যে দৃশ্য ভোলা যায় না

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪০
মুখে গামছা পেঁচিয়ে একদল উর্দিপরা যুবক রাইফেল উঁচিয়ে গুলি করতে করতে ছুটছেন। দৌড়ে আসছেন বিডিআর গেইটের দিকে। কখনও গেইট থেকে বেরিয়ে ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়ক ধরে সিটি কলেজের দিকে, কখনও ঝিগাতলার দিকে। পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে তখন চলছে মুহুর্মুহু গুলি। আগুনের কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে সদর দফতরের ভেতর থেকে। ধানমন্ডির ২ নম্বর সড়কের আম্বালা সুইটসের কাছে নিরাপদ দূরত্বে থেকে প্রহরায় আছেন র্যাব, পুলিশের অসংখ্য কর্মকর্তা-জওয়ান। আছেন অনেক সাংবাদিকও। যখনই উন্মত্ত অবস্থায় গুলি করতে করতে বন্দুকধারীরা দৌড়ে বের হচ্ছেন তখন জীবন বাঁচাতে পুলিশ, র্যাব সাংবাদিক সবাই দৌড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছোটার চেষ্টা করছেন। আবার পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে হেঁটে সামনে এগিয়ে আসছেন। আম্বালা সুইটসের কাছে একটি গাড়িতে মাথা নিচু করে এসময় বসে ছিলেন পুলিশের ওই সময়ের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ। দায়িত্ব পালনরত এক অসহায় পিতার মুখ। চোখে টলটল করছে পানি। কখনও রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন আবার কখনও ওয়াকিটকিতে নির্দেশনা দিচ্ছেন সহকর্মীদের। তখনও বিডিআর সদর দফতরে আটকা পড়ে আছেন তার সন্তান। একদিকে অসহায় পিতার আর্তি অন্যদিকে আইজিপির কঠিন দায়িত্ব। শুধু নিজ সন্তান নয়, পুলিশ প্রধান হিসেবে আটকেপড়া অসহায় সব মানুষকে উদ্ধার করাই তার দায়িত্ব। কিন্তু কঠিন দায়িত্বের বেড়াজালও তার চোখের পানি সেদিন আটকাতে পারেনি। এ দৃশ্যটি ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর তিনটার দিকের। ওইদিন ছিল বিডিআরের বার্ষিক দরবারের দিন। সকাল ৯টায় অনুষ্ঠান শুরুর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সশস্ত্র বিদ্রোহ। মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিডিআর সদর দফতরে। প্রায় আড়াই হাজার বিডিআর জওয়ান এ ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠে। বিডিআর বিদ্রোহের নামে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সংবাদ সংগ্রহ করতে আমরা একদল সাংবাদিক ওই সময় আম্বালা সুইটসের সামনে। জীবনে কোন যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করার সৌভাগ্য হয়নি। সেই সুযোগ কিছুটা হলেও করে দিয়েছিল বিপথগামী বিডিআরের কতিপয় সদস্য। গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে কে কত তাজা খবর দিতে পারে সে প্রতিযোগিতা সব সময়ই থাকে। কিন্তু ওই দিনের সংবাদ সংগ্রহের ঘটনার মধ্যে যে প্রতিমুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি ছিল তা মনে হয়েছে অনেক পড়ে। কারণ কয়েক দফা গুলি আমাদের পাশ দিয়ে গাছে লাগতে দেখা গেছে। ওই ঘটনার পর ইতিমধ্যে কেটে গেছে সাড়ে চার বছর। কিন্তু ওই দিনের ওইসব ঘটনা এখনও সিনেমার দৃশ্যের মতো চোখে ভাসে। সাংবাদিকতা জীবনে স্মরণীয় ঘটনার মধ্যে ওটি ছিল অন্যতম। কারণ এ ধরনের যুদ্ধাবস্থার খবর সংগ্রহ করার সুযোগ আর আসেনি। