বাংলাদেশে পানির সমস্যা ক্রমে তীব্র হইতে তীব্রতর হইতেছে। সমস্যাটি ইতিমধ্যে বহুমাত্রিক রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। দেশের ৪টি নদীপ্রণালীর প্রায় সবগুলি নদীই আজ কমবেশি সংকটাপন্ন। শাখা ও উপনদীসমূহের বেশিরভাগই হাজিয়া-মজিয়া গিয়াছে। ইহার প্রধান কারণ কী সে সম্পর্কে নূতন করিয়া বলিবার দরকার পড়ে না। খালবিল ও হাওর-বাঁওড়ের অবস্থাও সঙ্গীন। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অনিবার্য অভিঘাতে বাড়িয়া চলিয়াছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। ফলে দেখা দিতে শুরু করিয়াছে লবণাক্ততার সম্প্রসারমান সমস্যা। উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহে জমিতে লবণের আধিক্য কৃষি ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে। এক হিসাব হইতে জানা যায়, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের প্রায় তিরিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা এক্ষণে লবণাক্ততার সমস্যায় নিপতিত। ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও লবণের আধিক্য দেখা দিতে শুরু করিয়াছে বলিয়া কোনো কোনো গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করা হইয়াছে। এমনকি ঢাকা ও ইহার পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহেও এহেন বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়াছে। সামগ্রিকভাবে দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকা লবক্ততার সমস্যায় আক্রান্ত। লবণক্ততার সমস্যা ছাড়াও পানি দূষণ ঘটিয়া চলিয়াছে নানানভাবে। আর্সেনিক সমস্যা তো আছেই। পানির স্বল্পতা এবং দূষণের ফলে একদিকে কৃষি উত্পাদন ব্যাহত হইবার আশংকা যেমন প্রকট হইয়া দেখা দিয়াছে তেমনই দেখা দিতে শুরু করিয়াছে বিশুদ্ধ খাবার পানির দুর্ঘট।
পানির সমস্যা যে কেবল বাংলাদেশের তাহা অবশ্য নহে। বলিতে গেলে সমস্যাটি বিশ্বব্যাপী। বলা হইয়া থাকে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি কখনও বাধে তাহা হইলে উহা বাধিবে পানি লইয়া। বিশ্ব জুড়িয়া পানির সংকট যতটা না প্রকৃতিগত কারণে, তাহার চাইতে অনেকবেশি মনুষ্যসৃষ্ট। বিশ্বের ২৬০টি দীর্ঘ ও বৃহত্ নদী দুই বা ততোধিক দেশের মধ্য দিয়া প্রবাহিত। এইসব নদীর পানি ব্যবস্থাপনা লইয়া আছে বিরোধ-বিতর্ক। উজানের দেশসমূহ বিশেষ সুবিধা ভোগ করিলেও ভাটির দেশসমূহকে মোকাবিলা করিতে হয় বিবিধ সংকট। নদ-নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়াও পরিবেশ-প্রতিবেশগত আরও নানান কারণে দুনিয়ার দেশে দেশে বিশুদ্ধ পানির সমস্যা প্রকট হইয়া দেখা দিয়াছে ইহারই মধ্যে। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ১ শত ১০ কোটি মানুষ আজ সুপেয় পানির অধিকার হইতে বঞ্চিত। পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে ৩৯ হাজার শিশু মারা যায় পানিবাহিত রোগে। ডায়রিয়ায় মারা যায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। বলাবাহুল্য, ডায়রিয়া রোগের প্রধান কারণ দূষিত পানি। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম গোলে ২০১৫ সালের মধ্যে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে পানির অধিকার নিশ্চিত করিবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হইয়াছে।
মোটকথা, পানির যে সমস্যা তাহা সমাধানের জন্য এখন সবচাইতে বেশি প্রয়োজন আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তোলা। ইহার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে সকলের অংশগ্রহণে একটি পরিকল্পিত এবং সমন্বিত পানিব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিবার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে প্রতিবত্সর অঞ্চলভেদে ১১১০ মিলিমিটার হইতে শুরু করিয়া ৫৬৯০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হইয়া থাকে। ইহা মোটেও কম নহে। কিন্তু বিপুল এই বৃষ্টির পানির সামান্যই আমরা সদ্ব্যবহার করিতে পারি। সিংহভাগ পানিই দূষিত হইয়া যায়, সংরক্ষণ করা হয় না। পানি ধরিয়া রাখিবার মত আধার নাই। নদীনালা খাল বিল ভরাট হইয়া গিয়াছে, সেইকথা বলা হইয়াছে আগেই। পুকুর দীঘিও ভরিয়া ফেলা হইতেছে। এমতাবস্থায় খাল, বিল ও বাঁওড় খনন সংস্কার করা জরুরি। পারিবারিক এবং সরকারি মালিকানাধীন পুকুরসমূহ সংরক্ষণ করিতে হইবে। সেচ এবং গৃহস্থালি কাজে ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিবে। ইহাতে মিঠা পানির সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়া আসা সম্ভবপর হইতে পারে বলিয়া অনেকেই মনে করেন। বিষয়টির প্রতি সংশ্লিষ্ট সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
