তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হলেই কি সমস্যা ও সঙ্কট ঘুচবে?

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩৭
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে একটা আশঙ্কা ও আতঙ্ক এখন বিরাজ করছে। বিএনপির আচার আচরণ, হুমকি-ধামকি দেখে তারা ভাবছে, দলটি সম্ভবত নির্বাচনে আসবে না। যদি না এসে কঠোর কর্মসূচিতে যায় অর্থাত্ হরতাল, বিক্ষোভ, সমাবেশের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, নিরীহ পথচারীদের উপরে হামলা এবং বোমাবাজি আরো ব্যাপকভাবে শুরু করে তাহলে সরকারের গদি না নড়ুক, সাধারণ মানুষের দুর্গতির আর সীমা থাকবে না। তারপর সরকার যদি কনফ্রন্টেশনে যায়, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ়সংকল্প থাকে তাহলে বিএনপি-জামায়াতের যুক্ত সন্ত্রাস আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ভোটদাতারা যাতে ভোট দিতে যাওয়ার ব্যাপারে ভয় পায়, সেজন্য ২০০১ সালের কায়দায় তাদের বাড়ি-গাড়ির উপর হামলা চলবে। পোল বুথ পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা হবে। ভোট প্রার্থীদের উপরেও হামলা হবে। সংখ্যালঘু ও নারীদের ভোট দানে বিরত রাখার জন্য ভয় দেখানো হবে, নির্যাতন চালানো হবে। তার ফলে দেশের জনজীবনে এক মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হবে। এখন এই ভয়টাই দেশের অধিকাংশ মানুষের মনে জেঁকে বসেছে। দেশের মানুষ অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আরো একটি কথা ভেবে ভয় পাচ্ছে। তাদের ধারণা, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে রক্তাক্ত হানাহানি শুরু হলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে; যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্যে দারুণ বিপর্যয় দেখা দেবে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা থাকবে না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে যা হয়, সেনাবাহিনীকে বাধ্য হয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করতে হবে। দেশে রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক তত্পরতা নিষিদ্ধ হবে। নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন্ন হবে। বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব হবে। তাতে বিএনপি-জামায়াতের কোনো লাভ হবে না। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করে তারা আনন্দ পাবে। তবে এমনতরো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিএনপি ও জামায়াতের মনে একটা গোপন প্রত্যাশাও থাকতে পারে। বিএনপি ভাবতে পারে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলে এক সময় সামরিক বাহিনীর নেতাদের একটা বড় অংশ ছিল তাদের ‘ন্যাচারাল এলার্ট’; সেই এলায়েন্স আবার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। আর তা যদি হয় তারেক রহমানের পক্ষে স্বদেশে ফিরে আসাও সম্ভব হবে। তার বিরুদ্ধে যেসব গুরুতর অপরাধের মামলা আছে, সেগুলো বাতিল না হোক, অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি হয়ে যাবে। তখন দেশে রাজনৈতিক তত্পরতা নিষিদ্ধ থাকায় তারেক রাজনীতিতে প্রকাশ্যে সক্রিয় হতে না পারুন, অপ্রকাশ্যভাবে সংগঠনকে চাঙা করার কাজে লাগতে পারবেন। তাতে তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি’র ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। এই ব্যাপারে বিএনপির পৃষ্ঠপোষক কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্র এবং দেশের সুশীল সমাজের একাংশ তাদের সহায়ক হবে। অন্যদিকে জামায়াতের প্রত্যাশা আরো বড়। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো গেলে ৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্থগিত হয়ে যাবে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড মওকুব না হোক দণ্ড কার্যকর করা মুলতবি থাকবে। নতুন অরাজনৈতিক অথবা সামরিক সরকার দেশকে অরাজকতা মুক্ত করার কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকবেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের মতো বিষয়গুলো তারা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য ঝুলিয়ে রাখবেন। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার যদি বিএনপি ও জামায়াতের হয়, তাহলে তো কথাই নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড দুই-ই বাতিল করা যাবে। আর আওয়ামী লীগ যদি আসে, তখন নতুন করে রণ প্রস্তুতি নেয়া যাবে। আর বিশ্ব পরিস্থিতি অনুকূল হলে নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াত মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো একাই ক্ষমতায় যেতে পারবে না তাই বা কে বলতে পারে? তখন মিসরের মুরসির মতো ভুল পদক্ষেপ তারা নেবেন না। বিএনপি-জামায়াতের একশ্রেণীর নেতার সঙ্গে কথা বললেই তাদের মধ্যে যে এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা, আশা ও প্রত্যাশা কাজ করছে তা বোঝা যায়। সম্প্রতি ঢাকায় বিএনপি’র এক মধ্যম শ্রেণীর নেতার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ হচ্ছিল। তিনি আমাকে অসহিষ্ণু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, আওয়ামী লীগ সরকার যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আন্তরিক হয়, তাহলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে আপত্তি কি? এই দাবি মেনে নিলেই তো সব ল্যাটা চুকে যায়। দেশের মানুষও হুড় হাঙ্গামা থেকে বাঁচে। আমি তাকে বলেছি, ব্যাপারটা যদি এতো সহজ হতো, তাহলে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ এক সময় আন্দোলন করেছে, সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আওয়ামী লীগ অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কিছু চেক এন্ড ব্যালেন্সের ব্যবস্থাসহ মেনে নিতে দেরি করতো না। কিন্তু আওয়ামী লীগ অনেকবার প্রতারিত হয়ে বিএনপি’র আসল চরিত্রটি ধরতে পেরেছে। শেখ হাসিনা জানেন, তিনি বিএনপি’র এই দাবিটি মেনে নিলেই প্যান্ডোরার বাক্সের ঢাকনা খুলে দেবেন। বিএনপি এখন বলছে বটে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলেই তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে কথাটি খুবই সহজ ও সরল। কিন্তু তার ভেতরের মারপ্যাঁচটি অনেকেই সাদা চোখে ধরতে পারছেন না। এই মারপ্যাঁচটি হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা হলেই তারা সংসদে ফিরবেন ও নির্বাচনে যাবেন এ ঘোষণা দিচ্ছেন না। তারা বলছেন, দাবিটি মানা হলেই তারা আলোচনায় বসবেন। কথা হলো, আলোচনার আগেই যদি দাবি মানা হয়, তাহলে আলোচনা হবে কি নিয়ে? গণভবনে কেবল পান ভোজনের জন্য? বস্তুত বিএনপি আদপেই সরকারের সঙ্গে কোনো আপস-মীমাংসা চায় না। চায় সরকার তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করুক। কোনো আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন গণতান্ত্রিক সরকার তা করতে পারে না। বিএনপি’র কথাবার্তায় আরও মারপ্যাঁচ আছে। তারা প্রথমে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার পর তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন, পরে বলা শুরু করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, তা আগে ঠিক করা হোক। সরকার যদি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিটি মেনেও নেন, ঘোরপ্যাঁচ লাগবে, এই সরকারের প্রধান কে হবেন তা নির্ধারণ করা নিয়ে। এই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে তো তারা মানবেনই না; তাদের একেবারে পছন্দ মতো না হলে তারা দেশের কোনো যথার্থই নিরপেক্ষ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বকেই নিরপেক্ষ বলে স্বীকার করবেন না। আওয়ামী লীগ কোনো নাম প্রস্তাব করলেই তারা সেই নামের গায়ে পক্ষপাতিত্বের ছাপ মারবেন। তারা হয়তো নিরপেক্ষ বলে দাবি করে এমন ব্যক্তির নাম করবেন, ইয়াজউদ্দীন আহমদের মতো যাকে রিমোট কন্ট্রোলে ইচ্ছামতো চালিত করা যায়। ইয়াজউদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে রিমোট কন্ট্রোলে তখনকার নির্বাচনে কারসাজি করতে চেয়েছিল বিএনপি। তত্কালীন সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে ওই নির্বাচনটি হতে পারেনি। রিমোট কন্ট্রোলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কৌশলটি বিএনপি কর্তৃক আবিষ্কৃত। তারাই এটা ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল। এখন সেই রিমোট কন্ট্রোলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা করার অভিযোগ তোলা হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। তুলছেন বিএনপি’র সমর্থক কলামিস্টরা। কথায় বলে “চোরের মনে পুলিশ পুলিশ”, এটা অনেকটা তাই। আমি বিস্মিত হব না যদি বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বা সর্বদলীয় সরকারের (যদি তারা সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব মেনে নেয়) প্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের মতো কারো নাম দেশের শীর্ষস্থানীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তি বলে দাবি করে প্রস্তাব দেয় এবং আলোচনায় বসে আবার অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। এই দাবি না মানলে আলোচনা বর্জন করে আন্দোলনে ফিরে যাওয়ার নামে জামায়াতের সহায়তায় আবার ভাঙচুর ও সন্ত্রাসের রাজনীতি শুরু করে। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলেই সঙ্কটের সমাধান হবে না। সঙ্কটের বা সমস্যার সুরাহা হবে না। সরকারকে নমনীয় দেখলে এবং একটা দাবি মানলেই বিএনপি সেটাকে সরকারের দুর্বলতা মনে কর আরেকটি দাবি তুলবে এবং সেটি মানা হলে আরেকটি দাবি তুলবে। এরকম চলতে থাকবে, যতোক্ষণ পর্যন্ত না সরকার তাদের কাছে আপসের নামে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করেন। এর একটা বড় প্রমাণ, শেখ হাসিনা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সর্বদলীয় সরকারের অধীনে তা করার প্রস্তাব দিয়ে বিরোধীদলকে একটা বড় ধরনের ছাড় দিয়েছেন। সমঝোতা করতে হলে দু’পক্ষকেই একটু এগুতে হয়। কিন্তু বিএনপি একপা আগায়নি। সে তার দাবিতে চরম গো ধরে বসে আছে। এমনকি তাদের দাবি মানার শর্তেই মাত্র আলোচনায় বসতে রাজি আছে বলে জানিয়েছে। আগেই তাদের দাবি মানা হলে কিসের আলোচনা? এই অবস্থায় একমাত্র প্রতিকার সরকার যদি তার সঠিক অবস্থানে দৃঢ় থাকেন। বিরোধীদলের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে, আপসের জন্য আরো কিছু ছাড় দিতে সরকার নমনীয় থাকবেন, কিন্তু নতজানু হবেন না। দেশের বুদ্ধিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবী ও চিহ্নিত বিদেশি কূটনীতিকদের পরামর্শ ও চাপ অগ্রাহ্য করবেন। মেঘ যতো গর্জায় ততো বর্ষায় না। বিএনপি বহুবার সরকার ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছে, ফেলতে পারেনি। কারণ গণআন্দোলন করার মতো ইস্যু ও গণসমর্থন তাদের নেই। তাই হরতাল ডেকে জামায়াতের দুর্বৃত্ত ক্যাডারদের সাহায্যে জনসভা করা ও ভাঙচুরের রাজনীতি জনজীবনে উপদ্রব সৃষ্টি করা ছাড়া তারা আর কিছুই করতে পারে না। সন্ত্রাস দ্বারা কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের পক্ষেই সফল হওয়া সম্ভব নয়। আমি দীর্ঘ ১৫ বছর ব্রিটেনে আইআরএ সন্ত্রাসের মধ্যে বাস করেছি। সন্ত্রাস দ্বারা আইরিশ সন্ত্রাসীরা কিছুই অর্জন করতে পারেনি। আলোচনা বৈঠকে বসে শান্তি চুক্তি মেনে নিতে হয়েছে। ভারতে ভয়াবহ নকশালী সন্ত্রাসের কথা আমরা জানি। তা আজ ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়। বাংলাদেশেও বিএনপি-জামায়াতের যৌথ সন্ত্রাস কোনো সাফল্যই অর্জন করতে পারবে না। যদি আওয়ামী লীগ সরকারের এবং মহাজোটের মনোবল ও ঐক্য অটুট থাকে এবং আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক শক্তিকে আবার জাগিয়ে তোলে। এই আলোচনার শুরুতেই বিএনপি আলোচনায় না এলে, নির্বাচনে না আসতে চাইলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু, পরিণামে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ, দেশে অগণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তা থেকে বিএনপি ও জামায়াত যে সুবিধা লোটার আশা ও প্রত্যাশা করছে তা উল্লেখ করেছি। এগুলো আশঙ্কা। এ আশঙ্কা জনমনে নিজ থেকে তৈরি হয়নি, ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয়েছে। বেশি করে ছড়াচ্ছেন এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও কলমজীবী। এমন একটি আশঙ্কা যে নেই তা আমি বলি না। সেজন্যই আশঙ্কাটির কথা অর্থাত্ জনমনের ভীতির কথা এই নিবন্ধের শুরুতেই উল্লেখ করেছি। কিন্তু ঈশান কোণে মেঘ জমলেই যেমন সকল সময় ঝড় হয় না, তেমনি আশঙ্কা যতো বড় হোক তা দেখা দিলেই সব সময় সত্য হয় না। আমার দীর্ঘকালের সাংবাদিক অভিজ্ঞতা বলে, আওয়ামী লীগ যদি তার সাংগঠনিক শক্তি পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, মহাজোটকে শুধু নামের খসম করে রাখা নয়, তাকে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দুর্গ করে তুলতে পারে, তাহলে যেসব আশঙ্কার কথা বলছি, তার একটিও ঘটবে কিনা সন্দেহ। প্রথমত, বিএনপি’র গণআন্দোলন করার ক্ষমতা নেই। দ্বিতীয়ত, জামায়াতের চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর ক্ষমতা আছে, গৃহযুদ্ধ বাধানোর সক্ষমতা ও সাহস কোনোটাই নেই। কেন, ৫ মে কি তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি? চোরাগোপ্তা হামলা দ্বারা জামায়াত আরো ধিকৃত হবে, উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবে না। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী আবার দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে এগিয়ে আসবে তা আমার মনে হয় না। দেশে যে ধরনের অরাজক অবস্থা সৃষ্টি হলে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করে সে ধরনের অরাজক অবস্থা বাংলাদেশে দেখা দেয়নি। পরিস্থিতি সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। বিএনপি হুমকি-ধামকি দেয়া এবং ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গোপন হামলা দ্বারা জনজীবনে মাঝে মাঝে উপদ্রব সৃষ্টি করা ছাড়া দেশে বড় ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। ভবিষ্যতে পারবে তাও মনে হয় না। এ অবস্থায় সামরিক বাহিনী কেন যাবে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে দুর্নাম কুড়াতে? এই ব্যাপারে চিহ্নিত বিদেশি মহল থেকে উস্কানি পেলেও তারা উত্সাহিত হবেন মনে হয় না। বর্তমান সামরিক বাহিনীর অনেক তরুণ জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় দেখেছি, তাদের মধ্যে আগের এক শ্রেণীর সিনিয়র অফিসারের মত ‘পাকিস্তান-প্রীতি’ নেই। বিদ্যাবুদ্ধিতে তারা চৌকস, তাদের দেশপ্রেম ও পেশাজীবীত্ববোধ অত্যন্ত প্রখর। বিদেশে শান্তি মিশনে, অতি সম্প্রতি ঢাকার রানা প্লাজায় উদ্ধার কার্যে তাদের সাহস ও সাফল্য বিশ্বময় প্রশংসিত হয়েছে। এই সেনাবাহিনী জেনারেল জিয়া বা জেনারেল এরশাদের মতো কোনো ক্ষমতা লোলুপ সেনা কর্মকর্তার ক্ষমতা দখলের খায়েশ মেটাতে কোনো ধরনের গণবিরোধী এডভেনচারে যাবেন, তা বিশ্বাস করতে চাই না। সবশেষে একটি কথা বলি। যা শুনে অনেকে হয়তো আমাকে কল্পনাবিলাসী অথবা অতি আশাবাদী ভাববেন। কথাটা দৈববাণী নয়, একজন সাংবাদিকের স্পেকুলেশন, পাঠকেরা এভাবে নিলে খুশি হবো। বিএনপি যতোই গর্জাক, দেশ অবরোধ করার, অচল করে দেয়ার হুমকি দিক, তারা শেষ মুহূর্তে সর্বদলীয় সরকারের নেতৃত্বেই নির্বাচনে আসবেন। না এসে উপায় নেই। জামায়াতকে আঁচলের আড়ালে রেখেই দু’টি বড় কারণে তাদের নির্বাচনে আসতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারকে শুধু মনোবল না হারিয়ে দৃঢ় ও কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। এটা ধৈর্যের যুদ্ধ, শক্তির যুদ্ধ নয়। আজ স্থানাভাব। যে দু’টি বড় কারণে বিএনপি নির্বাচনে আসবে তা নিয়ে এই লেখায় আলোচনা করা সম্ভব হলো না। আমার আগামী কোনো লেখায় তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করবো। লন্ডন ২ নভেম্বর শনিবার, ২০১৩