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকাল পর্যন্তও কিন্তু আমরা আঁচ করতে পারিনি ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে। প্রথমে শোনা যাচ্ছিল ডাল-ভাত কর্মসূচি নিয়ে ক্ষুব্ধ একদল বিডিআর সদস্য বিদ্রোহ করেছে। হয়ত আলোচনার মাধ্যমে থেমে যাবে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, হুইপ মির্জা আজম সাদা পতাকা উড়িয়ে হ্যান্ড মাইকে বিডিআরের উন্মত্ত জওয়ানদের আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিচ্ছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু হচ্ছিল না। বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার চক্কর দেয়ার চেষ্টা করেছিল একাধিকবার বিডিআর সদর দফতরের উপর দিয়ে। হেলিকপ্টার থেকে অস্ত্রসমর্পণের লিফলেট ছড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ওই হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে বিডিআরের উন্মত্ত জওয়ানরা। একসময় বাধ্য হয়ে হেলিকপ্টার চলে যায়। দুপুরের দিকে সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি আজিমপুরের দিকে যাওয়ার খবরে বিডিআরের সশস্ত্র জওয়ানদের মধ্যে উত্তেজনা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে হ্যান্ড মাইকে বিডিআরের ডিএডি তৌহিদ সেনাবাহিনীকে হুমকি দিয়ে বলেন, আক্রমণের চেষ্টা করলে বিডিআর সদর দফতরের ভেতরে থাকা সব সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হবে। তারা হ্যান্ড মাইকে বলতে থাকেন, প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে আলোচনার জন্য পিলখানায় আসতে হবে। দিনভর সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিডিআরের বিদ্রাহীদের আলোচনা চলতে থাকে। এভাবেই চলে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত দুই দিনের নাটকীয়তা। সেনাবাহিনী ট্যাংক-গোলাবারুদ নিয়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের কাছে এসে অবস্থান নেয়। সম্ভবত ব্যাপক প্রাণহানি এড়াতে অপারেশন শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ বিডিআর সদর দফতরের চারদিকে অসংখ্য সাধারণ মানুষের বসবাস। ফলে বড় অপারেশন চালানোতে দ্বিধা ছিল সকলের মনে। এরপর প্রধানমন্ত্রী রেডিও টেলিভিশনে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করে। কিন্তু এর মধ্যে যা ঘটার তার সবই ঘটে গেছে। বিদ্রোহী জওয়ানরা ওই সময়ের মধ্যেই ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাদের আচরণ এমনই নৃশংস আর বীভত্স হয়ে উঠেছিল যে, হত্যার পর অনেক লাশ তারা পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করে। ম্যানহোলে ঢুকিয়ে দেয় অনেক লাশ। গণকবরও দেয়া হয়। দুইদিনের বীভত্সতা সেদিন শেষ হয় অসংখ্য লাশ, রক্ত আর বারুদের গন্ধে। এরপর কেটে গেছে সাড়ে চারটি বছর। বিডিআর নাম বদলে হয়েছে বিজিবি। অর্থাত্ বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ। ওই দিনের হত্যাকারী, বিপথগামী বিডিআর সদস্যদের গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। গত কয়েকবছর ধরে চলেছে বিশাল এ বিচারের কাজ। আসামিদের মধ্যে বিডিআরের জওয়ান ৭৮২ জন আর বেসামরিক মানুষের সংখ্যা ২৩ জন। এদের মধ্যে ২০ জন এখনও পলাতক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গতকাল এ ঐতিহাসিক বিচারের রায়ে ১৫২ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। খালাস পেয়েছেন ২৭৭ জন। আর বাকিদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। রায়ের পর ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলেও এ ক্ষত মানুষের মন থেকে সহজেই মুছে যাবে না। ভয়ংকর সেই দুই দিনের রক্তাক্ত, নৃশংস ঘটনা চোখের সামনে থেকে মুছে যেতে অনেক সময় লাগবে। তবে সান্ত্বনা এতটুকুই যে, অন্তত বিচার কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে যে পার পাওয়া যায় না, এক মামলায় ১৫২ জনকে ফাঁসি দেয়া যায়- সেটিও একটি নজির তৈরি হলো ভবিষ্যতের জন্য। ইতিহাস থেকে আমরা যদি সবাই শিক্ষা নিতে পারি তাহলেই হবে এ রায়ের সার্থকতা। লেখক :সাংবাদিক ইমেইল :[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন