বর্তমান মহাজোট সরকার শিক্ষাখাতে কতিপয় যুগান্তকারী সাফল্যের পরিচয় দিয়াছে। ক্ষমতারোহণ করিয়াই ২০০৯ সালে চালু করা হয় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। চালু হয় জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বা জেএসসি পরীক্ষাও। যাহারা তখন শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষাময় হইয়া যাইতেছে বলিয়া সমালোচনা করিয়াছিলেন, আজ তাহাদের কণ্ঠ আর উচ্চকিত নহে। কেননা ইহা ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করিয়াছে। এই বত্সর পঞ্চমবারের ন্যায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইতে যাইতেছে। প্রথম বত্সর যেইখানে ২২ লক্ষ শিশু এই পরীক্ষায় অংশ নিয়াছিল, সেইখানে এইবার পরীক্ষা দিবে ৩০ লক্ষ শিশু। বলাবাহুল্য, ইহাই সবচাইতে বড় পাবলিক পরীক্ষা। শুধু স্কুল নহে, ২০১০ সাল হইতে একই সময়ে মাদ্রাসার ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হইতেছে। এই বিশাল পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য একটি পৃথক শিক্ষা বোর্ডের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
উল্লেখ্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় গত পাঁচ বত্সর ধরিয়া বলিয়া আসিতেছে যে, প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ড নামে একটি আলাদা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এই ব্যাপারে গত বত্সর মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ঘোষণাও দেন। কিন্তু আজও তাহার বাস্তবায়ন হয় নাই। জানা মতে, এই সংক্রান্ত প্রক্রিয়া অনেক দূর আগাইয়া গিয়াছে। তবে ইহার প্রধান অন্তরায় অর্থ সংকট। এই খাতে অর্থ বরাদ্দ না পাইলে অবকাঠামোসহ অন্যান্য কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব নহে। জনবল নিয়োগ ও অফিস ব্যবস্থাপনা হইতে শুরু করিয়া সকল কিছুর জন্য সর্বাগ্রে দরকার অর্থ। কিন্তু এইখানেই নিরাশার ছাপ লক্ষ্য করা যাইতেছে। আমরা আশা করি, শত প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মাঝেও সরকার এই ব্যাপারে যথাসম্ভব দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকলের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র এই দায়িত্ব অবহেলা করিতে পারে না। বরং এই দায়িত্ব সুচারুভাবে পালনের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও তাহার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশ ‘সবার জন্য শিক্ষা’ সংক্রান্ত বিশ্ব ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী অন্যতম দেশ। ইহার প্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালে প্রণয়ন করা হয় কম্পালসরি প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট। ফলে প্রাথমিক শিক্ষাকে আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে। ইহাতে এই স্তরে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও বাড়িতেছে দিন দিন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯ সালে প্রাথমিক স্তরে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬৫ লক্ষ ৩৯ হাজার ৩৬৩ জন। এতদিনে এই সংখ্যা আরও বাড়িয়াছে নিশ্চয়ই। আবার এই কথাও সত্য যে, গত এক দশকে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার অনেক উন্নতিও হইয়াছে। ২০০৩ সালে এই সংক্রান্ত একটি পৃথক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি তাহার জ্বলন্ত প্রমাণ। এখন এই মন্ত্রণালয়ের অধীনে পৃথক বোর্ড গঠনের দাবি জানানো অযৌক্তিক হইতে পারে না।
জানা যায়, প্রতি বত্সর আমাদের দেশে এসএসসি কিংবা এইচএসসি পর্যায়ে ১০ হইতে ১৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এই সংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারাদেশে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড রহিয়াছে যাহারা আঞ্চলিক ভিত্তিতে এই পরীক্ষাগুলি আয়োজন করিয়া থাকে। তাহা হইলে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৩০ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক শিক্ষা বোর্ড থাকিবে না কেন? ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা আয়োজন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে নানা জটিলতার সৃষ্টি হইয়াছে। এই পরীক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই ধরনের শিক্ষা বোর্ড গঠন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। অনুরূপভাবে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার সুষ্ঠু আয়োজনে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড নামেও আরেকটি পৃথক শিক্ষা বোর্ড গঠন করা যাইতে পারে। দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা খাতেও দৃষ্টিগ্রাহ্য উন্নতি দেখা দিবে, ইহাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।
