আইনস্টাইনের একটি কথা দিয়েই আজকের লেখাটা শুরু করি। রাজনীতি সম্পর্কে তার এই বক্তব্যটি অসাধারণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের নিকট এই বক্তব্যটির উপযোগিতা অনেক ব্যাপক হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচনায় তার বক্তব্যটি অনেকটাই বেমানান। শুধু আইনস্টাইনের বক্তব্য কেন, রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রায়োগিক আলোচনার অনেক নিয়ম-কানুনই বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষণে অথবা এর ভবিষ্যত্ কথনে ব্যবহার করা যায় না। তবুও রাজনীতি বলে কথা। তাও আবার বাঙালির রাজনীতি। ব্রিটিশ শাসকগণের বাঙালি জাতির রাজনীতির ধারণা (রাষ্ট্রবিজ্ঞান নয়) সম্পর্কে এত উঁচু মূল্যায়ন ছিল যে, তারা বলতেন, ‘আজ বাঙালিরা যা ভাবে, অবশিষ্ট ভারত আগামীকাল তা ভাবে’। হয়তো একারণেই সচেতন বাঙালিদের বেড়াজাল থেকে বাইরে থাকার জন্য কলকাতাকে ছেড়ে দিল্লীকে ভারতের কেন্দ্রে পরিণত করলেন। এর ফল বাঙালিদের জন্য কতটুকু ভাল হয়েছে তা বলা কঠিন। তবে ভারতের নেতৃত্ব বাঙালিদের বাইরে তথা উত্তর ভারতের হাতে চলে যায়— এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আবশ্যক ফলস্বরূপ বৃহত্ বাংলা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে তার চেয়ে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ভারত উপ-মহাদেশের অন্যান্য অংশের অধীন হয়ে যায়। পূর্ববাংলা অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়। কিন্তু পশ্চিম বাংলা কলকাতাকে রাজধানী করে (দিল্লীর তুলনায় পিছিয়ে থাকা অবস্থায়) ভারতের প্রদেশ হিসেবেই থেকে যায়। ফজলুল হকের বৃহত্ বাংলা রাষ্ট্র ১৯৪৭ সালে সোহরাওয়ার্দীর বুকের উপর দিয়ে দুইভাগে ভাগ হয়ে উত্তর ভারতের নেতাদের নেতৃত্বে চলে যায়। এই হলো অত্যধিক রাজনৈতিক সচেতনতার ফল। রাজনীতি অতি উঁচু মাপের একটি আর্ট। এই আর্ট সকলেই চর্চা করতে পারে না; এই আর্টের বিশ্লেষণতো নয়ই। যে জাতির সকলেই রাজনীতির আর্ট বুঝে ফেলেন, সে জাতির ভুল পথে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আখেরে রাজনীতির হিসেবের আসল লাভই হাওয়া হয়ে যায়।
যাহোক, আইনস্টাইনের কথায় আসি। আইনস্টাইন বলেছিলেন— ‘পদার্থবিদ্যার চেয়েও রাজনীতি বোঝা কঠিন।’ জানি না আইনস্টাইনের মতো বড়ো মাপের বিজ্ঞানীর নিকট এটা কেন মনে হলো। বাংলাদেশের টক শো দেখলে এটাতো মনে হয় না। ইতিহাসবিদ, আইনবিদ, রসায়নবিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশকর্মী, উকিল, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, নবীন রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, নাটক নির্মাতা, খেলোয়াড়, অভিনয় শিল্পী সকলেরই সরব বিচরণ টক শো’র রাজনীতির আলোচনায়। কারো কারো পরিচিতি তুলে ধরার সময় লেখা যেতে পারে— ‘আলোচক, বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।’ টক শো’রও নানা মাত্রা আছে। বৈকালিক, সান্ধ্যকালীন, প্রাতঃকালীন, মধ্যাহ্ন, গভীর রাত, সুবহে সাদিক ও বাদ ফজর টক শো। এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, টক শোতে যারা আসেন তারা অনেকেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ। তবে কেউই হয়তো বলবেন না তারা অধিকাংশই রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রজ্ঞা অর্জন করেছেন। কারো কারো প্রজ্ঞা এতো বেশি যে, তারা টক শো’কে পেশাই বানিয়ে ফেলেছেন। অভিজ্ঞ আইনবিদ, অভিজ্ঞ ইতিহাসবিদ বা অভিজ্ঞ রসায়নবিদদের কাউকে কাউকে সকাল, বিকাল, দুপুর, রাত এমনকি মধ্যরাতেও দেখা যায়। অর্থাত্ টুয়েন্টি ফোর আওয়ারস পেশা। ভাল, খুবই ভাল। চ্যানেলগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করেন, আমাদেরও সুযোগ হবে। কিন্তু প্রশ্ন অন্যত্র।
একটি রাষ্ট্রের সকল অভিজ্ঞ লোক যখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে টকজীবী হয়ে যান তখন রাজনীতির বিষয়াদির বিশ্লেষণে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন মেনে চলার সুযোগ হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিশ্লেষকগণ এতোই আনাড়ি হন যে, সঠিক বিশ্লেষণ দিতে ব্যর্থ হন বা ভুল কথা বলে বসেন। লাখ লাখ দর্শক ঐ ভুলটাকেই বুকে ধারণ করে। এভাবে নাগরিকগণ ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে।
গণতন্ত্র সুসংহতকরণে সুশীল সমাজের স্পন্দমান ভূমিকা আবশ্যক। এর অর্থ এই নয় যে, সুশীল সমাজের সকলকেই টকজীবী হতে হবে। অথবা পরিবেশবিদ, রসায়নবিদ বা আইনবিদকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে পারদর্শী হতে হবে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আমার জানা মতে টক শো’র এই ব্যাপক প্রবাহ নেই। একইভাবে, সুশীল সমাজের নেতৃত্বদানকারীরা প্রাতঃকালীন, সান্ধ্যকালীন বা গভীর রজনীর টক শোতে নিজের অবয়ব দেখিয়েই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আত্মতৃপ্তিতে ভোগে না। উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্র (মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার, সুষ্ঠু অর্থনৈতিক বণ্টন, আইনের শাসন, ক্ষমতা পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা) প্রতিষ্ঠা এতো সহজ নয় যে, তা নিরাপদ টক শো’তেই নিশ্চিত হবে। অন্তত ম্যান্ডেলাকে অনুসরণ করলেও অনেক ত্যাগস্বীকারের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার, সুষ্ঠু অর্থনৈতিক বণ্টন, আইনের শাসন, ক্ষমতা পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা সবই টক শোতে আছে। তাই এটা ‘টক শো গণতন্ত্র’। এই গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ কি বাক্সবন্দী!
