যেই কলঙ্ক সহজে ঘুচিবার নহে

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩৬
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা মর্মান্তিকভাবে নিহত হইবার পর দীর্ঘ ৩৭ বত্সর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে, কিন্তু সেই কলঙ্ক সেই বিভীষিকা আজও আমাদের পিছু ছাড়ে নাই। সহজে ছাড়িবে—এমন সম্ভাবনাও সুদূরপরাহত মনে হইতেছে। বরং উচ্চমূল্যে অর্জিত স্বাধীনতার উষালগ্নে ভ্রাতৃরক্তে স্নাত আত্মঘাতী রাজনীতির যেই অশুভযাত্রা শুরু হইয়াছিল, আজও আমাদের রাজনীতি হিংসা ও হানাহানির সেই দুষ্টচক্রেই ঘুরপাক খাইতেছে। লক্ষণীয় যে, স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার মাত্র ৭৯ দিনের ব্যবধানে কারার নিরাপদ প্রকোষ্ঠে ঠাণ্ডা মাথায় এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করা হইয়াছিল। উভয় ক্ষেত্রে রাষ্ট্র শুধু যে তাহার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছিল তাহাই নহে, বরং সভ্য সমাজের সকল রীতিনীতিকে পদদলিত করিয়া রুদ্ধ করা হইয়াছিল বিচারের পথও। নানাভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয়ও দেওয়া হইয়াছিল ঘাতকচক্রকে। অতএব, এখন রাজনীতির অঙ্গনে পারস্পরিক অবিশ্বাস, ঘৃণা ও বিদ্বেষের যেই দাবদাহ বহিয়া যাইতেছে তাহাকে সেই বেদনাদায়ক বাস্তবতা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। অতীতের এই কালিমা শুধু যে আমাদের গণতন্ত্রের পথকেই বারবার বিপন্ন করিয়া তুলিতেছে তাহা নহে, বরং জাতির সামগ্রিক অগ্রযাত্রার পথেও যে গুরুতর বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছে তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। দীর্ঘদিন পরে হইলেও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হইয়াছে। ইহা স্বস্তির বিষয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হইল, স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসের তিক্ততম সেই অভিজ্ঞতা হইতে যাহাদের শিক্ষা গ্রহণ করিবার কথা তাহারা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই। অবস্থাদৃষ্টে অন্তত তাহাই মনে হইতেছে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, আধুনিক রাষ্ট্রে কারাগারকে সর্বাপেক্ষা নিরাপদ স্থান বলিয়া বিবেচনা করা হয়। কারণ সরকার বা রাষ্ট্রই কারাবন্দীদের নিরাপত্তা বিধান করিয়া থাকে। সেই কারাগারের মধ্যেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হইয়াছে। আর যাহাদের হত্যা করা হইয়াছে সেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান শুধু বরেণ্য রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন আমাদের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষস্থানীয় নেতাও। সঙ্গত কারণেই ইহা প্রত্যাশিত ছিল যে, জঘন্য এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দলমতনির্বিশেষে রাজনীতিকরা সোচ্চার হইবেন এবং হত্যাকারীদের বিচারের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করিবেন। কিন্তু, বাস্তবে তাহা হয় নাই। গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হইল আইনের শাসন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো এখনও আমাদের রাজনীতির ঘাড়ে চাপিয়া আছে অপরাজনীতির সেই ভূত। প্রায়শ বলা হইতেছে যে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে হত্যা ও হানাহানির কোনো স্থান নাই। হিংসা কেবল হিংসার পথই প্রশস্ত করে। হত্যা কেবল আরও হত্যাকেই অনিবার্য করিয়া তোলে। অসহিষ্ণুতার রাজনীতির এই দুষ্টচক্র হইতে বাহির হইয়া আসার পথ একটাই। সেইটি হইল, শান্তি, সমঝোতা ও সহিষ্ণুতা। আমাদের রাজনীতিকরা যে তাহা জানেন না এমন নহে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই পথে হাঁটিবার মানসিকতা এখনও খুব একটা দৃশ্যমান নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন