু ঘটে যায় সেটাও তারা চেপে রাখেন না, তবে তার বহি:প্রকাশ আমাদের মত উগ্র নয়। এই সেদিনের কথা, বুশ ফায়ারে দাউ দাউ করে জ্বলছিল সিডনির বনাঞ্চল, অগ্নিপ্রবণ বৃক্ষগুলো গ্রীষ্মকালে যেন তৈরি হয়েই থাকে, পাতায় পাতায় ঘর্ষণ, কারো অসতর্ক সিগারেটের ছুঁড়ে দেয়া আগুন বা অন্য যেকোন তুচ্ছ কারণে জ্বলে ওঠা দাবানল হয়ে ওঠে আগ্রাসী। একে বলা হয় বুশ ফায়ার। এবারের তীব্রতাও ছিল দেখার মত, বলা উচিত এখনো ভয় কাটেনি। বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ, আকাশের মুখ ভার, নিভু নিভু বনাঞ্চল-সব মিলিয়ে উদ্বেগ এখনো যায়নি। বুশ ফায়ার নিভাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে ফায়ার ফাইটার বা দমকল বাহিনী। একপর্যায়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী টনি এ্যবটও ছুটে গিয়ে মাঠ পর্যায়ে তদ্বির ও চেষ্টা চালাতে কসুর করেননি, কিন্তু এরই এক ফাঁকে বিশ্রামরত ক্লান্ত অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের একজন হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আরেক বেচারী পড়েছিলেন ঘুমিয়ে, আর যায় কোথায়? পৃথিবীব্যাপী চালু কিছু মিডিয়া এই দৃশ্যকে দেখাতে শুরু করে দিল, অনেকটা কর্তব্যে অবহেলা টাইপের বলে। আমরা হলে এর পক্ষে-বিপক্ষে মাতম শুরু করে দিতাম, যারা সরকারি দলের তারা বলতেন, এ দৃশ্যই আসলে বানোয়াট, এমন কোন ঘটনা ঘটেইনি। বিরোধীরা আরো উত্তেজনা আর রং মিশিয়ে ঐ ছবি বা খবর ছড়িয়ে দিতো সারা বিশ্বে, বলতো, দেখলে তো আমরা ক্ষমতায় না থাকলে কি হয়? এটাই মৌলিক পার্থক্য আমাদের সাথে। এ দেশের মিডিয়া একযোগে নিজেদের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেছে, ‘এটা মানবিক ভুল অথবা ক্লান্তির ফসল।’ নিজেদের সম্মান ও ভাবমূর্তি বাঁচিয়ে চলার ব্যাপারে মিডিয়ার এ জাতীয় ভূমিকা ক্রিকেটের বেলায়ও দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া হারলেও নিজেদের কোন খেলোয়াড় বা কৃতিত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারপর পরাজয়ের খবর দেয়ার রেওয়াজ এ দেশে। সত্যি কথা বলতে কি, এখন মনে হয় এটাই মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়।
ক্ষমতার রাজনীতি ও ক্ষমতা লোভের রাজনীতি যত উগ্রই হোক না কেন আমাদের ক্রিকেটকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, এমন বিজয়ও এসেছে সন্ত্রাস আর বোমার কালো ধোঁয়ায়। বাংলাদেশের তারুণ্য, বাংলাদেশের কোটি মানুষ প্রমাণ করেছে তারা এই অন্ধকারেও আলো জ্বালাতে সক্ষম। আমাদের ভরসা এই আলো আলোকবর্তী মানুষের মুখ। বহুকাল আগে আমেরিকার সমালোচনার মুখে রাশিয়া যখন একঘরে তখন বিশ্ব অলিম্পিকে সাড়া জাগিয়ে দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তারা। পৃথিবী ঘুরে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করেছিল, সত্যি যদি সে দেশে এত অশান্তি অমানবিকতা আর গণ্ডগোল থাকে তবে তারা আমেরিকাকে টপকে শীর্ষে থাকে কিভাবে? ক্রিকেটাররা যেন সে সত্যই তুলে ধরলেন। সত্যি যদি ধ্বংস হত্যা নারকীয় তাণ্ডব আর রাজনীতিই শেষ কথা, তবে এই বিজয় এলো কিভাবে? এই বিজয় কি মিডিয়া ও আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে?
[ সিডনি থেকে ]
