নৈতিক বোধ ও খাদ্যের অপচয়

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:২৮
যাহাদের অঢেল রহিয়াছে তাহারা কি কখনও ভাবিয়া-চিন্তিয়া খাদ্য গ্রহণ করেন? অপচয়, অর্থাত্ প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু নষ্ট করিবার অভ্যাস এক ধরনের বিলাসিতা। মানুষের বিপুল অর্থ থাকিলে তাহার অপচয় করিবার ক্ষমতা থাকিতে পারে বটে, কিন্তু নৈতিক অধিকার আছে কি? কেন নৈতিক অধিকার নাই, তাহা বলিবার পূর্বে বহুল আলোচিত ও চর্চিত তথ্য পুনরায় স্মরণ করিয়া নেওয়া যাক। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বিশ্বে ফি বত্সর প্রায় ১৩০ কোটি টন খাদ্য নষ্ট হয়, যাহা বিশ্বের মোট উত্পাদিত খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ! আর এই খাদ্য অপচয়ের কারণে বাত্সরিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭৫ হাজার কোটি ডলার—যাহা আমাদের মুদ্রায় প্রায় ৬০ লাখ কোটি টাকা। অথচ ওই একই সময়ে বিশ্বে দৈনিক ১৭ কোটি লোক ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটান। ভোক্তারা নিত্যদিন, বিশেষ করিয়া ধনী দেশসমূহে যে বিপুল পরিমাণে খাদ্য নষ্ট করিয়া থাকেন তাহা সমস্ত সাবসাহারা অঞ্চলে উত্পাদিত খাদ্যের সমান। আমরা দেখিতেছি, মুদ্রার এক পৃষ্ঠে ফি বত্সর বিশ্বে উত্পাদিত খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশের অপচয় হইতেছে, অন্যপিষ্ঠে ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়! একদল অতিভোজী এবং অপচয়কারী মানুষ যখন ফেলাইয়া-ছড়াইয়া নষ্ট করিতেছে লাখ লাখ টন খাদ্য, তখন আমরা বিমর্ষ হই এই কথা জানিয়া যে—পৃথিবীর প্রতি সাতজনের একজন ঘুমাইতে যায় ক্ষুধার্ত পেটে। ফি বত্সর পাঁচ বত্সরের কমবয়সী বিশ হাজার শিশু জঠরের বহ্নিজ্বালা সহ্য করিতে না পারিয়া বিকশিত হইবার পূর্বেই মায়া ত্যাগ করিতে বাধ্য হয় এই পৃথিবীর; প্রতি দশজন নারীর ভিতরে সাতজনই ভোগেন অপুষ্টিজনিত রক্তস্বল্পতায়! অর্থাত্, আমরা বাঁচিয়া রহিয়াছি এমন এক প্রাচুর্যময় দুনিয়ায় যেখানে খাদ্য উত্পাদন চাহিদাকে ছাপাইয়া যাওয়া সত্ত্বেও ৮৭ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগিতেছে, শৈশবের বৃদ্ধিহীনতা যেখানে নীরবে সর্বব্যাপী রোগের চেহারা লইতেছে। বাংলার গ্রামীণ জনপদে প্রবাদ আছে—‘যে খায় খুঁইটে (খুঁটে), ভাত তার পাতে যায় হাঁইটে (হেঁটে)’। ইসলাম ধর্মেও বলা হইয়াছে, অপচয়কারী শয়তানের ভাই। তাহাছাড়া আমরা গরীব দেশ বলিয়া অপচয় খুব বেশি করিবার সুযোগ থাকে না। কিন্তু ‘অপচয়’ করিবার বিষয়টি অনেকখানিই ‘মানসিক’। সুতরাং অর্থনৈতিক সামান্য উন্নতিও আমাদের বিলাসী করিয়া তোলে খাদ্য অপচয়ে। তখন আর কোনো নৈতিক কথা বা প্রবাদ আমরা ভ্রূক্ষেপ করি না। কেননা, অপচয়নের ভিতরে নিজের বিলাসী সামর্থ্য দেখাইবার বা আভিজাত্য প্রকাশ করিবার প্রবণতা থাকে। বিশেষ করিয়া নব্য ধনীদের। আর পশ্চিমা দেশের অধিকাংশ মানুষ এমনিতেই ছড়াইয়া-ছিটাইয়া খায় তাহাদের স্বভাব-সুলভ মানসিকতায়। এই কারণে এইবারের অপচয়রোধের স্লোগান ছিল—‘ভেবে চিন্তে খাই, অপচয় কমাই’। এক গবেষণায় জানা গিয়াছে, সারা বত্সর মার্কিনীরা যে পরিমাণ খাদ্য অপচয় করিয়া থাকে, তাহা দিয়া ২০০ কোটি মানুষকে সারা বত্সর ভরপেটে খাওয়ানো সম্ভব। খাদ্য উত্পাদন প্রক্রিয়ায় নির্গত হয় বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের ৩০ শতাংশ। তাহাছাড়া পৃথিবীর সামগ্রিক নষ্ট হওয়া খাদ্যের পরিমাণ মোট উত্পাদিত দানাশস্যের অর্ধেকেরও বেশি। প্রতি বত্সর ৩৩০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যাহার অবস্থান রহিয়াছে কার্বন নির্গমনে শীর্ষ দুই দেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। সুতরাং অনেক বেশি খাবার ক্রয় করিয়া এবং তাহার বৃহদাংশ না খাইয়া ফেলিয়া দেওয়ার ‘মূল্য’ শুধু ডলারেই শেষ হইয়া যায় না। নৈতিকতার প্রশ্ন এইখানেই। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখিতে আগামী প্রজন্মের কাছে বিশ্বের সকল মানুষেরই দায়ভার রহিয়াছে। খাদ্যের অপচয় রোধ করিয়াও সেই দায়ভার কিছুটা পালন করা যায় বটে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন