অসম্ভবকে সম্ভব করা যায় না কি

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৩, ০০:২২
পারলে না রুমকি একটি নাটকের নাম। আফজাল-সুবর্ণা অভিনীত, বিটিভিতে প্রদর্শিত। (সম্ভবত: ১৯৮০-৮১ সালে) নাটকের বিষয় বস্তু আমার প্রতিপাদ্য নয়। আমার মূল উপজীব্য নাটকের নামটি, পারলে না রুমকি। আমাদের দেশের ১৬ কোটি জনতার দিন, ক্ষণ, ভবিষ্যত্ যে দু’জন বিশাল ব্যক্তিত্বের উপর এ মুহূর্তে বিধাতা সপে দিয়েছেন তার একজন প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী অপরজন সরকার দলীয় নেত্রী। দু’জন নেত্রীর ভাবাবেগের উপর ১৬ কোটি মানুষের ভালো থাকা, মন্দ থাকা বিধাতা ইচ্ছে করে ঠেলে দেননি, আমরা জনগণই আমাদের খাসিলত দিয়ে তা টেনে এনেছি। এই টেনে আনার ইতিহাস ৪২ বছর এমনভাবে গড়িয়ে এসেছে তা নিয়ে আমি তো-কোন ছার, শরত্ বাবু উপরে বসে লেখালেখির চেষ্টা চালালেও নির্ঘাত ফেল মারবেন। কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস নুরজাহানও এ ইতিহাসের কাছে নিবু নিবু কুপির সলতের মতো ম্লান হয়ে পড়বে। তাই মনের কষ্টকে নিংড়ে দিতে যত কম শব্দ ব্যবহার করা যায় ততই ভালো। এর আরো ভালো দুটি দিক আছে। ছোট্ট কলাম বলে অনেক পাঠক একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। অন্যদিকে আমার মতো খোড়া লেখকের লিখা পত্রিকার এক কোণে জায়গা করে নিতে পারে। আসল বিষয়ে যদি আলোকপাত করি তাহলে পাঠক (দু’-একজন যদি থেকে থাকেন) এতক্ষণে বুঝে গেছেন রুমকি শব্দটি কোন ক্ষেত্রে প্রতিকী হিসেবে ব্যবহার করছি। কোথায় যেন একটা বিশ্বাস ছিল যেহেতু দেশের জনগণের বেশিরভাগই সাদা মনের, এ দেশটাকে আল্লাহতায়লা ধ্বংসের বিপাকে হয়তো ফেলবেন না। সেই সুবাদে আমাদের সব ভরসার মূল এই দুইজন-নেত্রী তাদের শুভ চিন্তা-চেতনা দিয়ে প্রায় সর্বস্থলে নাঙ্গা এই প্রজন্মের কথা বাদ দিলেও, ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে একটি দৃষ্টান্ত রেখে যাবেন। কিন্তু সারা দেশবাসী ও আমাদের রাজনীতি নিয়ে যারা উত্সুক তারা সবাই দু’ নেত্রীর টেলিফোন আলাপ নিয়ে প্রত্যাশার যে আগমনী তারাটি অন্ধকার আকাশে খুঁজছিলেন, সেইটি জেগে উঠার আগেই খসে পড়েছে। দুঃখজনক হলেও বলতে হয় তাদের টেলিফোনের আলাপচারিতায় দু’জন মহিলার ব্যক্তিগত অথচ ভদ্রোচিত কাইজ্জার প্রতিচ্ছবি যতটা প্রতিফলিত হয়েছে বর্তমান সংকট সমাধান বা সুষ্ঠু নিবার্চন পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা করার কোন মাত্রাই এ আলাপনে ছিল না। বরং এ কথোপকথনে বাংলার রাজনীতির ধ্যান, ধারণার ইমেজ আবারো ধারাশায়ী হলো। পরিণত হলো হাস্যকর বিষয়ে। টেলিফোন আলাপের পরবর্তী সময় ধরে এখনো সেই রেশ রয়েই গেছে। হোঁচট খেল আবারো সারা বাংলা। জেএসসি এবং ও লেভেলের অনেক কিশোর-কিশোরীও রাজনীতি বুঝুক আর না বুঝুক উন্মুখ হয়ে বসে ছিল একটি ভালো পরিবেশ দেখার। ‘ও’ লেভেলের দশ বারো হাজার ছাত্র ছাত্রী গদির টানাটানির হিংস্র স্রোতে হারালো জীবন থেকে ৬টি মাস। ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে রাতে পরীক্ষা দেয়ার অভিজ্ঞতায় রাজনীতির যে পরিহাস তারা দেখলো আমি এবং আমার মতো যারা আছেন তারা নিশ্চিত: এটা কষ্টের, ক্ষোভের ও ঘৃণার। অন্যদিকে লাখো জেএসসি পরীক্ষার্থী কিশোর-কিশোরী গুনছে তাদের আতংকের দিন, ঘটছে ব্যাঘাত তাদের ভালো ফলাফলের প্রস্ততিতে। এই ভুক্তভোগী কিশোর-কিশোরীরা কি একদিন হিসেব চাইবে না এই ক্ষয়ের? আমাদের কি তালিকাভু্ক্ত করবে না নষ্টাচারের তালিকায়? তরুণ প্রজন্ম জাগ্রত হলে, সে জোয়ারে ভেসে যাবে সব অনাচার যে কোন সময়। আড্ডায়, ইন্টারনেটের তারে, মাদকের নেশায় বেশিরভাগ তরুণ ও যুব সমাজ বোধশক্তিহীন হয়ে আছে ভেবে আমরা যতই হতাশাগ্রস্ত হই না কেন, একবার তাদের ভেতরের চেতনার লাভা জাগ্রত হলে আমরা শরমে লুকাবো কোথায়? শাহাবাগে যে তরুণেরা জেগে ছিল, ইস্যু ভিত্তিক না হয়ে অথবা ভিন্ন খাতে সে জোয়ার প্রবাহিত না হলে, পার পেতে পারতাম কি আমরা? শুভ বোধদয়ের সূর্য যখন আবার তাদের মাথার উপরে জেগে উঠবে, যখন দেশের মানুষের সঠিক অধিকার আদায়ে নামবে, তখন আর কোন ইস্যু দিয়ে তাদের বিব্রত করা যাবে না। আমরা হয়তো সহসা আমাদের রাজনীতির বর্তমান বলয়ের বাইরে যেতে পারবো না। এ দেশে নতুন কোন শক্তিশালী সুষুম মতাদর্শের রাজনৈতিক দল শ্রীঘ্রই তৈরি হওয়ার মতো সঠিক পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় মূল্যবোধ এবং তা জাগ্রত করার যে সুস্থ মানষিকতা ও একাত্বতা প্রয়োজন তা আতুড় ঘরে পঙ্গু হয়ে পরে আছে অনেক আগে থেকে। অসম্ভবকে, সম্ভব করার বিজ্ঞাপনের সেই যাদুকরী নেতৃত্বও বাস্তবে আপাতত আমাদের নেই। দেশের সর্ব পরিচালনায় এখন যারা রয়েছেন তারা আমাদেরই চাহিদা ও যোগানের মাধ্যমে আবির্ভূত। তা হলে আমাদের আর উপায়ন্তর আছে কি? দেশের আনাচে-কানাচে সর্ব সাধারণ এখনও স্বপ্ন ধরে রেখেছে সম্মানিত এই দুই নেত্রীই পারেন অহমের খড়া তাপে না পুড়ে, ১/২ ঘন্টার সুস্থ আলাপচারিতায় বদলে দিতে কঠিন দুঃসময়ে নিপতিত এ বাংলার আগামীকালের রূপরেখা। তখন হয়তো তৈরি হবে আরেকটি নাটক নাম হবে তার ‘এইতো পারলে রুমকি’। কোটি লোকের দোয়া জমা হবে তাদের জীবন পাতায়। পরকালে ভীষণ কাজে লাগবে সেই সব দোয়া। পৃথিবীতে ভালো কিছু রেখে যাবার মতো সময় ও হায়াত পাওয়াওতো পরম ভাগ্যের ব্যাপার। অন্যদিকে দুটি জিনিস এই চরাচরে নিশ্চিত একটি মৃত্যু অন্যটি অতীত ফিরিয়ে আনা যায় না বা সময় কখনো ফেরে না। সময় নষ্ট না করে এক টেবিলে বসে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ আনা বহুগুণে শ্রেয়তর, পাশাপাশি রুমে আবদ্ধ হয়ে থাকার পুনরাবৃত্তি ঘটার চেয়ে। লেখক : আবৃত্তিকার ও ব্যাংকার

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন