আলোকপাত

শিশুর দু’তিন বছরের মনের জগত্

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৪৩
দুই বছরের পর থেকে বাচ্চাদের জীবন-যাপনের চাহিদা বাড়তে থাকে। তারা নিজেদের মধ্যে তৈরি করে স্বপ্নের এক মায়াময় জগত্। সেখানে থাকে তার মা-বাবা, ভাই-বোনও। আবার অনেক সময় কাল্পনিক বন্ধুও তৈরি করতে পারে সে। এই শিশুই তার স্বপ্নের জগেক বাস্তব ভেবে বাবা-মায়ের কাছে বিভিন্ন সময়ে গল্প করতে পারে। অনেক বাবা-মা এ ধরনের গল্প শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকে শিশুকে মিথ্যুক বিশেষণ দেন। অনেকে আবার চালাক, দুষ্টু, চাপাবাজ এসব বলে শিশুর নিষ্পাপ মনকে বিক্ষত করেন। তবে ঐ বয়সী শিশুর আচরণে ঐ বিশেষণ কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। বরং সে নিজেকে ঐ বিশেষণের সাথেই পরিচিত করে তোলে। এমনকি সে এটাকে তার পরিচিতি বা আইডেন্টিটি মনে করে বড় হতে থাকে। পরবর্তীতে ঐ শিশুই যখন বড় হয়ে সত্যি সত্যি মিথ্যুক, চালবাজ বা চাপাবাজ হয়, তখন অনেক বাবা-মাকেই হায় হায় করতে শোনা যায়। মা-বাবা ভাবেন আমার ছেলে বা মেয়েটি কীভাবে এমন হল! আত্মীয়-স্বজনও ভাবেন, মা-বাবা-দাদা-দাদী এতো ভালো, ছেলেটা কীভাবে বখে গেলো! নিজেদের মনে এমন নানা প্রশ্ন তারা হাতড়ে বেড়ান। আসলে ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে অজ্ঞতাবশত মা-বাবা তাদের শিশুকে অন্ধকারে ঠেলে দেন। শিশুদের মানসিক বিকাশের গবেষণায় দেখা গেছে, দু’তিন বছরের শিশুরা মনের ভেতরে এক স্বাপ্নিক জগত্ লালন করে। সেই জগেক সে নিজের মতো করে ভাঙে, গড়ে। এরই অংশ হিসেবে ঐ বয়সে সে নিজের মতো করে স্বাধীন খেলা বেছে নিতে পছন্দ করে। অন্যদের সাথে শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে খেলতেও পছন্দ করে। এ সময় তারা অযৌক্তিক বা সঠিক-বেঠিক বিষয়গুলোও একটু একটু করে বুঝতে শুরু করে। ঠিক সে সময় যদি বিভিন্ন অপরাধমূলক বিশেষণে শিশুর ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পরিবার থেকে তথা নিজের জগত্ থেকেই প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্যে ভালো-মন্দ বা সত্য-মিথ্যা নিয়ে তৈরি হয় একধরনের দ্বিধা। সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই বিশেষণের মধ্যে তার পার্থক্য করার ক্ষমতা কমে যায়। শিশু যেদিন প্রথম আম খায়, বড়রা তাকে আমের নাম ও স্বাদের সাথে পরিচিত করে। তাকে বলা হয়, এটা আম, উমমম... দারুণ, মজা বা মিষ্টি। এরপর থেকে সে কখনই আমকে জাম মনে করে না। আমকে আমই মনে করে। তেমনি ছোটবেলার কল্পনার গল্পগুলোকে বড়রা কল্পনা বা স্বপ্ন না বলে চাপাবাজি বলে অভিহিত করলে, সে ঐ বিশেষণগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করে। কারণ শিশুকালে ঐ স্বপ্নই তার কাছে বড় সত্যি। অর্থাত্ বাবা-মায়ের দেয়া বিশেষণ ‘মিথ্যা’/‘চাপাবাজি’/ ‘দুষ্টামি’ই তার কাছে বড় সত্যি হিসেবে ধরা দেয়। এভাবেই মিথ্যাচারিতা বা চাপাবাজি তার মনে সত্য ও ভাল হিসেবে গ্রথিত হয়। আর বাল্যকাল ও কৈশোরে ঐ আচরণে অভ্যস্ত হলে বড় হয়েও সেখান থেকে সে বেরিয়ে আসতে পারে না। মনে রাখতে হবে, পিতা-মাতার লালন-পালনের ধরন থেকেই শিশুর পরবর্তী বিকাশ হয়। এই বয়েসে অনেক শিশু অতিচঞ্চল শিশু নামেও আত্মীয়-স্বজন বা পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে অভিহিত হতে পারে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মা-বাবা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী অর্থাত্ বাসার বড়রা সবাই মিলে শিশুটিকে সময় দিন। মনোযোগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ক্রিয়েটিভ খেলাধুলা করুন। এতে শিশুর মনোযোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। একসাথে টিভি দেখার সময় শুধু টিভির দিকে তাকিয়ে না থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করুন। এতে শিশুটি মনোযোগী হবে। বড়দের সাথে তার সখ্যতা বাড়বে এবং অন্যদের সাথে তার যোগাযোগের দক্ষতা তৈরি হবে। পারিবারিক রীতিনীতি সম্পর্কেও শিশু পরিষ্কার ধারণা পাবে। পারিবারিক মূল্যবোধ গড়ে উঠবে। শিশুর ভাল কাজগুলোকে বারবার প্রশংসা করুন। তাহলে ভাল কাজ করতে সে উত্সাহী হবে। ভাল কাজের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। সর্বোপরি ছোট ছোট প্রশংসা শিশুর জীবনে অনেক বড় সফলতা বয়ে আনতে সক্ষম। লেখক :চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানে এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন