২০০৯ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে ছিলেন। পরে একবার টেস্ট দলেও ডাক পেয়েছিলেন। মাঝে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরিও করেছেন। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে খেলা বললে যা বোঝায়, সেই ওয়ানডে বা টেস্ট খেলা হচ্ছিল না। অবশেষে এই সিরিজে এসে সুযোগ পেলেন সামসুর রহমান শুভ। আর সেই সুযোগ এমনভাবেই কাজে লাগালেন যে, বাংলাদেশের জন্যই দিনটা শুভময় একদিন হয়ে থাকল!
অল্পের জন্য সেঞ্চুরি হয়নি। কিন্তু ম্যাচ জয়ী ৯৬ রানের ইনিংস দিয়ে এই শুভই এনে দিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্মরণীয় দিনগুলোর একটি। দিন শেষে তাই ম্যাচ সেরার পুরস্কারটাও তারই হাতে। এমন এক ইনিংস খেলার পর শুভ যেন গোটা বাংলাদেশের প্রতীক হয়েই হাজির হলেন। অনুভূতি জানাতে গিয়ে আত্মবিশ্বাস আর আত্মতৃপ্তি মিলিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই ভাল লেগেছে। আমার ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচ। আর আমি, নাইম ভাই আর নাসির ম্যাচটা জিতিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছি; এটা অনেক বড় ব্যাপার। দলের প্রয়োজনে ভাল ব্যাট করতে পেরেছি। এটা আমার জন্য বড় একটা অভিজ্ঞতা। এখন আমি এই পারফরম্যান্সটা ধরে রাখতে চাই।’
এই সফরে যখন স্কোয়াডে ডাক পেলেন তখন খেলার ব্যাপারটা মোটেই নিশ্চিত ছিল না। তার পজিশন ওপেনিংয়ে। আর ওপেনিংয়ে তামিম ইকবাল ও এনামুল হক বিজয়ের খেলা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। শেষ পর্যন্ত বিজয়ের ফর্মহীনতায় দুই ম্যাচ খেলে ১২১ রান করলেন। এবার এই পারফরম্যান্স ধরে রাখার পালা। শুভও এমনটাই জানালেন, ‘যেকোন লেভেলের ক্রিকেটে রান করতে পারলেই আনন্দ লাগে। নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আমি এখন এটা ধরে রাখার চেষ্টা করবো। আর সেটা হলে আমার জন্য ও বাংলাদেশ দলের জন্যও ভাল হবে।’
অল্পের জন্য সেঞ্চুরি না পাওয়ার জন্য যেকোন ব্যাটসম্যানই নার্ভাসনেসকে দায়ী করেন। মজার ব্যাপার হল, শুভর ক্ষেত্রে মোটেও এমনটা ঘটলো না। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসলে, এবারই প্রথম আমি নব্বইয়ের ঘরে গিয়ে নার্ভাস হইনি। আমি চাইছিলাম আমার নিজস্ব খেলাটা খেলতে। ব্যক্তিগত অর্জন আমার চিন্তাতেও ছিল না। খেলেছি স্রেফ দলের জন্য।’
এই ক’দিন আগের ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের ম্যাচ। আবাহনী-মোহামেডান মর্যাদার লড়াই। দারুণ এক সেঞ্চুরিতে মোহামেডানকে জয় এনে দিলেন শামসুর রহমান শুভ। সেদিনের সেই ১০৫ রানের অপরাজিত ইনিংসের কথা গতকালও ঘুরেও ফিরে এল। সেই ইনিংসের অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে শুভ বলেন, ‘হ্যা, আগের অভিজ্ঞতা তো অবশ্যই কাজে লেগেছে। প্রথমে আমি চিন্তা করেছিলাম যে, আমি আর জিয়া পজিটিভ খেললে ম্যাচে আমাদেরও জন্য দারুণ একটা সুযোগ থাকবে। প্রথম পাওয়ার প্লেতে আমাদেরও ফ্রি লাইসেন্স দিয়েই পাঠানো হয়েছিল। এরপর মুশফিক, নাসির, রিয়াদ ভাইয়ের মতো ব্যাটসম্যান ছিল। তাই আমরা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাই খেলেছি। আমরা আউট হয়ে গেলেও তাদের জন্য পরেও আমরা ভাল মতো ম্যাচে কামব্যাক করতে পারতাম।’
