মন্ত্রী পদত্যাগে সাংবিধানিক অবস্থান

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:০৬
প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সরকারের মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতে শুরু করেছেন। মন্ত্রী পদত্যাগ করার পরই তাঁর পদ শূন্য ও শপথের অবসান হয়ে যায়। তারপরও কেউ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হবে সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন। বিদ্যমান সংবিধানে মন্ত্রী পদের মেয়াদ সম্পর্কে ৫৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য কোন মন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে যদি : (ক) তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন। অর্থাত্ মন্ত্রীর পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রদান করলেই পদ শূন্য হইবে। পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ হয়েছে কিনা বা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন হয়েছে কিনা তা জরুরি নয়। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদানের পরই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়। মন্ত্রীর পদত্যাগ প্রশ্নে পদত্যাগপত্র গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া অন্য কোন সাংবিধানিক এখতিয়ার রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর নেই। যেহেতু রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ আপনা-আপনি শূন্য হয়ে যায়, তাই পদত্যাগপত্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কালক্ষেপণেরও কোন সুযোগ নেই। পদত্যাগপত্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কেবল ডাক বিভাগের ভূমিকা গ্রহণ করবে। পদত্যাগপত্রের সার-সংক্ষেপ রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণ এবং দ্রুততম সময়ে গেজেট নোটিফিকেশন জারি করা সরকারের অতীব জরুরি কর্তব্য। উচ্চতম নৈতিকতার অধিকারীরাই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে অবস্থান ও শপথ গ্রহণ করেন। এজন্যই এসব পদ থেকে পদত্যাগ করার সাথে সাথেই পদত্যাগ কার্যকর করা হয়। এই সকল পদের মহিমার কারণে কোন পদত্যাগপত্র জমা করার কোন সাংবিধানিক সুযোগ নেই—যা আছে তা কেবল দ্রুততম সময়ে কার্যকর করা। এগুলো সংবিধানের পবিত্র কর্তব্য। এ কর্তব্য পালনে রাষ্ট্র বাধ্য। মন্ত্রীর পদত্যাগ করার পর যদি প্রধানমন্ত্রী জমা রাখতে পারেন বা সিদ্ধান্ত দিতে পারেন তাহলে কী প্রধানমন্ত্রী যখন ৫৭(১) অনুযায়ী পদত্যাগ করেন তা কি রাষ্ট্রপতি জমা রাখতে পারবেন বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবেন? প্রধানমন্ত্রীর বেলায় যে সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে—মন্ত্রীদের বেলায়ও তাই। প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ ৫৭(১)-এ বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে, যদি (ক) তিনি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন; অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ যেমন দ্রুত কার্যকর হবে তাতে রাষ্ট্রপতির কালক্ষেপণের কোন সুযোগ নেই। তেমনি মন্ত্রীদের পদত্যাগ নিয়েও কালক্ষেপণের কোন সুযোগ নেই। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীদের পদ ও পদমর্যাদা এমন উচ্চতম অবস্থানে রাখা হয়েছে যা পদত্যাগ করলেই কার্যকর হয়। কারণ এসকল পদ ও পদের অধিকারী ব্যক্তিরা নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে সর্বোত্তম বিবেচনা করে সংবিধানে এসব অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এ সকল পদ ও পদের অধিকারী ব্যক্তিরা শপথ গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সকল পদের সাথে যেহেতু শপথ গ্রহণ করতে হয় এবং শপথে যেহেতু কোন রাগ বা অনুরাগের বশবর্তী না হওয়ার বিষয় উল্লেখ আছে তাই নীতি-নৈতিকতার সর্বোত্তম মান বিবেচনা করেই সাংবিধানিক গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। কোন মন্ত্রীর পদত্যাগ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পদক্ষেপ নেয়ার একটি সুযোগ রাখা হয়েছে ৫৮(২) অনুচ্ছেদে, ৫৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ঃ “প্রধানমন্ত্রী যে কোন সময়ে কোন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করিতে অনুরোধ করিতে পারিবেন এবং উক্ত মন্ত্রী অনুরূপ অনুরোধ পালনে অসমর্থ হইলে তিনি রাষ্ট্রপতিকে উক্ত মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটাইবার পরামর্শ দান করিতে পারিবেন”। অর্থাত্ কোন মন্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করেন তাহলে প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেন এবং তা পালনে অসমর্থ হলে তিনি রাষ্ট্রপতিকে মন্ত্রীর নিয়োগ অবসান ঘটাবার পরার্মশ দান করতে পারেন। তবে স্বেচ্ছায় মন্ত্রীর পদত্যাগ প্রশ্নে সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর কোন মত-অভিমত বা সিদ্ধান্ত প্রদানের প্রয়োজন নেই। এখন যে সকল মন্ত্রী স্বেচ্ছায় নিজের পদত্যাগপত্র লিখে স্বাক্ষর করে প্রধানমন্ত্রীর নিকট জমা দিয়েছেন বা দেবেন তখনই তাদের মন্ত্রিত্বের অবসান হবে। প্রসংগত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করার জন্য পদত্যাগপত্র সংবিধানের ৫৮(ক) মোতাবেক ২০০৯ সালের ৩১ মে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এবং পরদিন পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পদত্যাগপত্র প্রদান করেন। যা ৩১ মে ২০০৯ থেকেই কার্যকর হয়েছে। এর পরেও গত কয়েক বছর ধরে দপ্তরবিহীন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বহাল ও বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়েছিল। একজন মন্ত্রীর স্বীয় পদত্যাগের সাংবিধানিক সুরক্ষার অধিকার তিনি ভোগ করতে পারেননি। এ ধরনের সরকারি কার্যক্রম কোনক্রমেই সংবিধানের চেতনা ও নির্দেশনার অনুগামীতো নয়ই বরং সংসদীয় গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। যা সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের স্বীয় পদত্যাগের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষা প্রদান করেছে, এসব পদকে লাভজনক পদ নহে ঘোষণা করেছে। পদের মহিমা বিবেচনা করেই সংবিধান এ অধিকার সংরক্ষণ করেছে। পদত্যাগ নিয়ে সরকারের অবৈধ সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে যা খুবই দুঃখজনক। আর অন্যদিকে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৬ এপ্রিল ২০১২ সংবাদ সম্মেলনে বলেন “সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আমি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছি”। সংবাদ সম্মেলন শেষে পতাকাবিহীন গাড়িতে করে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত রেল ভবন থেকে বের হয়ে যান। অর্থাত্ তার পদত্যাগপত্র প্রেরণ করাই পদত্যাগের জন্য চূড়ান্ত। যার কারণে তিনি ঐদিন মন্ত্রিপরিষদের সভায় অনুপস্থিত থেকেছেন, গাড়িতে পতাকা বহন করেননি। যিনি নিজেই প্রমাণ করেছেন তিনি আর মন্ত্রী নন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে তার পদত্যাগের ৩০ ঘন্টার পর রেল মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি দিয়ে আবার দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেছেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত যদি ১৬ এপ্রিল অপরাহ্নে পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন ঐ থেকেই তার পদ শূন্য হয়ে পড়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘Rules of Business’ 1996-এর ‘Allocation of Business’-এর ৪ অনুযায়ী মন্ত্রীর দায়িত্ব বন্টন বা পুনঃবন্টন করার ক্ষমতায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত। যেহেতু ১৬ এপ্রিল ২০১২ তারিখ অপরাহ্ন থেকেই সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত পদত্যাগের কারণে মন্ত্রী নহেন সুতরাং তাকে ১৭ এপ্রিল ২০১২ তারিখ রাতে মন্ত্রীর দপ্তর বন্টন পুনঃবন্টনের আওতায় আনা সম্ভব নয়। কারণ ১৬ তারিখ পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার সাথে সাথেই মন্ত্রীর পদ শূন্য হয়েছে। সুতরাং ‘Rules of Business’ 1996-এর ‘Allocation of Business’-এর ৪ সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের বেলায় প্রযোজ্য হবে না। সংবিধানের ১৪৮(১) মোতাবেক পদের শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা এবং অনুরূপ শপথপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। তৃতীয় তফসিল মোতাবেক মন্ত্রী পদের বিপরীতে পদের শপথ এবং গোপনতার শপথ গ্রহণ করেন। যেহেতু মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে হয় পদত্যাগ ও মন্ত্রীর পদ থেকে করতে হয়। ফলে তার শপথেরও অবসান ঘটে। সুতরাং মন্ত্রী পদত্যাগ করার পর দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার কোন সাংবিধানিক এখতিয়ার নেই। যারা পদত্যাগ করেন তাদেরকে অবশ্যই পুনরায় মন্ত্রী করা যাবে, তবে ঐ শপথের আওতায় নয়। সংবিধানের নির্দেশনা কোনক্রমে ‘Rules of Business’ 1996-এর ‘Allocation of Business’ বা অন্য কোন প্রশাসনিক বিধি-বিধানের আওতায় খর্ব করা যাবে না। সুতরাং মন্ত্রীর পদত্যাগ সংক্রান্ত বিষয়ে আনুষ্ঠানিকতাসম্পন্ন না করে দায়িত্ব অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হবে সংবিধানের সুস্পষ্ট লংঘন। আর সরকার প্রধান শপথ নিয়েছেন সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করার জন্য। সংবিধানই হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। এ বিষয়ে সরকারের সাংবিধানিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। লেখক :গীতিকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ই-মেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন