ইরান ইস্যুতে মানসিকতা পরিবর্তনের ইঙ্গিত

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৪০
বিশ্ববাসী গত কয়েকদিনের মধ্যে বেশ চমত্কার এবং গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির এক সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছে। সমপ্রতি নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেল। সেটা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশের প্রেসিডেন্টের টেলিফোনে যোগাযোগ স্থাপন। যা কিনা ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম এবং তাদের মধ্যে কথোপকথনটি হয় রোহানী যখন দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে তার অফিসিয়াল গাড়ি লিমজীনে চেপে বিমানবন্দরের দিকে রওনা দিয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের আশীর্বাদে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে আরও একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেল। কেউ কেউ বলতে পারেন, এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি জাতিসংঘে পূর্বে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ জাভাদ জারিফের মধ্যকার আলাপ-আলোচনারই ফসল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানীর (পি৫+১) কূটনীতিকবৃন্দ এ আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। এই ইস্যুতে জেনেভায় ১৫ অক্টোবর থেকে আলোচকবৃন্দ স্বাধীন আলোচনাকে প্রাধান্য দেন। ইরান অসন্তুষ্টির কারণে পূর্ববর্তী আলোচনাগুলো বিলম্ব হয়েছে। এর ফলে আলোচনাসমূহ ইস্তাম্বুল, বাগদাদ, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সফর এর মাধ্যমে হয়েছে। আলোচনাকালে পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী জারিফ ইরানের সভাপতিত্ব করেন। জারিফ সরাসরি প্রেসিডেন্ট রোহানীর সাথে আলোচনা করেন আর রোহানী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনীর সাথে কথা বলেন, এ অগ্রগতি ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে। হাসান রোহানীর সাথে ওবামার আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক ও ডিজিটাল কূটনীতির ক্ষেত্রে মাইল ফলকরূপে বিবেচিত হচ্ছে। ওবামার কাছে রোহানীর টুইট বার্তা ও ওবামার সাড়া দান ইতিহাসে জীবন্ত হয়ে থাকবে। আরও একটি চমত্কার ব্যাপার হল, ওবামা কর্তৃক ফার্সী ‘খোদা হাফিজ’র ইংরেজীতে অনূদিত রূপের ব্যবহার। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে টুইটার ব্যবহূত হওয়ায় সাধুবাদ জানিয়েছেন টুইটারের প্রধান নির্বাহী ডিক কস্তলো। উভয় দেশের প্রেসিডেন্টই ‘পারমাণবিক ইস্যু’ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমাধানের জন্য পারস্পরিক রাজনৈতিক সহযোগিতার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ওবামা ইরানের জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং উভয় দেশের মধ্যে বিরাজমান অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের আশা প্রকাশ করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তৃতাকালে অত্যন্ত মার্জিতভাবে ওবামা এবং রোহানী তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। ওবামা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন চায় না। বিশেষজ্ঞরা এ আলোচনার একটি বিষয় তুলে ধরেন। ওবামা তার আলোচনায় বলেন, ‘পরীক্ষাটি হবে স্বচ্ছ ও যাচনযোগ্য কার্যক্রম এবং সমন্বিত আন্তর্জাতিক অনুমোদন সাপেক্ষে’। এ ধরনের বক্তব্য ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে বিবেচ্য হবে। এ ধরনের গঠনমূলক একতা ইসরায়েলী নেতৃত্বের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে বলে গণ্য করা হচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেয়ার আগেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে উড়াল এ ধরনের ইঙ্গিত দেয়। যুক্তরাষ্ট্র কী বলেছে তিনি তা পুনরায় জানতে চেয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ‘মিষ্টি কথা’য় ভুলার ব্যাপারেও সতর্ক করে দিয়েছেন। পরবর্তীতে ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অধিবেশনে নেতানিয়াহু তার কর্কশ ও যুদ্ধবাজ কণ্ঠে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কার্যক্রম ‘আছে’ এবং ‘নাই’ এ দুটোর সত্যতা বিষয়ে তার সন্দেহ ছুঁড়ে দেন। সিএনএন-এ দেয়া রোহানীর ‘ভেড়ারূপী নেকড়ে’ বিবৃতি উল্লেখ করে নেতানিয়াহু ইরানের নব প্রেসিডেন্ট রোহানীকে অভিযুক্ত করেন। ইসলামী শাসন ব্যবস্থার একজন ‘বিশ্বস্ত কর্মী’ উপাধি দিয়ে রোহানীকে বিশ্বাস না করার আহ্বান জানান। সমপ্রতি সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে জন কেরি ও জাভাদ জারিফ উভয়ই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এবং এটাও জানিয়েছেন, এখনও অনেক কাজ বাকি। সামপ্রতিক বছরগুলোতে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের সাথে সচেতন দেশগুলোর মধ্যকার বেশ কয়েকবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী বৈঠক হবে জেনেভাতে ইরানের নতুন একটি দলের সাথে পি৫+১ এর। অভিজ্ঞ পারমাণবিক আলোচক হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফই প্রেসিডেন্ট হাসান রোহানীর কাছে সরাসরি রিপোর্ট করবেন। জারিফ জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ছিল একেবারেই শান্তিপূর্ণ। তিনি বলেন, ইরান আশা করে যে অদূর ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয়, একপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সকল অনুমোদনই তারা পাবে। রোহানী আশা করেন, তার পূর্বসূরী মাহমুদ আহমেদিনিজাদের বক্তব্য ও পররাষ্ট্রনীতির বাইরে গিয়ে পারমাণবিক বিরোধের ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদন করতে পারবেন। আমেরিকানরা বলছে, যতক্ষণ না ইরান কোন পারমাণবিক অস্ত্র চায় না এ ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে নিশ্চিত করতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ইরানকে কোন ছাড় দেয়া হবে না। জবাবে ইরান কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘে রোহানীর দেয়া ভাষণের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রোহানীর ভাষ্যমতে, কোন রাষ্ট্রেরই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়া উচিত নয় এবং বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। রোহানী আন্তর্জাতিক সমাজকে নিশ্চিত করেছেন যে, তিনি এই ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনী কর্তৃক নিযুক্ত। পি৫+১ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র উত্পাদন বিরতি এবং ২০ শতাংশেরও নিম্নে ইউরেনিয়াম এনরিচম্যান্ট রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তারা ফর্ডো গোপন সমৃদ্ধি সুবিধা বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে, বিনিময়ে ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশকিছু সহজ অনুমোদনের আশ্বাস দিয়েছে। পারমাণবিক চুল্লীর জ্বালানি ও বিমান চালনার ক্ষেত্রেও বেশকিছু অনুমোদনের আশ্বাস দিয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ক্যাথরিন এ্যাস্টন ইরানের কর্মকর্তাদের সাথে জাতিসংঘের আলোচনা, চলমান বিরোধ নিরসনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন এবং তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন ১৫ থেকে ১৬ অক্টোবর জেনেভায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে সে ব্যাপারে ইতিমধ্যেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। ইরান পূর্বে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি এবং পরবর্তীকালে সামপ্রতিক অগ্রগতিতে তারা আরও অগ্রগতিতে এগুতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এরই মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার দেশের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সমৃদ্ধি অর্জনের অধিকারকে সমর্থন দিয়ে বলেছেন, তেহরানের সামরিক প্রহরার ক্ষেত্রে ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ করার কোন প্রয়োজন ছিলো না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কোনরকম পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে না, এটা প্রমাণের জন্য আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ইরান পরিদর্শনের জন্য তারা সবসময় প্রস্তুত আছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, রোহানী আয়াতুল্লাহ খামেনীর সাথে একটি গোপন মৈত্রী গঠন করতে চেয়েছিল, দুইজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের জানাশোনা ও বিশ্বস্ততা আছে। ১৭ সেপ্টেম্বর দেয়া আয়াতুল্লাহর বিবৃতি ‘কূটনীতিতে বীরোচিত নমনীয়তা’র মাধ্যমে তাদের বিশ্বস্ততা প্রমাণ পায় । বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, রোহানী ইরানের সাথে বিশ্বের বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে কেবল অসন্তুষ্টই নন, তিনি এর শান্তিপূর্ণ সমাধানও চেয়েছেন। ইরানের বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণের প্রতি রোহানীর অঙ্গীকার ছিল ‘দূরদর্শী ও আশা-আকাঙ্ক্ষার সরকার’। এটা স্পষ্ট যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের এই পরিবর্তন তার প্রচেষ্টারই প্রথম সাফল্য। এরই মধ্যে তিনি আহমেদিনিজাদের গড়া পারমাণবিক কার্যক্রম প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন এনেছেন। শুধু ইরান নয় সকল ওইসিডি দেশগুলোর জন্যই রোহানী নিউইয়র্কে আলোচনায় অংশ নেয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। এ সাফল্যের জন্য রোহানী সাধুবাদ পাবার যোগ্য এবং পাশাপাশি আমরা এও আশা করতে পারি ইসরায়েল-ইরান সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ রোহানী সফলভাবেই মোকাবিলা করতে পারবেন। বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে যে বিবর্তণ লক্ষ্যণীয় তা হলো তার গুরুত্ব ইউরোপ ও এমেরিকা অনুধাবন করতে পারছে। অন্যদিকে এর কারণে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমেরিকা ও সৌদি এরাবিয়ায় মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। তার কারণে এমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী বর্তমানে সৌদি এরাবিয়ায় সফর করছেন। ভাষান্তর :আকলিমা জান্নাত আরজু  লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন