প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সংলাপ প্রশ্নে বাংলাচরাচর হা-হুতাশ করছে। সংলাপ হলেই যেন মিটে যাবে সব সঙ্কট! তপ্ত মরুতে বইবে মলয় বাতাস! কালবৈশাখির কৃষ্ণমেঘ হয়ে যাবে দৃষ্টিনন্দন সিঁদুরে মেঘ মাত্র! কেটে যাবে সকল ভয়! সুতরাং সংলাপের জন্যই ফোনালাপ হলো দুই নেত্রীর মধ্যে। তারপর যেই ডিমের কথা শুনলে পণ্ডশ্রম কথাটা মাথায় আসে, সেই অশ্বডিম্ব আসন পাতল নৈশভোজের টেবিলে।
এগুলো কী খুব বড় হতাশার কথা? অনেক বড় আক্ষেপের কথা? কিন্তু তলিয়ে দেখলে এটা বোঝা কি খুব কঠিন যে, এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। ঘুরিয়ে বললে বলা যায়, এ দেশের জাতীয় নেত্রীদের যদি আদর্শচ্যুতি ঘটে, তবে সেই দৃশ্য দেখতে কি ভালো লাগবে আমাদের? উভয় নেত্রী নিজ নিজ আদর্শের ধব্জা বজ্রকঠিন মুঠোতে ধরে আছেন। সেই আদর্শের কী আপোস হবে? হতে পারে কখনো? যা-র প্রতি যার ভালোবাসা-নীতি-আদর্শ উত্সর্গকৃত তা-র প্রতি একনিষ্ঠ থাকাটাই চারিত্রিক দৃঢ়তা। আমাদের নেত্রীদের তা আছে। তাই নয় কি?
নীতির প্রশ্নে এ পৃথিবীর সকল মানুষকে খুব সহজ দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়—সুবিধাবাদী ও আদর্শবাদী। আদর্শ প্রেমের প্রশ্নে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘প্রণয়ের পাত্র নীচই হউক, নিষ্ঠুরই হউক, আর কুচরিত্র হউক, তাহাকে আঁঁকড়িয়া ধরিয়া থাকাকে অনেকে প্রণয়ের পরাকাষ্ঠা মনে করিয়া থাকে।’ তিনি এ লেখার অন্যখানে শ্লেষ করে বলেছেন, ‘আমরা স্বভাবের শিশু, অতএব অত্যন্ত সরল। ধুলায় কাদায় নগ্নতায়, সর্বপ্রকার নিয়মহীনতায় আমাদের কোনো লজ্জা নাই—আমাদের সকলই অকৃত্রিম।’ সুতরাং আদর্শের প্রশ্নে আমাদের রাজনীতিকরা শিশু বটে, অত্যন্ত সরলও। আমাদের নেতা-নেত্রীরা আপোসহীন নিশ্চয়ই। সুবিধাবাদিতার পঙ্কিলে কেন তাঁরা ডুববেন? আপোস করে সুবিধাবাদীরা। আদর্শবাদীদের আপোসহীন হতেই হয়, নইলে মৃত্যু ঘটে আদর্শের।
সেই অর্থে আদর্শের দুই ভিন্ন মেরুতে অবস্থানে থাকা দুই নেত্রী কি তবে সুবিধাবাদী হবেন সংলাপের প্রশ্নে? হয়তো কৌশলগত কারণে সংলাপ-সংলাপ খেলা খেলতে হয়, কিংবা আরও অনেক বিষয়ে উপরি-সংযোগ রাখতে হয় রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রগত রীতিনীতির কারণে। কিন্তু নিজ আদর্শের প্রতি সত্যিকারের অনড় মানুষ তাঁর আদর্শকে সমুন্নত রাখতে সব কিছু করতে পারেন। সুতরাং আমাদের রাজনীতিকরা একঅর্থে অকপট। তাঁরা আদর্শের প্রশ্নে আপোস করেন না। তাঁদের সেই আদর্শের বৈশিষ্ট্য কী, কোন কোন উদ্দেশ্য ও বিশ্বাসের ভিত্তি সেই আদর্শকে শক্তপোক্ত করেছে, সেই আদর্শ দেশ ও জাতির বৃহত্তর মানুষের কল্যাণ আনে কিনা—এসব ভিন্ন প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর হয়তো আদর্শকে আপাত বিশ্লেষণে ভালো বা মন্দ ভাগে ভাগ করা যায়, কিংবা অনেক সময় সেই ভাগও স্পষ্ট হয় না তেমন—কিন্তু সেসবের ওপর আদর্শের ভীত সবল বা দুর্বলও হয় না। আদর্শের একটি একান্ত রূপ আছে। সেই আদর্শের শীর্ষে যারা বসে আছেন, তাদের অঙ্গুলি হেলনে ঘটে সকল কার্যকলাপ। তাই মিছে এই সংলাপ-সংলাপ খেলা। শুধু শুধুই বয়ে গেল বেলা।
লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