গণতন্ত্র সুসংহতকরণের উপর পৃথিবীতে যত তাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে তার সবকিছুতেই সুষ্ঠু ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত। অনেকের ধারণা এই প্রক্রিয়া রপ্ত করতে বিশ বছর প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ বিশ বছর অতিক্রম করেছে তবুও সেই আগের জায়গায় অর্থাত্ যেখান থেকে শুরু করেছিল সেখানেই আছে। মাঝখানে সময়গুলো অতিবাহিত হয়েছে। তাই পিছিয়েছেও বলা যায়। আগেই বলেছিলাম বাংলাদেশের নাগরিকগণ রাজনৈতিকভাবে বেশি সচেতন, তাই রাজনীতি বিজ্ঞানের অনেক সূত্রই এখানে প্রয়োগ হয় না। সুতরাং, ক্ষমতা হস্তান্তরের ২০ বছরের অনুশীলন তত্ত্বও এখানে কাজে লাগছে না। ২০ বছর পরও গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত তথা ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াও গণ-বৈধতার মাধ্যমে সুসংহত হলো না।
পৃথিবীতে সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো মানবিক আচরণ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে মানবিক আচরণ নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই রাজনীতির আলোচনায় সকলেই যদি বিশ্লেষক হয়ে যান তাহলে চাপার জোরে টক শো চলবে; কিন্তু সেই টক শো রাজনীতির সংস্কৃতি উন্নত করতে পারবে না। দুই নেত্রীর টেলিসংলাপ নিয়ে টক শো এতো মাতামাতি করলো শেষ পর্যন্ত দুই নেত্রীর সম্পর্ক কি আরো খারাপ হলো? পৃথিবী বিখ্যাত মিডিয়া— সিএনএন, এবিসি, আলজাজিরা, বিবিসিতে কি পরিমাণ টক শো হয় তা দয়া করে পরখ করে দেখবেন। অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনেক রয়েছে। মাঝে মাঝে স্ব স্ব ক্ষেত্রে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জনকারীদেরকে ডাকা হয়; তবে সব ক্ষেত্রে সবাইকে নয়। আর যাদেরকে ডাকা হয় তারা ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে স্ব স্ব ক্ষেত্রে একাডেমিক বৈধতা লাভ করেছেন। যতদূর মনে পড়ে মার্গারেট থেচারের মৃত্যুর পর তার ব্যাপারে বলার জন্য বিবিসিতে যাকে ডাকা হয়েছিল তিনি থেচারের উপর প্রায় চল্লিশ বছর গবেষণা করেছেন। পত্রিকায় একটি কলাম লেখাই সংবিধান বিশেষজ্ঞ হওয়ার ভিত্তি নয়। অথবা ৪০ বছর সুপ্রীম কোর্টে ঘুরাঘুরি করলেই আইন বিশেষজ্ঞ হওয়া যায় না। একাডেমিক জার্নালে গবেষণাধর্মী নিবন্ধ প্রকাশ করলে এবং তার একাডেমিক বৈধতা থাকলেই একজন ব্যক্তিকে বিশেষজ্ঞ বলা যায়। তবে কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণও একাডেমিক বৈধতা প্রদান করে। কেউ রাজনীতি, অর্থনীতি বা রসায়নে ডিগ্রী অর্জন করেছেন, স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ দেয়ার সুযোগ তারও রয়েছে। সাবধান! বিশেষজ্ঞ লোকের সংখ্যা বেশি হলে গোলমাল বেশি হয়; আনাড়ী লোক হলেতো কথাই নাই। প্লিজ! যে বিষয়ে সত্যিই জানেন না তথা একাডেমিক বৈধতা নেই সেই বিষয়ে বিশ্লেষণ করে নাগরিকদেরকে বিপথে নেবেন না।
লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
email : [email protected]
