গত ২৬ শে অক্টোবর শনিবার ভোরে দেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুুরী রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারিয়েছে একজন দেশবরেণ্য, সত্ এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক; আর আমি হারিয়েছি আমার সারাজীবনের বন্ধু, সুহূদ গিয়াস ভাইকে। তাঁর সান্নিধ্যে আমার বহু সময় কেটেছে, বহু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি আজ আমার মানসপটে ভেসে উঠছে। তাঁর আর আমার সংগ্রামী জীবনের বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেলো তাঁর তিরোধানের মধ্যদিয়ে। তাঁর সাথে হেসেছি; কেঁদেছি; জীবন জোয়ারে ভেসেছি; রাজপথে হেঁটেছি, আন্দোলন সংগ্রামে নেমেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ও সিন্ডিকেটে এক নিরন্তর প্রতিবাদের এবং সংগ্রামের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছি। আজ এ সবই অতীত, শুধুই স্মৃতি। অতীত দিনের এ সকল স্মৃতি স্মরণ করে বার বার অশ্রুসিক্ত হচ্ছি। লিখতে বসার সাথে সাথে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
আমরা এক সময় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে আমরা এ পৃথিবীর সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবো, প্রতিবাদ করবো, অন্যায়কে ঘৃণা করবো এবং ন্যায় ও সত্যের জয়গান গাইবো। আমাদের জীবনের অনেক ঘটনাপ্রবাহ এর সাক্ষ্য বহন করে। রাজশক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কি করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, কি করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ন্যায় ও সত্যের পক্ষ নিতে হয় গিয়াস কামাল তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। গিয়াস ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় সেই পঞ্চাশের দশক থেকে। আমি যখন ফেনী হাইস্কুলের উপরের ক্লাসের ছাত্র, গিয়াস ভাই সম্ভবত তখন ফেনী কলেজে পড়তেন। কখন কিভাবে পরিচয় ঘটেছিলো তা আজ আর মনে নেই; তবে কলেজ ক্যাম্পাসে বা শহরে তরুণ গিয়াস কামালের পদচারণার ছবি আজও আমার মানসপট থেকে বিদূরিত হয়নি। হূদ্যতা বাড়তে থাকে ষাটের দশকের প্রথম ভাগে যখন আমরা দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের সময় তত্কালীন অন্য ছাত্র নেতাদের সাথে তিনিও কারাবরণ করেন। এভাবে দিন অতিবাহিত হতে থাকে।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। সে সময়ে তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কারণ আমি ছিলাম কলকাতায়, আর তিনি ছিলেন দেশের অভ্যন্তরে। দিন যায় কথা থাকে। তিনি বিচরণ করতে থাকেন সাংবাদিকতার জগতে আর আমি উচ্চশিক্ষার ভুবনে। আবার আমাদের দেখা হয় রাজপথে স্বৈরাচারী (এরশাদ শাহীর) বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে। সরকারের একজন নৈতিক সমর্থক হয়েও, কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি সরকারের কঠোর সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। লোভ-লালসা, ভয়-ভীতির তোয়াক্কা না করে অবলীলাক্রমে তিনি সত্য প্রকাশ করেছেন। সত্যকথন গিয়াস কামালের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো। এ ধরনের স্পষ্টবাদী মানুষ এ সমাজে বিরল। গিয়াস কামালের মতো স্পষ্টবাদী ও আপসহীন মানুষের মৃত্যু হয় না—এরা মৃত্যুঞ্জয়ী।
গিয়াস কামাল এদেশের সাংবাদিক জগতে বিচরণ করেছেন দীর্ঘদিন যাবত্। সাংবাদিক নেতা ছিলেন, প্রেসক্লাবের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের কথা সাংবাদিক বন্ধুরা অবহিত আছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো তিনি ছিলেন একজন সত্ সাংবাদিক এবং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিলেন। অনেক মানুষই কোন না কোন রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করেন। তিনিও একটি রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তাই বলে তিনি তাঁর প্রফেশনাল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অযাচিতভাবে সে দর্শন প্রচার করেছেন বলে আমার মনে হয়নি। তিনি সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
সাংবাদিক গিয়াস কামালের চেয়েও মানুষ গিয়াস কামাল ছিলেন অনেক বড়। তিনি ছিলেন একজন দরদী মানুষ। মানুষের উপকার করা ছিলো তাঁর ব্রত। অতি সাধারণ মানুষ থেকে সমাজের উচ্চ পর্যায়ের মানুষ তাঁর কাছে হাজির হয়েছেন বিভিন্ন অনুরোধ, উপরোধ নিয়ে। বহু লোকের বহু তদবির। সবগুলো মনে রাখা সম্ভব নয় বিধায় সকালবেলায় তদবিরের তালিকা নিয়ে প্রবেশ করতেন সচিবালয়ে— সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে। মন্ত্রণালয়ে একের পর এক সাহায্য প্রার্থীদের আবেদন নিবেদন এবং অন্যায়ের প্রতিকার সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের কাছে তুলে ধরেছেন। কখনও সফল হয়েছেন, কখনও ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু জীবনের এক দীর্ঘ সময় তিনি এ কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এ যেন ছিলো তাঁর আরেক পেশা—যে পেশায় বিড়ম্বনা ছিলো, ছিলো না কোন পারিশ্রমিক। মানুষের উপকার করে তিনি আনন্দ পেতেন, তাই তিনি নিঃসংকোচে এ কাজ করে গেছেন। সাংবাদিক হিসাবে গিয়াস কামালের পরিচিতি বৃদ্ধি পায় যখন তিনি Voice of America-এর প্রতিনিধি হিসাবে খবর পাঠ করতেন। এ খবর তৈরি করতে তাঁকে আমি দেখেছি, খবর পাঠ করতে দেখেছি। দরাজ কণ্ঠে উচ্চারণ “Voice of America থেকে আমি গিয়াস কামাল বলছি”। এ খবর প্রচারের মাধ্যমে তিনি মানুষের হূদয়ে স্থান করে নেন এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যান।
গিয়াস কামাল সম্পর্কে সব কথা এ স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তিনি নিজেই তাঁর পরিচয়। গিয়াস কামাল এক ক্ষণজন্মা পুরুষ। তাঁর কাজের মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন। আমি তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি, তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করছি।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য,
সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী
