[ রা জ নী তি ]

হরতালে সহিংসতায় ভেঙে পড়ছে দেশের অর্থনীতি

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪০
শাহ আলমগীর আমার ভেতরে থাকা একটি ভুল ধারণা ভেঙ্গে দিলো। আলমগীর আমার কলেজ জীবনের বন্ধুর ছোটভাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছে। এখন তরুণ ব্যবসায়ী। ব্যবসা যতটা না করে তারচেয়ে বেশি করে রাজনীতি। বিএনপি রাজনীতির একজন সক্রিয় কর্মী। আমি যেহেতু কোনো দলীয় রাজনীতির সাথে নিজেকে কখনো জড়াইনি তাই টের পেলাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমার মধ্যে চিন্তার বা বোঝার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমি অভিজ্ঞতা থেকে একটি সরলীকরণ করেছিলাম। তা হচ্ছে ক্ষমতা-প্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যারা জড়িত থাকেন তাদের বেশিরভাগই দলন্তপ্রাণ এবং দলান্ধ হন। বিবেকের শাসনে চলেন না। দলের সকল সিদ্ধান্ত সঠিক বিবেচনা করেন এবং দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাতে দেশ ও দশের বক্ষ বিদীর্ণ করাও অন্যায় বিবেচনা করেন না। পরিবারের ভেতরেও রাজনীতিতে ভিন্ন মত পোষণ করলে তার মতামত সহ্য করতে চান না। বিপক্ষ দলের সাথে মানসিকভাবে একটি প্রতিযোগিতা কাজ করে। কিন্তু শাহ আলমগীরের মধ্যে আমি ভিন্নরূপ দেখতে পেলাম। সে দলন্তপ্রাণ। আরো বুঝতে পারলাম সে তার দলকে প্রচণ্ড ভালোবাসে বলে রাজনীতির স্বার্থে অন্ধত্ব বরণ করেনি। ওর বিচারে এবার বিএনপি নেতৃত্ব বড় রাজনৈতিক ভুল করে ফেললো। দলের সমূহ-ক্ষতি দেখতে পাচ্ছে সে। তাই সে ভীষণ বিষণ্ন ও কাতর। আলমগীরের বিচারে এবার নির্বাচনের মাঠে দল অনেকটা এগিয়ে ছিল। যেহেতু বিএনপির সাথে নানা দল যুক্ত আছে এবং জামায়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তাই বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও সংহতি দৃঢ় রাখার জন্য নেতৃত্বের অনেক বেশি সতর্ক থাকা উচিত ছিল। বড় দলগুলোর সঙ্গে যেসব দল জোটভুক্ত হয় তারা বড় দলের নেতৃত্ব মেনে চলে বলেই জোটের সংহতি বজায় থাকে। কিন্তু আলমগীর খুব শঙ্কিত। তার বিচারে জামায়াত যেভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তাতে দল হিসেবে বিএনপি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই বিএনপি কর্মীর ধারণা দলের সিনিয়র নেতাদের অনেকেই বিষয়টি বুঝতে পারছেন। কিন্তু দলীয় সভানেত্রীর অভিপ্রায়ের বাইরে যেতে পারছেন না। বিব্রতকর অবস্থায় আছে দলের অনেক শরিক। নানা করণেই বেগম জিয়া এবার ক্ষমতাসীন হতে চাইছেন। দলের ভালোমন্দের চেয়ে তাঁর পারিবারিক লাভক্ষতির প্রশ্নটি বড়। মাঠের রাজনীতিতে ছাত্রদল যুবদল তেমন সংগঠিত নয়। এই সুযোগটি জামায়াত নিয়ে নিয়েছে। জামায়াতের প্রশিক্ষিত শিবির কর্মীরা মাঠের দায়িত্বে রয়েছে। এভাবে চাতুরতার সঙ্গে জামায়াত একদিকে নিজের প্রতি বিএনপির নির্ভরশীলতা বাড়িয়েছে অন্যদিকে বিএনপিকে সংগঠিত হতে দেয়নি। জামায়াত কিছুটা অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। সাজাপ্রাপ্ত ও আটক যুদ্ধাপরাধী নেতাদের মুক্ত করার প্রয়োজন আছে। তাই সরকারকে অস্থির করে তোলা জরুরি। এসব বিবেচনায় বিএনপিকে বিপাকে রেখে ধীরে ধীরে জামায়াত বিরোধী দলীয় রাজনীতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাচ্ছে। আলমগীরের বিশ্বাস এই লক্ষ্যে জামায়াত তাদের নেত্রীকে প্রায় হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলেছে। বিষয়টি আলমগীরের কাছে আরো স্পষ্ট হয়েছে ২৫ অক্টোবরের জনসভায়। জনসভার