অনেকদিন ধরে ঘরোয়া লিগে নিয়মিত পারফরম করে গেলেও এবার প্রথম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুভ নিজের পরিচয় জানান দিলেন। শুভ নিজেও জানালেন, অপেক্ষাটা একটু বেশিই হয়ে গেছে, ‘হ্যা, একটু বেশিই সময় লাগলো। তবে, শেষ পর্যন্ত যে কিছু একটা করতে পেরেছি সেজন্য আমি অনেক বেশি খুশি।’
প্রথম দুই ওয়ানডেতে ব্যাট হাতে তেমন কিছু করে দেখাতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। তবে, গতকাল ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামে নতুন রূপেই হাজির হল দলটি। বাংলাদেশের সামনে ছুঁড়ে দিল ৩০৮ রানের লক্ষ্য মাত্রা। দিনের নায়ক শামসুর রহমান শুভ জানালেন, রান তাড়া করে জয়ের জন্যই মাঠে নামে বাংলাদেশ, ‘ওয়ানডে ক্রিকেটে ৩০০ রান তাড়া করা খুব একটা বড় ব্যাপার না। আসলে ওই সময় আমরা এতো কিছু চিন্তা করিনি। আমরা জয়ের জন্যই খেলেছি। ৩০৭ রান তাড়া করা তেমন কোন বড় ব্যাপার না। উইকেটটা ব্যাটিংয়ের জন্য ভাল ছিল। তাই আমরা জানতাম, সব ব্যাটসম্যানরা পারফরম করতে পারলে আর আমরা পার্টনারশিপ পেলে অবশ্যই জিততে পারবো।’
এই অসীম আত্মবিশ্বাসই এখন বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় শক্তি!
স্কো র কা র্ড
নিউজিল্যান্ড রান বল ৪ ৬
ডেভচিস ক রাজ্জাক ব মাহমুদউল্লাহ ৪৬ ৩৮ ৮ ০
ল্যাথাম ক মুশফিক ব রুবেল ৪৩ ৭৩ ০ ২
এলিয়ট ক সোহাগ ব রাজ্জাক ৩ ৫ ০ ০
টেলর অপরাজিত ১০৭ ৯৩ ৯ ৩
মুনরো ক মুশফিক ব মাহমুদউল্লাহ ৮৫ ৭৭ ৭ ২
অ্যান্ডারসন ক জিয়া ব সোহাগ ১ ৪ ০ ০
রনচি অপরাজিত ১৩ ১০ ২ ০
অতিরিক্ত (লেবা-৩, ও-৬) ৯
মোট (৫০ ওভারে) ৩০৭/৫
বোলিং: মাশরাফি ৮-০-৭৩-০, রুবেল ৬-০-৩৮-১, সোহাগ ১০-০-৬৭-১, রাজ্জাক ৯-০-৫৭-১, নাসির ১০-১-৩৩-০, মাহমুদউল্লাহ ৭-০-৩৬-২।
বাংলাদেশ রান বল ৪ ৬
সামসুর ক রনচি ব অ্যান্ডারসন ৯৬ ১০৭ ৭ ৪
জিয়াউর ক মিলনে ব ম্যাকক্লেনাগান ২২ ২০ ২ ২
মুমিনুল ক ও ব ডেভচিস ৩২ ৩৩ ৪ ০
মুশফিকুর ক টেলর ব ম্যাককালাম ২ ৪ ০ ০
নাঈম রান আউট ৬৩ ৭৪ ৫ ০
নাসির অপরাজিত ৪৪ ৩৮ ৫ ১
মাহমুদউল্লাহ ক রনচি ব ম্যাকক্লেনাগান ১৬ ১৩ ১ ০
সোহাগ অপরাজিত ১১ ১০ ২ ০
অতিরিক্ত (বা-৪, লেবা-৩, ও-৯, নো-৭) ২৩
মোট (৪৯.২ ওভারে) ৩০৯/৬
বোলিং:মিলস ৮-১-৫৫-০, মিলনে ৭-০-৪৬-০, ম্যাকক্লেনাগান ৯.২-০-৬৫-২, অ্যান্ডারসন ১০-০-৫৬-১, ম্যাককালাম ৮-০-৪৪-১, ডেভচিস ৭-০-৩৬-১।
ফল: বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী
সিরিজ: বাংলাদেশ ৩-০ ব্যবধানে জয়ী
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: সামসুর রহমান
ম্যান অব দ্য সিরিজ: মুশফিকুর রহিম
সেরা ব্যাটসম্যান: নাঈম ইসলাম (১৬৩ রান)
সেরা বোলার: জিমি নিশাম (৮ উইকেট)।
