সারাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি কলেজ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আট হাজার ২৩০ জন শিক্ষকের পদ শূন্য রহিয়াছে। কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী উপরোক্ত তথ্য প্রদান করেন। তন্মধ্যে সরকারি কলেজগুলিতে শূন্য পদের সংখ্যা তিন হাজার ৪৭১ জন। অবশিষ্ট পদগুলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পর্যায়ের। বর্তমান সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিয়াছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক সাফল্যের কাহিনী আছে। তাহার পরও সংকট একেবারে দূর হয় নাই।
উল্লেখ্য, এই সরকারের আমলে যেমন দেড় সহস্রাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হইয়াছে, তেমনি ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে করা হইয়াছে জাতীয়করণ। নূতন করিয়া জাতীয়করণের কারণে সৃষ্টি হইয়াছে এক লক্ষ ১৪ হাজার ৬২৫ জন শিক্ষকের পদ। নূতন পদের বিপরীতে এক লক্ষ তিন হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। বাকি পদগুলি স্বাভাবিকভাবেই পূরণ করিবার দায়িত্ব সরকারের ওপর ন্যস্ত হইয়াছে। সামপ্রতিককালে সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষক নিয়োগ দিয়াছে। আবার বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি কলেজগুলিতেও নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রহিয়াছে। এইসব প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে চলিতে থাকিলে আশা করা যায় যে, বর্তমান শিক্ষক সংকট আর তেমন থাকিবে না।
এতকিছুর পরও আমাদের আত্মতৃপ্তিতে ভোগার কোন কারণ নাই। কেননা আমাদের সামনের দিকে দৃষ্টি দিতে হইবে। জাতিসংঘের হিসাব মতে, ২০১৫ সাল নাগাদ পৃথিবী ব্যাপী ৮ মিলিয়ন অতিরিক্ত শিক্ষকের প্রয়োজন পড়িবে। বাংলাদেশ যেহেতু একটি জনবহুল দেশ, তাই প্রতি বত্সর স্কুল-কলেজগুলিতে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়িতেছে। সেই তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াইতে না পারিলে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সংকট লাগিয়াই থাকিবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনা করিতেছে। এই দেশে এইবার ৩০ লক্ষ শিক্ষার্থী কেবল প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিবে। সুতরাং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করিতে পর্যাপ্ত শিক্ষকের নিয়োগ দেওয়া চাই। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ লক্ষ ৯ হাজার শিক্ষক দায়িত্ব পালন করিতেছেন। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অনুপাত আশাব্যঞ্জক নহে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫৫। তবে বেসরকারি হিসাবে তাহা সঠিক ধরা হয় না। তাহাদের মতে, ইহা আসলে ১:৮৫। সরকার বিশেষত প্রাইমারি স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও সফলভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করিবার উপর এখন জোর দিতেছে। এইজন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর আনুপাতিক হার কমাইতে হইবে। এইভাবে আরও শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার দরকার হইবে। তাহাছাড়া অবসর গ্রহণ, মৃত্যু প্রভৃতি কারণে কোন শিক্ষকের পদ খালি হইলে তাহা পূরণের জন্য প্রতি বত্সর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখিতে হইবে। অনেক সময় বদলি, মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রভৃতি কারণে সাময়িক সময়ের জন্য কোন কোন বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দেখা দেয়। এইজন্য খণ্ডকালীন বা অস্থায়ী ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা যাইতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশেও শিক্ষক সংকট আছে। আসলে সবকিছু নির্ভর করে জাতীয় অর্থনীতি তথা আর্থিক সঙ্গতির ওপর। তবে আজকাল শিক্ষা ও অর্থনীতি পরস্পর নির্ভরশীল হইয়া পড়িয়াছে। শিক্ষিত নাগরিকগণ জাতীয় উত্পাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক। এইজন্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি ও জনবল নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে হইবে। আমরা আশা করি, একদিন আমাদের শিক্ষক সংকট আর থাকিবে না।
