মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে সকলেই রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা করেছিল। মানুষের এ ভবিষ্যদ্বাণীই সত্য হচ্ছে—দেশে সহিংসতা অব্যাহত আছে। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সমঝোতা না হলে অনিবার্য সংঘাতের এ পূর্বানুমানের সঙ্গে মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের একটি যোগসূত্র আছে। বর্তমান পরিস্থিতি বোঝা ও ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার ক্ষেত্রে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ব্যবহারের এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলেন পশ্চিম জার্মানির মেইনজ বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ গবেষণার অধ্যাপক (এমেরিটাস) Elisabeth Noelle-Neumann। ষাটের দশকের শেষের দিকে তিনি জার্মানীতে জনমত গবেষণা সংস্থা ‘Allensbach Institute’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে তার গবেষণাকর্ম হিসেবে ‘The growth and spread of public opinion’-বিষয়ের ওপর কয়েকটি হাইপোথিসিস দাঁড় করান। Neumann তাঁর এ গবেষণায় ‘The Climate of Opinion’ নামে একটি বিশেষ প্রত্যয় ব্যবহার করেন, যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় মতামতের গতিবিধি বা মতামতের বাতাস। তিনি বলতে চান যে, বিজ্ঞান মানুষের পাঁচটি দৈহিক ইন্দ্রিয়ের কথা বলে, যার মাধ্যমে মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারে। পাঁচটি ইন্দ্রিয় হলো—চোখ, কান, জিহ্বা, নাক ও ত্বক। মানুষ যথাক্রমে দর্শন, শ্রবণ, স্বাদ, গন্ধ ও স্পর্শের মাধ্যমে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নেয়ার চেষ্টা করে। তার মতে, মানুষের আরো একটি ইন্দ্রিয় আছে। যার নাম ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। এ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় মানুষকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে তথ্য দিয়ে এটা বুঝতে সাহায্য করে, সমাজে কী অনুভূত হচ্ছে; অর্থাত্ দেশ কোনিদকে যাচ্ছে। ‘The Climate of Opinion’-এ অন্তর্ভুক্ত দুটো বিষয় হচ্ছে—বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যত্ পূর্বাভাস। তাঁর মতে, কোনো প্রকার গবেষণালব্ধ ধারণা ছাড়াই মানুষ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যত্ সম্পর্কে অনুমান করতে পারে। এটি মানুষের একটি প্রাকৃতিক বিষয়। ৩০ বছরের জরিপ অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেন যে, জনগণের ধারণা বা ভবিষ্যদ্বাণী সাধারণত সঠিক হয়। এক-এগারো’র জরুরি অবস্থা জারির পর প্রয়াত সাংবাদিক আতাউস সামাদ ওই সময়ে বিবিসিকে এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন যে, তিনি প্রায় তিন বা চার মাস আগে থেকেই জরুরি অবস্থা আসার সম্ভাবনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি সেই সময়কার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা পর্যবেক্ষণ করে এরূপ সম্ভাবনার আশংকা করেছিলেন। অর্থাত্ তিনি তাঁর Quasi-Statiscal Sense বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে এরূপ ধারণা করেছিলেন।
ন্যুমেনের এ গবেষণাকর্মের অবতারণা করার কারণ হচ্ছে এই যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর থেকে দেশের শিক্ষিত-সচেতন জনগোষ্ঠী, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ তো বটেই—একেবারে সাধারণ মানুষও অস্থির রাজনীতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। রাজনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান আছে কিংবা পত্র-পত্রিকায় রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন বা রাজনীতি সম্পর্কে আগ্রহী—এমন ব্যক্তিও তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের শক্তি দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন, সহিংসতার পথেই চালিত হবে দেশের গন্তব্য। গ্রামের একজন কৃষককে জিজ্ঞেস করলেও হানাহানি-রক্তপাতের শঙ্কা ছাড়া আশার কোনো কথা শোনা যেত না, এখনও যায় না। দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পারস্পরিক আস্থাহীনতা, অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার বাস্তবতার মধ্যে মীমাংসিত বাতিল করে সরকার দেশকে অনিবার্য সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে—এ ধরনের মন্তব্য গণমাধ্যমেও আসছে প্রতিনিয়ত। অনেক দিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এ অনিশ্চয়তা বিরাজ করলেও দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সরকার।
যা হোক, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষই এখন যে যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি দল বলছে, প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ফর্মুলা অনুযায়ী চলতি নভেম্বরেই সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হবে। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভার সদস্যরাও পদত্যাগ করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে কতজন সদস্য থাকবেন তা প্রধানমন্ত্রীই বলতে পারবেন। অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রীই এখন দেশের প্রধান পথনির্দেশক। নির্বাচন কমিশন চলতি মাসেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নে ইসির কোনো মতামত না নিয়ে বিতর্কিত কিছু বিধিমালা সংযুক্ত করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ সংশোধনী বিল সংসদে পাস করা হয়েছে। সবমিলিয়ে সরকার একতরফা নির্বাচনের দিকেই এগুচ্ছে।
অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৮ দলীয় জোটের ৬০ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। পুনরায় আগামীকাল থেকে ৭২ ঘন্টার হরতাল দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিনে প্রাণ গেছে চারজনের। দ্বিতীয় দিনে প্রাণহানি না হলেও আহত হয়েছে তিন শতাধিক। প্রথম পর্বে নিহত হয়েছিল ১৮ জন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীও রয়েছেন। হরতালে রেললাইন উপড়ে ফেলে চলন্ত ট্রেন লাইনচ্যুত করা হয়েছে। যানবাহন ও রাজনৈতিক দলের অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। ককটেল-বোমা হামলায় ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে নিরীহ মানুষের শরীর। রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। মন্ত্রীর বাসভবন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। বাদ পড়ছে না বিচারপতিদের বাসভবন। আদালতের নথিতে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। একদিনের হরতালে পোশাক শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ ২শ’ কোটি টাকা। পরিবহন খাতে ক্ষতি ২৫০ কোটি আর ক্ষুদ্র ব্যবসায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬শ’ কোটি টাকা।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, জানমাল রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুলিশ প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। গত ১০ মাসে ৩০৪ জন নিহত হয়েছে বলে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে তথ্য দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন হানাহানি ঠেকাতে কার্যকর কোনো ভূমিকা না রাখতে পারলেও গুলি করে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যা করছে; পাশাপাশি পুলিশও হামলার শিকার হচ্ছে। গত ২৯ তারিখ হরতাল চলাকালে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থক আমার এক সহকর্মী—যার বাড়ি কুতুবদিয়ার পাশেই—ওইদিনের ঘটনা সম্পর্কে যা বললেন তার সারকথা হলো, কুতুবদিয়ায় হরতাল সমর্থকেরা দিনশেষে সমাবেশের আয়োজন করে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়া রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পুলিশ বাধা দেয় এবং মাইক কেড়ে নিয়ে যায়। প্রতিবাদী নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয় এবং সরাসরি গুলি চালায়। এতে চারজন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায়। আমার ওই সহকর্মীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘সমুদ্র বক্ষ থেকে জেগে ওঠা দ্বীপাঞ্চল কুতুবদিয়ায় প্রায় সবাই একে অপরের চেনাজানা। এ ধরনের স্বল্পবসতির এলাকায় (আয়তনে ২১৫ বর্গ কিলোমিটার) গুলি না চালিয়ে, হত্যা না করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেত।’ ভাংচুর, বোমাবাজি ও অগ্নিসংযোগ করে নাশকতাকারীদের অবশ্যই কঠোর হস্তে দমন করতে হবে, আইনের আওতায় আনতে হবে; কিন্তু বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের গুলি করে হত্যার ঘটনা নিঃসন্দেহে দেশের ভবিষ্যত্ সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তুলবে।
যা হোক, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই; আলোচনা ভিন্ন অন্য কোনো সহজ পথ নেই। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্প্রতি এক নাগরিক সংলাপে বলেছেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের সুপারিশ সংসদীয় বিশেষ কমিটি করেনি—এটি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে। তাই সংলাপের জন্য প্রধানমন্ত্রীকেই সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করতে হবে।’ তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও কূটনীতিক তত্পরতা পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে যে, তারাও দেশে সবদলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখার আগ্রহী।
অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮দলীয় জোট এখন যা করছে তা হলো, সারাদেশে সর্বাত্মক আন্দোলন করে সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য করানো। যদিও এটি বিরোধী দলের জন্য সরকারের দমননীতির কারণে খুব সহজ হবে না। এক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ের আশঙ্কা অনেক। এই বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে রাজপথে চূড়ান্ত শক্তি প্রকাশের মধ্যদিয়ে। এই শক্তি প্রয়োগের লড়াইয়ে সরকার পক্ষ জয়ী হলে বাংলাদেশে আরেকটি একদলীয় ও একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধী দলের আন্দোলনকে উপেক্ষা করে এ ধরনের নির্বাচন করতে পারলে আওয়ামী লীগ একই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার মেয়াদকে যথাসম্ভব দীর্ঘ করতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রেও দেশের স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে হুমকির সম্মুখীন হবে। আর এক তরফা নির্বাচনে সরকার ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে পুনরায় এক-এগারো ধরনের সরকার আসতে পারে।
নতুন সরকার গঠন এবং দশম সংসদ গঠন প্রক্রিয়ায় কত মানুষ বলি হবে, কত মায়ের বুক খালি হবে; আর ক্ষতির পরিমাণই বা কী দাঁড়াবে, তা ভাবতেও গা শিউরে উঠে!
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
