দেশের চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে আমাদের সংবিধান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেছেন, দুই দলের সমঝোতা হলে আগামী ২৪ সে জানুয়ারির পরেও নির্বাচন করতে পারবে। তিনি বলেছেন, দুই পক্ষ রাজি থাকলে আলহামদুলিল্লাহ। দু’দল সমঝোতায় এলে যখন নির্বাচন চাইবে তখন নির্বাচন হবে। অর্থাত্ দুই দলের অভিপ্রায়ই সংবিধান। জনগণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের এখানে কোন ভূমিকা নেই। সংবিধানের এখতিয়ার, নির্দেশনা বা সংশোধনের প্রয়োজন নেই। নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রধানের এরকম বক্তব্য সংবিধানের প্রতি কোন্ ধরনের আনুগত্য প্রকাশ পায় তা বোধগম্য নয়। এসব কারণে জনগণ গভীর উদ্বিগ্ন ও শংকিত।
১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই অমূল্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। নিষ্পাপ শিশু বোমা বা গুলি খেয়ে গণতন্ত্রের দায় শোধ করছে। রাষ্ট্র দুঃখ প্রকাশের বা হত্যা তদন্ত করার প্রয়োজনটুকু মনে করছে না।
বাংলাদেশ গণতন্ত্র, নির্বাচন আর সংবিধান নিয়ে একটি বিপজ্জনক অবস্থানে অবস্থান করছে। দেশের বিপর্যয় রোধে ক্ষমতার ক্ষতিকর পরিণতি সামলানোর প্রশ্নে আমাদের বিদ্যমান সংবিধানের অন্তর্নিহিত শক্তি কাজে লাগাতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেন আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। দেশ সাংবিধানিকভাবে নির্বাচনকালীন সময়সীমার আওতাভুক্ত। প্রধানমন্ত্রী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা সর্বদলীয় সরকার আজ পর্যন্ত গঠন করেননি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান কে হবেন, নতুন সরকার কখন গঠন করা হবে, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সংখ্যা কত হবে বা বিরোধী দলের অংশগ্রহণ কীভাবে হবে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মপরিধিসহ কোন কিছুই সুনির্দিষ্ট করেননি। বিরোধী দলসমূহের প্রস্তাবকেও সরকার বিবেচনায় নেয়নি।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে এ সংকটের নিরসন হতে হবে। মাননীয় রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ এর ৫ অনুযায়ী “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা সুনির্দিষ্টকরণ” এই এজেন্ডা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পেশ করলে এই ইস্যু দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারে।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৫ এ বলা হয়েছে “প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় নীতি সংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখিবেন এবং রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করিলে যে-কোন বিষয়ে মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য পেশ করিবেন।”
দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় আরপিও সংশোধনী করে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বিধস্ত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আর পিও) ১২/জে ধারায় উল্লেখ ছিল মনোনয়নপত্র জমার দেয়ার দিন থেকে পূর্ববর্তী ৩ বছরে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরবচ্ছিন্ন সদস্যপদ না থাকলে কোন ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না। এখন এই ধারা হঠাত্ বাতিল করে দেয়া হলো। আরপিও’র ১৩ ধারা সংশোধন করে প্রার্থীর জামানত এর অংক বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং নির্বাচনী ব্যয়ও বাড়িয়ে ২৫ লক্ষ টাকা করেছে। এসবের মধ্যদিয়ে নির্বাচনকে নিলামে তোলার মনোনয়ন বাণিজ্য বিস্তারে অবারিত সুযোগ করে দিয়েছে। কালো টাকার মালিকদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সংসদ দখল বা অনুপ্রবেশের দৌরাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত করেছে। সুযোগ সন্ধানী অসাধু ব্যবসায়ীদের ক্রমাগতভাবে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠার সুবিধা, দল বদলের হিড়িক, ত্যাগী ও সত্ নেতাদের দৃশ্যপট থেকে বিদায় এই ‘দুর্ভাগ্যজনক’ গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। এই আরপিও সংশোধন গণতান্ত্রিক সমাজ বা আদর্শের জন্য সংগতিপূর্ণ নয়। এটা গণতান্ত্রিক চেতনাকেই ধ্বংস করে দেবে। এ আইন দ্বারা সংসদে মনোনয়ন প্রদানে তৃণমূলের ভূমিকারও অবসান হলো। অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো গণতন্ত্র সম্মত উপায়ে প্রার্থী বাছাই। এই আইনে কলাগাছ মার্কার জয়-জয়কার। সুযোগ সন্ধানীদের কেনা-বেচার হাট জমজমাট করে দেবে এই আইন।
গত নির্বাচন কমিশন সব দলের সাথে আলোচনা করে যে বিধান করেছিল এবারের কমিশন কারো সাথে আলোচনা ছাড়াই আরপিও সংশোধন করলো একতরফা নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে-সরকারি মদদে প্রার্থী বদলের হিড়িক নিশ্চিত করতে। ত্যাগী বা সত্ রাজনৈতিক নেতারা মৃত্যুর পর স্বর্গে যাবার সম্ভাবনা থাকলেও এই জগতে আর সংসদে যাবার সুযোগ হবে না। টাকা বা অবাধ্য লোভ-লালসার লাগামহীন সংস্কৃতি উসকে দেয়া হয়েছে।
এই কালো আইনটি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সম্মতি পেলেই চূড়ান্ত আইনে পরিণত হবে। এই অগণতান্ত্রিক কালাকানুন গণবিরোধী আইনটি প্রতিরোধের এখন একমাত্র ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। রাষ্ট্রপতি বিলটিতে স্বাক্ষর না করে সংবিধানের ৮০ (৩) ও (৪) অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন। সংবিধানের ৮০(৩) এ বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতির নিকট কোন বিল পেশ করিবার পর পনের দিনের মধ্যে তিনি তাহাতে সম্মতিদান করিবেন কিংবা অর্থবিল ব্যতীত অন্য কোন বিলের ক্ষেত্রে বিলটি বা তাহার কোন বিশেষ বিধান পুনর্বিবেচনার কিংবা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্দেশিত কোন সংশোধনী বিবেচনার অনুরোধ জ্ঞাপন করিয়া একটি বার্তাসহ তিনি বিলটি সংসদে ফেরত দিতে পারিবেন; এবং রাষ্ট্রপতি তাহা করিতে অসমর্থ হইলে উক্ত মেয়াদের অবসানে তিনি বিলটিতে সম্মতিদান করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।” এবং (৪) এ বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি যদি বিলটি অনুরূপভাবে ফেরত পাঠান তাহা হইলে সংসদ রাষ্ট্রপতির বার্তাসহ তাহা পুনর্বিবেচনা করিবেন; এবং সংশোধনীসহ বা সংশোধনী ব্যতিরেকে সংসদ পুনরায় বিলটি গ্রহণ করিলে সম্মতির জন্য তাহা রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থাপিত হইবে..। সুতরাং রাষ্ট্রপতি বিলটি সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। রাষ্ট্রপতির যদি এই বিল সংসদে বার্তাসহ ফেরত পাঠান সংসদ নিশ্চই তা পুনঃবিবেচনা করবে। সংসদের মেয়াদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির এই সাংবিধানিক এখতিয়ার ও ক্ষমতার দ্বারা দেশ একটা সর্বনাশা পদক্ষেপ থেকে মুক্তি পেতে পারে।
আরপিও প্রশ্নে ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখার প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই জরুরি। রাষ্ট্রপতির কাছে নিবেদন জাতির ন্যায়সংগত অভিপ্রায়।
লেখক:গীতিকার
[email protected]
