নির্বাচন

ভোটদানের প্রচলনের শুরু নিয়ে কিছু কথা

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৯
সামনে বাংলাদেশের দশম জাতীয় নির্বাচন। প্রায় ষোল কোটি জনগণের মধ্যে নয় কোটি ভোটার। আর কে জিতবে, কে হারবে, এ নিয়ে কতই না জল্পনা-কল্পনা। এই আকাঙ্ক্ষিত ভোটের মাধ্যমে দেশের পরবর্তী সরকারকে নির্বাচন করতে হবে। অথচ সেই ভোট প্রদান কবে থেকে শুরু হয়েছে এবং কিভাবে হয়েছে, তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? হয়তো কেউ আমরা ভেবেছি, আবার কেউ ভাবিনি। যাহোক, ভোটদান পদ্ধতি স্মরণকাল থেকেই সূত্রপাত হয়েছে এবং মানব সভ্যতার সাথে সাথে তা ক্রমবিকাশের মাধ্যমে সুনিশ্চিত হয়েছে। আসলে Vote কথাটি ইংরেজী শব্দ, যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ “Votum” থেকে। এর অর্থ হলো “To Wish” অর্থাত্ কারো পক্ষে ইচ্ছে বা অনিচ্ছা প্রকাশ অর্থাত্ স্বেচ্ছায় মত প্রকাশ। এদিকে যে কোন নির্বাচনে ভোটদানের অধিকারকে বলা হয়ে থাকে গণতান্ত্রিকভাবে মতামত বা ইচ্ছে-অনিচ্ছা প্রকাশের অধিকার। তাই বর্তমানে ভোট দেয়াটা হলো একজন নাগরিকের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার। সেই প্রেক্ষাপটে পছন্দনীয় প্রার্থীদের নির্বাচনের কথা এসে যায়। এক্ষেত্রে ইংরেজী শব্দ Election, যার অর্থ হলো পছন্দ করা (To Choose)। যাহোক, এবার ভোটদানের গোড়ার কথায় আসা যাক। যতদূর জানা যায় ভোটদান প্রথা চালু হয় প্রায় তিন হাজার বছর আগে। এ প্রেক্ষিতে উল্লেখ্য যে, প্রাচীনকালে রাজার ছেলে রাজা হবে, এই তো রীতি, যা এখনও ব্রিটেনসহ কিছু দেশে প্রচলিত আছে। কিন্তু রাজার যদি বেশ কয়েকটি ছেলে থাকে। রেওয়াজ অনুযায়ী তার মধ্যে বড় ছেলে রাজা হবে। অথচ তিনি যদি অযোগ্য হন, তখন প্রশ্ন উঠে কে রাজা হবেন? আর এ জটিলতা কাটাতে রাণী স্বয়ং কয়েকজন সভাসদ নিয়ে বসে কোন ছেলে অধিকতর তুলনামূলক যোগ্য এবং রাজ্য রক্ষা করতে পারবে, তা চিন্তা-ভাবনা করে মৌখিকভাবে নির্বাচন করতেন। আর সেই মৌখিক নির্বাচনের সূত্র ধরে এখনও বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে কোন আইন পাস করার ব্যাপারে এটি প্রচলিত আছে। উল্লেখ্য যে, নিজের পছন্দমতো নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি প্রায় পনেরশ’ বছর আগে প্রবর্তিত হয়। এ্যাংলো স্যাক্সনরা বৃটেন দখল করার পর এই প্রথা প্রবর্তন করেন। প্রাচীনকালে ভোটের ক্ষেত্রে ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হতো না। মৌখিক নির্বাচনের প্রাধান্য ছিল না। এ ব্যাপারে যতদূর জানা যায় হিব্রু এবং গ্রীকদের মধ্যে প্রথম এ ধরনের ভোটদানের আনুষ্ঠানিকতাসম্বলিত কার্যক্রম শুরু হয়। এক্ষেত্রে অবশ্য তেমন কেন লিখিত ব্যালটপত্র ব্যবহূত হতো না। কেবল সিম্বলিক মার্কা ব্যবহার হতো, যার রেওয়াজ এখনও বিদ্যমান। আর সেই থেকে কালক্রমে ব্যালট পেপারের রীতি শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, Ballot কথাটি এসেছে ইটালিয়ান শব্দ “Ballotta” থেকে, যার অর্থ হলো গুপ্ত মত। আর Ballot paper-এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো গুপ্তমতপত্রী। কাল থেকে কালান্তরের পথ বেয়ে ভোট পদ্ধতি এগিয়ে যেতে থাকে। আর এ ব্যালট সিস্টেম প্রথম বৃটেনে অনুসৃত হয় এবং বৃটেন থেকে এ পদ্ধতি সমগ্র আমেরিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বৃটিশ কলোনীতে কেবল সাধারণ নির্বাচনেই নয়, এমনকি সরকারি অফিসের কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যালট পেপারভিত্তিক ভোট অনুষ্ঠিত হয়। আর এটি এত জনপ্রিয় হয় যে বিতর্কিত কোন সমস্যা মিটাতে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে এ পদ্ধতি গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করা হতো। এখানে উল্লেখ্য যে, ভোটদান পদ্ধতি শুরু হওয়ার প্রাথমিক দিকে সবার ভোটাধিকার থাকলেও একই দেশ বা সমাজের অনেকেরই ভোটাধিকার ছিল না। শুধু গণ্যমান্য ও ধনী ব্যক্তিসহ এলিট মানুষরাই ভোট দিতে পারতেন। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় এই যে সম্পত্তিহীন মানুষ, ক্রীতদাস ও মেয়েদের কোন ভোটাধিকার ছিল না। তখন এ ব্যাপারে অনেকে সোচ্চার হলেও কতিপয় দেশে নারীদের ভোটাধিকার দেয়া হলেও কিছু কিছু দেশে এরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। আর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে অন্যান্য বিষয়ের সাথে সর্বক্ষেত্রে মেয়েদের ভোটের উপর জোর দেয়া হলেও কিছু মুসলিম রাষ্ট্রে শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েদের ভোটদানের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও উদাসীন রয়েছে। সর্বপ্রথম মেয়েরা ভোটাধিকার লাভ করে ১৯১৮ সালে। আর সেই সৌভাগ্যবতী মহিলারা হলেন বৃটেনের মেয়েরা। তবে শর্ত থাকে যে, তাদের বয়স ৩০ বছর অথবা তার বেশি হতে হবে, এর কম হলে চলবে না। অবশ্য পুরুষের বয়সসীমা ১৮ বছর বিদ্যমান থাকে। এর মধ্যে অনেক চড়াই-উত্রাই পার হয়ে ১৯২৮ সাল এসে যায়। আর সালটি ছিল মৌলিক ও গণতান্ত্রিক ভোটাধিকারের দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই বছরেই সার্বজনীন ভোটাধিকার চালু হয়। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয় যে, যাদের কেবল নাগরিকত্ব আছে, তাঁরা সহায়-সম্বলহীন হলেও এমনকি ভবঘুরে থাকলেও তাঁরা ভোটাধিকার পাবেন। বর্তমান আধুনিক বিশ্বের সব দেশ পরিচালনার জন্য নাগরিকদের পছন্দমতো জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকে এবং ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলাদের বয়সের ক্ষেত্রে তারতম্য নেই, ন্যূনতম ১৮ বছর হলেও সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এখন সারাবিশ্বের ১৯৬টি দেশে এই নীতির আওতায় ভোটদান পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে। আর বর্তমানে ভোট প্রদানের বিষয়টি বেশ আধুনিকায়ন হয়েছে। আগে অনেক জটিলতার কারণে ভোট প্রদানের সংখ্যা কাম্য সংখ্যক ছিল না। এখন নাগরিকবৃন্দ অনেক বেশি সজাগ। তাঁরা মূল্যবান ভোট দিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, উন্নত বিশ্বের মতো ইদানিং বাংলাদেশে বস্তুনিষ্ঠ নির্বাচন কমিশন ও আইডি কার্ড প্রবর্তনের ফলে ভোট প্রদান সহজতর হয়েছে এবং কারচুপি পূর্বের তুলনায় অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। লেখক: গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন