মানসিক হাসপাতালের সংকট দূর হউক

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩৭
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীতে ৩৫ কোটিরও বেশি মানুষ গভীরভাবে বিষণ্ন হইয়া আছে। আর জাতীয় মানসিক ইন্সটিটিউটের এক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে মানসিক রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। তবে শরীরের অসুস্থতা আমাদের কাছে গুরুত্ব পাইলেও মানসিক অসুস্থতা বিশেষ মনোযোগ পায় না। মনোরোগ বা মানসিক রোগের প্রতি আমাদের সাধারণ প্রতিক্রিয়া হয় দুইভাবে— মানসিক রোগ ও রোগাক্রান্ত মানুষটির প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিক রোগের বিষয়ে উদাসীনতা। পরিবারের কোনো সদস্য মানসিক রোগে আক্রান্ত হইলে আমরা তাহা গুরুত্ব না দিয়া একপ্রকার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করি সামাজিক দৃষ্টি এড়াইবার জন্য। আবার কাহারও এই রোগে আক্রান্ত হইবার খবর প্রকাশিত হইয়া পড়িলে মানুষ তাহাকে সমর্থন দেওয়ার ও সহমর্মিতা প্রদর্শনের পরিবর্তে উপহাস করিতেই বেশি পছন্দ করে। মানসিক রোগী হইয়া পড়ে অন্যের হাসাহাসির পাত্র। পরিবারের সদস্য হইতে শুরু করিয়া আশপাশের অনেকের নিকট হইতে এইরূপ প্রতিক্রিয়া পাইয়া মানসিক রোগীরা অধিক রোগাক্রান্ত হইয়া পড়ে। ইহা যে শারীরিক অন্যান্য রোগের মতোই একটি রোগ এবং ইহারও যে চিকিত্সা রহিয়াছে, ঠিকঠাকমতো চিকিত্সা করাইতে পারিলে ইহাও যে সারিয়া যাইতে পারে, এই ধারণাও আমাদের যেন থাকিয়াও নাই। যাহা হউক, পরিস্থিতি দিন দিন বদলাইতেছে। আগের চাইতে মানুষের সচেতনতা বাড়িয়াছে। মনোরোগের বিভিন্ন পর্যায় রহিয়াছে। বিষণ্নতা হইতে শুরু করিয়া উন্মাদগ্রস্ততা পর্যন্ত নানান রোগীই, এখন মনোরোগ চিকিত্সকের নিকট যাইতেছে। পরিবারের সদস্যদের সমর্থনও পূর্বের তুলনায় বাড়িয়াছে। রোগীর সংখ্যা এবং রোগটির প্রতি মানুষের সচেতনতার তুলনায় মানসিক রোগের চিকিত্সা সুবিধা বাড়িতেছে না। খবরে প্রকাশ, মানসিক রোগের দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল পাবনা মানসিক হাসপাতাল নানান সমস্যায় আক্রান্ত। মাত্র ৯ জন চিকিত্সক দিয়া চলিতেছে এই হাসপাতালের কার্যক্রম। চিকিত্সক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট, যন্ত্রপাতির অভাবসহ নানান কারণে হাসপাতালের চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হইতেছে মারাত্মকভাবে। ১৯৫৭ সনে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে রহিয়াছে ৫০০টি বেড। মানসিক রোগের চিকিত্সায় দেশের প্রথম এবং একমাত্র এই হাসপাতালে প্রতি বত্সর গড়ে ৩০ হাজার রোগীর চিকিত্সা দেওয়া হইয়া থাকে। প্রতিষ্ঠার পর হাসপাতালটি তাহার সেবার বিনিময়ে সুনাম কুড়াইয়ছিল। কিন্তু ইদানীং এই হাসপাতালটির সেবার মান পড়িয়া গিয়াছে। হাসপাতালের কিছু ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হইয়া পড়িয়াছে, কিছু পাবনা মেডিক্যাল কলেজের দখলে চলিয়া গিয়াছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়াছে, বহির্বিভাগে যেইসব রোগী চিকিত্সাসেবা লইতে আসে তাহাদের অধিকাংশই ভর্তিযোগ্য। কিন্তু বেডস্বল্পতার কারণে তাহাদের ভর্তি করা সম্ভব হয় না। হাসপাতালের চিকিত্সক-কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মঞ্জুরিকৃত ৫০৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রহিয়াছেন মাত্র ৩২৩ জন। এই সীমিত মানবসম্পদ লইয়া হাসপাতালটি তাহার সর্বোচ্চ সেবা রোগীদের জন্য দিতে পারিতেছে না। দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মানসিক রোগের জন্য পৃথক বিভাগ থাকিলেও মনোরোগের জন্য বৃহত্তর বিশেষায়িত হাসপাতাল এই একটিই। বেসরকারি পর্যায়ে কিছু ক্লিনিক গড়িয়া উঠিলেও, স্বল্পব্যয়ে সর্বসাধারণের জন্য চিকিত্সাসেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে গঠিত এই সরকারি হাসপাতালটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু মনোরোগের চিকিত্সার এই হাসপাতালটির করুণ হালের খবর আমাদের মনোবেদনার কারণ হইয়াছে। এই হাসপাতালটির দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অচিরেই দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ইহার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনবল পরিপূর্ণ করিয়া ইহার চিকিত্সাসেবা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। মনে রাখিতে হইবে মনোরোগীরা নাজুক ধরনের রোগী। তাহাদের সঠিক পরিচর্যা ও চিকিত্সা যেমন তাহাদের সুস্থ করিয়া তুলিতে পারে, তেমনি তাহাদের প্রতি অবহেলা ও উপহাস তাহাদের অধিক অসুস্থ করিয়া তুলিতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন