গত অক্টোবরের ভয়াবহ দাবানলে আষ্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েল্স রাজ্যের একটি বড় এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখায় ধ্বংস হয়েছে ২০০ ঘরবাড়ী, ক্ষতিগ্রস্ত্ত হয়েছে ১৫০টি, পুড়ে গেছে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর বনাঞ্চল। এবারের দাবানলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সিডনী শহরের পশ্চিমে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ব্লু মাউন্টেইন এলাকা । এই এলাকার শত শত মানুষ হয়েছেন গৃহহারা। এবারের দাবানল অন্যান্যবারের তুলনায় বেশ আগেই দেখা দিয়েছে আর আগুনের গতি ও তীব্রতা নিউ সাউথ ওয়েলেসর অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক এবং দমকল কর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও দাবানল নিয়ন্ত্রণে না আসলে এক পর্যায়ে জরুরী অবস্থা জারি করতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরী সেবা প্রদান এবং জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতেই কর্তৃপক্ষ এই ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হন। তবে সময় সময় দমকা ঝড়ো হাওয়া দাবানলকে আরো তীব্র করে তোলে। ব্লু মাউন্টেন ও আশপাশের এলাকার আগুনের সৃষ্ট ছাই ও ধোঁয়ায় সিডনী শহরের আকাশ তামাটে বর্ণ ধারণ করে। পোড়া গন্ধে রীতিমত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দূর নিলীমায় শহরের রক্তাভ স্কাই-লাইন দেখে মনে হচ্ছিল দাবানল সিডনী শহরকে গ্রাস করলো বুঝি।
বনাঞ্চলের দাবানল অষ্ট্রেলিয়ার জনগণের জন্য নতুন কিছু নয়। গ্রীষ্মের শুরুতেই শুষ্ক ও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে দেশজুড়ে গড়ে ৫০ হাজারেরও বেশী ছোট-বড় দাবানল হয়। অষ্ট্রেলিয়ায় ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দাবানলে পুড়ে নিহত হয়েছে ২০০ জন। দাবানলে জন্য প্রতি বছর বাড়ী-ঘর, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২ বিলিয়ন ডলার। দাবানলের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ অংক কষে বের করা সম্ভব নয়। তবে দাবানল যে কেবল ধ্বংস করেই চলে তা নয়, বন-বাদাড়ের জন্য কিছু কল্যাণও বয়ে আনে। যেমন আগুনে বনাঞ্চল পুড়ে গেলেও ওই এলাকায় নতুন গাছ, লতাপাতার পুনর্জন্ম হয়, প্রকৃতি নতুন রূপে সাজে। এছাড়া দাবানলের উষ্ণতায় ইউকেলিপ্ট এবং ব্যাঙ্কসিয়া প্রজাতির বেশ কিছু গাছপালার বীজ খোসা ছেড়ে অংকুরিত হয়। দাবানল বলতে গেলে প্রাকৃতিক কালচক্রেরই একটি অধ্যায় ।
বিভিন্ন কারণে দাবানলের সৃষ্টি হয়। যেমন বনাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ডাল-পালা, শুকনো পাতায় উষ্ণ আবহাওয়া কিংবা বজ্রপাতের কারণে খুব সহজে আগুন ধরে যেতে পারে। ইউকেলিপ্ট গাছের মধ্যে যে তেল রয়েছে তা দহনপ্রক্রিয়ার জ্বালানি হিসাবে কাজ করে বলে বনাঞ্চলের আগুন সহজেই নির্বাপিত হয় না। অষ্ট্রেলিয়ানরা ঘরের বাইরে, বনাঞ্চলে বার্বিকিউ এবং ক্যাম্পিং করতে খুব পছন্দ করে। এজন্য অনেক সময় আশ-পাশের গাছপালায় আগুন লেগে যায়। তাছাড়া কৃষিএবং ওয়েল্ডেং-এর কাজে ব্যবহূত যন্ত্রপাতিও দাবানলের অন্যতম কারণ।
অষ্ট্রেলিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ক্রিমিনলজী যেসব কারণে অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের সৃষ্টি হয়ে থাকে সে নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে , প্রাকৃতিক কারণে আগুন লাগার হার হল মাত্র ৬ শতাংশ আর অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনামূলক কারণে ৩৫ শতাংশ। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হল, শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছায় অগ্নিসংযোগের জন্যই দাবানলের সৃষ্টি হয়। অষ্ট্রেলিয়ার আইনে স্বেচ্ছায় অগ্নিসংযোগের জন্য শাস্তি হল ১০ থেকে ২৫ বছরের জেল। অপরাধী যদি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী হয় তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও ভোগ করতে পারে। কিন্তু আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু নরাধম প্রতিবছরই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