সামনের কাতারে ছাত্রদল যুবদলকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। পুরোটাই যেন শিবিরের দখলে। এটি ওদের পরিকল্পনার অংশ। কারণ সকাল থেকেই ছাত্রদল-বিএনপি সমর্থকরা আসার আগেই তারা জায়গা দখল করেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিজের চোখে দেখে শঙ্কিত হয়েছে শাহ আলমগীর। আর বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে বেগম জিয়ার মনোযোগও ছিল নিজ দল নয় শিবিরের ছেলেদের দিকে। অরাজকতা বাধানোই এখন জামায়াত শিবিরের লক্ষ্য। সুচতুরভাবে তারা একাজে বিএনপির ব্যানার ব্যবহার করছে। কিছুক্ষণ পরপরই ওরা হরতাল হরতাল স্লোগানে দাবি জানাচ্ছিল। বেগম জিয়াও তাদের তত্পরতায় উত্ফুল্ল ছিলেন। তাই বক্তৃতায় জামায়াত শিবিরের প্রসঙ্গ গুরুত্বের সাথে নিয়ে এলেন। শিবির সভাপতি গ্রেফতারের বিষয়টির ওপর জোর দিলেন। যুদ্ধাপরাধী বিচার নিয়ে বরাবরের মত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন। আলমগীর মনে করে জনসভায় দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে হরতাল প্রত্যাহার করে নিলে দলগতভাবে দেশে-বিদেশে বিএনপির সম্মান বাড়তো। তার বিশ্বাস এটি সম্ভব হয়নি জামায়াতের চাপের কারণে। কারণ হরতালের মধ্যদিয়ে দেশজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি জামায়াতের ছিল। যে হরতাল সহজেই এড়ানো যেত সে হরতালে যুক্ত হয়ে এবং জামায়াত শিবিরের অংশীদার হয়ে বিএনপি ভোটের মাঠে নিজের অনেকটা ক্ষতি করলো বলেই এই বিএনপি কর্মীর ধারণা। আলমগীর কাতর কণ্ঠে বলল, আমরা সাধারণ মানুষের ভাষা যেভাবে বুঝি আমাদের নেতারা হয়তো সেভাবে বোঝার চেষ্টা করেন না। জনজীবনকে এইভাবে বিপর্যস্ত করা, ককটেলের খই ফোটানো, বাস ডিপোর নিরাপদ আশ্রয়ে কোটি কোটি টাকার বাস পুড়িয়ে দেয়া, রেললাইন উপড়ে ফেলা, রেলের বগিতে আগুন দেয়া এসব বিএনপি কর্মীদের কাজ নয়। তবুও এসবের দায় বিএনপিকে নিতে হবে। আহত-নিহতদের দায় থেকেও বিএনপি মুক্তি পাবে না। এসবে বিএনপিমনা অনেক মানুষও আজ বিক্ষুব্ধ। আমি বুঝতে পারলাম দলের প্রতি ভালোবাসায় আলমগীর বিএনপি বা ছাত্রদল, যুবদলকে একেবারে দায়মুক্ত করতে চাইছে। শাহ আলমগীরের আক্ষেপ এবার একটি জেতা খেলাকে জামায়াতের পাল্লায় পড়ে গুবলেট করে দিচ্ছেন বিএনপি নেতা-নেত্রীরা। ব্যাকফুট থেকে আওয়ামী লীগ ক্রমে সামনে পা ফেলছে। এটি সম্ভব হচ্ছে বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই। দিনভর টিভি চ্যানেলগুলো দেশজুড়ে হরতালের সচিত্র খবর দেখাচ্ছিল। দু’দিনে বেশ কয়েকটি প্রাণ ঝরে গেল। চট্রগ্রামে পিকেটারদের ইটে আহত ট্রাক ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাক নিয়ে খাদে পড়ে গেলে নিহত হলেন ড্রাইভার। লালমনিরহাটে পিকেটাররা রেললাইন তুলে ফেলায় ট্রেন লাইনচ্যুত হলো। আহত হলো অনেক যাত্রী। পিকেটারদের দেয়া আগুনে রেলের বগিসহ নানা যানবাহন জ্বলছে। পিকেটাররা ব্যাগ থেকে নিয়ে মুড়ি-মুড়কির মত ককটেল, হাতবোমা, পেট্রোল বোমা ছুঁড়ছে গাড়ি ও পুলিশের ওপর। ককটেলের আঘাতে চোখ উড়ে গেল একজন নিরীহ রং মিস্ত্রীর। অগ্নিদগ্ধ অটোচালক কাতরাচ্ছেন মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। ককটেলের আঘাতে আহত শিশুদের রক্তাক্ত ছবি ছাপা হচ্ছে পত্রিকায়। পিকেটারদের দেয়া আগুনে সিএনজি অটো জ্বলছে আর অসহায় দরিদ্র চালক সেদিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। রাস্তার পাশে পার্ক করা প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, পিকআপ মহাউল্লাসে ভাঙ্গছে। এসব সচিত্র প্রতিবেদন দেখে মনটা যখন বেদনার্ত হয়ে উঠলো তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল সুললিত শব্দ চয়নে প্রেসব্রিফিং দিচ্ছিলেন। তালিকা দেখে দেখে বলছিলেন রাজধানীর কোথায় কোথায় বিএনপি ও ছাত্রদলের ‘শান্তিপূর্ণ’ মিছিল থেকে কতজন কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করলো। পুলিশের লাঠিতে বা রাবার বুলেটে কতজন আহত হলো। দেশজুড়ে যে অরাজকতা চালাচ্ছে সে ব্যাপারে টুশব্দটিও নেই। হয়তো হরতালের শেষের দিন এই মির্জা সাহেবরাই লাশের মিছিলের ওপর দাঁড়িয়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদের ধ্বংসাবশেষ মাড়িয়ে দক্ষ প্রতারণার শব্দে দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাবেন ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে’ হরতাল পালন করার জন্য। আমাদের জাতীয় নেতাদের দশা দেখে সন্ধ্যায় বড় অসহায় বোধ করলাম। রাজধানীর মৌচাকে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের গাড়িতে ছাত্রদলের মিছিল থেকে হামলা চালানো হলো। এদের ছোঁড়া বোমার আঘাতে আহত হলেন রিপোর্টার। তখন তিনি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। অথচ সামান্য মানবিকতা না দেখিয়ে সততার কাছে দায়বদ্ধ না থেকে মির্জা ফখরুল জানিয়ে দিলেন এটি ছাত্রদলের কাজ নয়। বিএনপি-ছাত্রদলের ছেলেরা কোনো অন্যায় করতে পারে না। বোমা ছুঁড়তে জানে না। এটি কেউ সাবোটাজ করেছে। বোঝা গেল আমাদের রাজনীতিকরা বরাবরের মতই বেকুব ঠাওরাচ্ছেন সাধারণ মানুষকে। বুঝতে চান না এখন আর গালগল্প করার দিন নেই। ড্রইংরুমে টিভি স্ক্রীনে প্রতি মুহূর্তে সংবাদ ও ছবি চলে আসছে। তাদের লুকোচুরি বা মিথ্যা ভাষণ এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে। সাধারণ মানুষের কাছে এভাবে খেলো হয়ে যাচ্ছেন নেতা-নেত্রীরা। ভাবতে কষ্ট হয় আমাদের রাজনীতি কতটা কলুষিত হয়ে গেছে। কতটা অমানবিক হয়ে গেছে। রাজনীতিকগণ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অবলীলায় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছেন। প্রতিপক্ষের রাজনীতিকদের শায়েস্তা করতে—সরকারকে দুর্বল করতে সাধারণ মানুষের ওপর আঘাতের পর আঘাত করে যাচ্ছেন। দেশপ্রেমহীন রাজনীতির বণিকরা হরতালের নামে অবলীলায় দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনকে ব্যাহত করছেন। বিএনপির সাথে তো এখন গাঁটছড়া বাঁধা ইসলামী দল হিসেবে প্রচারিত জামায়াত আর হেফাজতে ইসলাম। পত্রিকায় খবর বেরোয় পিকেটারদের আক্রমণের শিকার হয়েছে হাজি বহন করা মাইক্রোবাস। ভাঙচুড় করছে লাশবাহী এম্বুলেন্স। যেখানে তাদের এসব ছুঁয়ে যায় না সেখানে শ্রমজীবী মানুষের পরিবার হরতালের ফাঁদে পড়ে কতটা হাবুডুবু খাচ্ছে তা ভাবার মত সময় কোথায় মসনদ লোভী রাজনীতিকদের! আমরা বিশ্বাস করি হরতাল কর্মসূচি দেয়ার প্রেক্ষাপট রচনায় সরকার পক্ষের ভূমিকা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক প্রতিবাদের নামে বলপূর্বক দেশবাসীর ঘাড়ে সহিংস হরতাল চাপিয়ে দেয়ার দায় পুরোটাই নিতে হবে হরতাল ডাকিয়েদের। এসত্য মানতে হবে হরতালে অমানবিক সহিংসতা চালানোতে অগ্রণী থাকে একটি দল। কিন্তু দায় নিতে হয় জোটের নেতা হিসেবে বিএনপিকে। এভাবেই সাধারণ মানুষের সাথে বিএনপির দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিএনপি নেতারা ক্ষমতাসীন হওয়ার ঘোরে এই কঠিন সত্যটি বুঝতে চাইছেন না। লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন