সংখ্যালঘু হিন্দু সমপ্রদায়ের ওপর আবারও হামলা হইয়াছে। ঘটনাস্থল পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম। এই গ্রামের ঘোষপাড়া ও সাহাপাড়ায় হিন্দু সমপ্রদায়ের বিশ-পঁচিশটি বাড়ি ভাঙচুর করা হইয়াছে। অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে বেশ কয়েকটি বাড়িতে। হামলা চালান হইয়াছে দুইটি মন্দিরেও। ন্যক্কারজনক এই কাণ্ডটি সংঘটিত করা হইয়াছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি পাতায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ(সা.) সম্পর্কে কটূক্তিকে কেন্দ্র করিয়া। যে কোনো ধর্মানুসারী মানুষের নিকট ধর্মানুভূতির বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ইসলাম, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কিংবা মহানবী (সা.) সম্পর্কে যে কোনো বিরূপ মন্তব্য অথবা অবমাননাকর কার্যকলাপে মুসলমান মাত্রই আহতবোধ করিবেন, বিক্ষুব্ধ হইবেন, ইহা স্বাভাবিক। কিন্তু সাঁথিয়ায় যে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটিয়াছে এবং পত্র-পত্রিকায় যে বিবরণ ছাপা হইয়াছে, তাহাতে ইহা পরিষ্কার যে, সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতিকে সুকৌশলে কাজে লাগাইয়াছে ঘাপটি মারিয়া থাকা কোনো দুষ্টচক্র।
অন্যসব দিনের মত গত শনিবারও কর্মকোলাহলে মুখর হইয়া উঠিয়াছিল সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বনগ্রাম। বেলা দশটা কি এগারটার দিকে অকস্মাত্ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হইয়া উঠিতে শুরু করে। কিছু সংখ্যক লোক বনগ্রাম বাজারে ফেসবুকের একটি পাতার ফটোকপি লইয়া হৈ চৈ ফেলিয়া দেয়। সেই পাতায় মুদ্রিত ছিল মহানবী(সা.) সম্পর্কে কটূক্তি। সাথে সাথে ইহাও প্রচার করা হয় যে ফেসবুকে এইসব অমার্জনীয় কথা লিখিয়াছে ব্যবসায়ী বাবলু সাহার কিশোর পুত্র রাজিব সাহা। এহেন প্রচারণায় পার্শ্ববর্তী পাড়া-মহল্লায় মানুষের মধ্যে ছড়াইয়া পড়ে ক্ষোভ। উত্তেজিত মানুষের মনে এই প্রশ্ন জাগে নাই যে সত্যই ফেসবুকের এই লেখাটি কিশোর রাজিব সাহার কি না, কিংবা আদৌ তেমন কিছু ফেসবুকে লেখা হইয়াছিল কিনা। তাহা ছাড়া পল্লীর সহজ-সাধারণ মানুষ ফেসবুক সম্পর্কে কতটুকুই বা জানেন! তাহাদের এই বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকিবার কথা নহে। এই সুযোগটাই নিয়াছে কুচক্রিমহল। এমতাবস্থায় না জানিয়া না বুঝিয়া বিক্ষুব্ধ মানুষ প্রথমে বাবলু সাহার বড়িতে আক্রমণ করে এবং তাহার ক্লাস টেনে পড়া পুত্র রাজিব সাহাকে তাহাদের হাতে তুলিয়া দেওয়ার দাবি জানায়। অতঃপর সেই কিশোরকে না পাইয়া তাহার পিতাকে লাঞ্ছিত করা হয়। গুজবে ক্ষিপ্ত মানুষ সাহাপাড়া ও ঘোষপাড়ায় নির্বিচারে হামলা চালায়। অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। খবর পাইয়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসিলে হামলাকারীদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অথচ প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, কথিত ফেসবুক পাতাটি কিংবা ওই মন্তব্যটি ‘অভিযুক্ত’ রাজিব সাহার নহে। ইহার সঙ্গে স্কুল পড়ুয়া ওই ছেলেটির কোনোই সম্পর্ক নাই। নেহায়েত গুজব ছড়াইয়া এই সামপ্রদায়িক সহিংসতার জন্ম দেওয়া হইয়াছে। এই ধরনের অপকর্মের নিন্দা জানাইবার ভাষা আমাদের জানা নাই।
দেশে এইরূপ ন্যক্কারজনক ঘটনা এই প্রথম ঘটিল, তাহা নহে। গত বত্সর সেপ্টেম্বরে অনুরূপ উপলক্ষ সৃষ্টি করিয়া রামুর বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের ওপর চালান হইয়াছিল ঘৃণ্য হামলা। পোড়াইয়া দেওয়া হইয়াছিল ১২টি বৌদ্ধমন্দির। ভস্মীভূত করা হইয়াছিল ওই সমপ্রদায়ের বহু বসতবাড়ি। নিন্দার ঝড় উঠিয়াছিল দেশে ও বিদেশে। গত এক বত্সরে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা আরও অনেক ঘটিয়াছে। কিন্তু প্রশ্ন হইল, এইরূপ হিংসাশ্রয়ী এবং মানবিকবোধ বিবর্জিত কর্মকাণ্ডের পশ্চাতে যে দুষ্টচক্রের হাত সক্রিয় রহিয়াছে, তাহারা কারা? কী তাহাদের উদ্দেশ্য? বাংলাদেশের হিন্দু কি মুসলমান, খ্রিষ্টান কি বৌদ্ধ—কোনো সমপ্রদায়ের মানুষই সামপ্রদায়িক নহে, যদিও ধর্মপ্রাণ। যুগ যুগ ধরিয়া এইখানে নানা ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করিয়া আসিতেছেন। এই দেশে প্রতিটি নাগরিকের সমানাধিকার স্বীকৃত। আর আজ কে জানে, কোন হীনস্বার্থে মাতিয়াছে কোন অশুভ শক্তি? উহাদের সম্পর্কে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। সকলের সচেতন প্রয়াস, সে-ও অত্যাবশ্যকীয়।