দুঃখজনক হল, প্রকৃত অপরাধী খুব কমই ধরা পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হবার কারণে খুব সহজেই পার পেয়ে যায়। নিউ সাউথ ওয়েলেস অক্টোবরের দাবানলের সময় বেশ কিছু কিশোরের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় আগুন লাগানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। যাদের মধ্যে একজনের বয়স মাত্র ৮ বছর! নিউক্যাসেল বিমান বন্দরের কাছের একটি বনাঞ্চলে ওরা আগুন লাগিয়ে দিলে খোদ বিমানবন্দর পুড়ে যাবার উপক্রম হয়। তবে জানা গেছে, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সামরিক মহড়া চলাকালীন দুর্ঘটনাবশতঃ এবার ব্লু্লু-মাউন্টেন এলাকায় আগুন লেগে যায়। এজন্য প্রতিরক্ষা বাহিনী জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে।
দাবানলের মত জাতীয় বিপর্যয়ের সময় দল-মত নির্বিশেষে অষ্ট্রেলিয়ার জনগণ যেভাবে পুনর্বাসনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন তা সত্যিই অনুপ্ররেণাদায়ক এবং অনুকরণীয়। দমকল বাহিনীর কর্মী ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিক স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করার জন্য জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও এগিয়ে আসেন। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের নিজ নিজ অফিস থেকে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করার জন্য ছুটি দেয়া হয়। এবার দমকল বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৪০ হাজারেও বেশী স্বেচ্ছাসেবক দাবালন নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করেছেন।
সিডনীর বিভিন্ন জনকল্যাণ ও কম্যুনিটি সংগঠনগুলো দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তহবিল সংগ্রহে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কম্যুনিটিও হাত খুলে দান করছে । বিভিন্ন এলাকার রোটারী ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব যারা ঘরবাড়ী হারিয়েছেন তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করছে। সিডনীর জনপ্রিয় টেবলয়েড পত্রিকা ডেইলি টেলিগ্রাফ তাদের প্রতিটি বিক্রীত কপি থেকে অর্জিত অর্থ হতে এক ডলার করে বুশ ফায়ার তহবিলে দান করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া তহবিল সংগ্রহ করছে রেডক্রস, সেলভেশন আর্মি, ভিন্সেন্টে দ্যা পল সোসাইটির মতো দাতব্য সংস্থা। কোল্স, উলওয়ার্থ, এবং টার্গেট-এর মতো মেগা ডিপার্টমেন্ট ষ্টোরগুলোও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বীমা কোম্পানীগুলোও নেই বসে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্লেম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হচ্ছে যাতে বীমার অর্থ দিয়ে নতুন করে তারা বসতবাড়ী নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেন।
অষ্ট্রেলিয়ার গবেষণা সংস্থা CSIRO, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই দাবানলের তীব্রতা বাড়ছে বলে দাবি করেছে। উল্লেখ্য, গত দুই দশকে অষ্ট্রেলিয়ার আবহাওয়ার লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়েছে। সিডনী আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যানুযায়ী এ বছরের অক্টোবর মাসের তাপমাত্রা গত ১৫০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্রধান সিডনীর দক্ষিণাঞ্চলের মারাত্মক দাবানলের সাথে বিশ্ব উষ্ণায়নের সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন । উন্নয়নের ঘোড়দৌড়ে এগিয়ে থাকার জন্য প্রকৃতিকে ধ্বংস করে বিশ্বব্যাপী যে উন্নয়নের কাজ চলছে তাতে গ্রিনহাউস গ্যাসনিঃসরণ এবং ভূপৃষ্টের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জলবায়ুতে পরিবর্তন আসছে। আর এজন্য প্রকৃতি নয় আমরাই দায়ী। প্রকৃতির সাথে সহ-অবস্থান করে অর্থনীতির বিস্তার ঘটাতে ব্যর্থ হলে জলবায়ু পরিবর্তনের দাবানলে সবাইকে একদিন পুড়তে হবে।
লেখক : সিডনী প্রবাসী প্রকৌশলী
