[ রা জ নী তি ]

নির্দলীয় বনাম সর্বদলীয় সরকার

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৪
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বেশ কিছু প্রস্তাব মিডিয়ার সম্মুখে দেয়া হয়েছে। দুটো প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধান দুই দলের পক্ষ থেকে দলীয় প্রধানদ্বয়। ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া বেতার ও টিভি ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা হিসেবে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের সদস্যদের নিয়ে সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থা গঠনের একটি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। তার প্রস্তাবটি নাগরিক সমাজের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি এবং আশাবাদ সৃষ্টি করেছিল। ১৮ দল প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান না করলেও ২দিন পর জোটের পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি পাল্টা প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যে তাদের দেয়া নির্দলীয় সরকার গঠনের জন্যে সংবিধানে আবার কাটাছেঁড়া করতে হবে, তাতে কতো ধরনের জটিলতা আসতে পারে তা বিএনপি বোঝে না এমনটি নয়। তবে বিএনপি তাদের বিশ্বাস ও আন্দোলনের মূল বিষয়বস্তুকে নিয়ে এমন একটি প্রস্তাব দিতে গেল যা নিয়ে কোনো মহলকেই সিরিয়াস কোনো আলোচনা করতে দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির নিজের অবস্থানও এখন দোদুল্যমান, পরিষ্কার নয়। বিএনপি থেকে যেটি বলা হচ্ছে তা হলো শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে সর্বদলীয় সরকারে তারা অংশ নেবে না, সেই নির্বাচন তারা দেশে অনুষ্ঠিত হতে দেবেও না অর্থাত্ প্রতিহত করবে। কোনো নির্বাচনে কোনো দল অংশ নেবে কি নেবে না সেটি সেই দলের একান্ত বিষয়। কিন্তু কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেবে না, এটি বোধহয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে পড়ে না। বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট বরং জনগণকে তেমন নির্বাচন বর্জন করার আহ্বান জানাতে পারে। জনগণ ১৮ দলের প্রতি আস্থাশীল হলে নির্বাচন বর্জন করবে, তাতে আশানুরূপ ভোটারের উপস্থিত না ঘটলে সেই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা দেশে-বিদেশে বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। সেই পথে বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট যাবে না বলেই মনে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন কালীন সরকার ব্যবস্থা হিসেবে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবটি আলোচনায় এখনো রয়েছে পরিত্যাজ্য বলে কেউ দাবি করেননি। তবে এ ধরনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাকে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করা ও রূপ দেয়ার জন্যে যে ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া দরকার তা কিন্তু কোনো মহলেই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। নির্বাচনকালে অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকারের কর্মপরিসর, কার্যবিধিসহ অনেক কিছুই চূড়ান্ত করা প্রয়োজন, এর আকার কেমন হওয়ার কথা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কতোটা স্বাধীন থাকবে, সেখানে প্রশাসনসহ কোনো পক্ষের নির্বাচনে সহায়তা করা ছাড়া অন্য কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেগুলো শুধু মুখের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় প্রণীত ও কার্যকর আইন নিয়ম-নীতি, আচরণ বিধি প্রণীত ও কার্যকর হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। সে কাজগুলো হচ্ছে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া প্রস্তাবটি নিয়ে রাজনৈতিক মহল আলোচনা-পর্যালোচনায় মাধ্যমে এর একটি বিধি-বিধানগত ভিত্তি তৈরি করা আবশ্যক। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারের এ ধরনের একটি ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কার্যকর আছে। বিদায়ী সরকার প্রধান একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করে থাকেন নির্বাচনের সময়। অন্যান্য দেশে প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধান একটি ছোট সরকার গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তেমন একটি ব্যবস্থার ধারণাই সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন। এর সঙ্গে তিনি যেটা নতুনভাবে সংযোজন করেছেন তা হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকারে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব রাখা। এটি একটি ভালো চিন্তা। শুধু আগামী সরকারের জন্যই না হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বড় দুই তিনটি দল ভবিষ্যতে নির্বাচনকালে অংশ নেয়ার বিধান চালু করতে পারে। তবে কত সদস্য বিশিষ্ট সরকার এটি, তাতে বড় বিরোধী দলের আসন সংখ্যা কতো হতে পারে তা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। কোন কোন মন্ত্রণালয় বিরোধীদের হাতে দিলে সরকারের স্বচ্ছতা সকলের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পদে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সংবিধানকে এড়িয়ে নতুন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে না যাওয়াই শ্রেয়। দেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় এরিমধ্যে যতোটুকু অগ্রগতি হয়েছে তাকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়ার ক্ষমতা বোধ হয় এখন আর কোনো সরকার বা ব্যক্তি বিশেষের নেই। তেমন কিছু করতে গেলে আমাদের দেশের ভোট সচেতন মানুষ ঘরে বসে থাকবে তা ভাবার কোনো কারণ নেই। এখন ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা থাকায় জাল ভোট বা ভুয়া ভোট দেয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচন কেন্দ্রে কেন্দ্রে বড় বড় দলগুলোর পুলিং এজেন্ট প্রতিনিধি ইত্যাদি থাকার পর ভোট নিয়ে বাড়াবাড়ি করার সুযোগ কোনো দলের আছে বলে মনে হয় না। সরকারি দলের জন্যে বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটাতে হলে ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দলটির জন্য মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং কারচুপির নির্বাচনের বাস্তবতা এখন আছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। সেই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী পদে কে থাকলেন বা থাকলেন না নির্বাচনে খুব বেশি প্রভাব ফেলার সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে মনে হয় না। ফলে নির্বাচনকালী সরকার ব্যবস্থা কতোটা স্বচ্ছ হওয়া সম্ভব তার ওপর নির্ভর করছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধারা সৃষ্টি করা। আমাদের রাজনৈতিক দল, সংবিধান ও সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে যাদের যথেষ্ট বস্তনিষ্ঠ চিন্তা-ভাবনা করার অবস্থান রয়েছে, রাজনীতিতে যারা সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী চিন্তা করার দক্ষতা রাখেন তাদেরই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। তাদেরই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা প্রয়োজন ছিল বা এখনো আছে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ ইতিপূর্বে বাস্তবতা নির্ভর ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনায় অনেক বেশি হেঁটেছে। ফলে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি। দেশে এমনকি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাতেও তেমন কোনো হোমওয়ার্ক করা হয়নি। ফলে সেটি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে যারা অবস্থান করছেন, যারা তেমন ব্যবস্থায় বিশ্বাস করেন তারা কেউ আসলে একটি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি কেমন হওয়া উচিত ব্যবস্থাটি যথার্থই কার্যকর ও নির্দলীয় রূপ পেতে পারে তেমন কোনো প্রস্তাব বা রূপরেখা দিচ্ছেন না, দিতে পারছেন না। কারণ এ ধরনের পথে হাঁটতে গেলে কতো ধরনের জটিলতা রাষ্ট্রীয় জীবনে আসতে পারে তা অনেকেই ভাবতে পারছেন না। একটি রাষ্ট্রকে এমন অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল অবস্থায় টেনে নেয়ার পরিণতি কী হতে পারে তা ২০০৬ সালে দেখার পরও অনেকের মধ্যেই বোধোদয় বেশ ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা বেশ বিস্ময়কর। আমার ধারণা, বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্বলতাসমূহ ভালোভাবে বুঝে বলেই এর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছে না। আবার প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সর্বদলীয় প্রস্তাবেও তারা অংশ নিতে চাচ্ছে না প্রস্তাবটি অগ্রহণযোগ্য বা অবাস্তব তেমন কোনো বক্তব্যও তাদের নেই। তবে শেখ হাসিনাকে ছাড়া কোনো সর্বদলীয় সরকার গঠিত হলে সেই সরকারের অধীন নির্বাচনে যেতে তারা রাজি এমন বক্তব্য খুবই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী বিদ্বেষী হয়ে যায় সংবিধানকে এমন বায়না পূরণ করে দেয়া যায় কী। মনে রাখতে হবে এখন বিএনপি ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনড় অবস্থান নিলে ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকলে আওয়ামী লীগ তখন বেগম খালেদা জিয়াকে মেনে নেবে বলে আশা করা যাবে না। তাহলে তো একই সমস্যার বৃত্তে দেশ ঘুরপাক খাবেই। তেমন মানসিকতা ত্যাগ না করলে কোনো প্রস্তাব, ফর্মুলাই কাজে দেবে না। প্রয়োজন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা- যা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সামান্যতম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না, আস্থা হারাবে না। সেটি না করা পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে বার বার প্রলয় আসবে, সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দেবে। বিষয়টি জনগণকেও বুঝতে হবে, অবস্থান নিতে হবে। আমাদের মনে হচ্ছে বিএনপি এখন বেশ দোটানায় আছে। নির্বাচনে যাওয়ার জন্য দলের অভ্যন্তরে বড় ধরনের চাপ রয়েছে, না যাওয়ার জন্য জোটের শরিক জামায়াতের দিক থেকে চাপ ও শর্ত আছে বলে শোনা যাচ্ছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে বেশ কিছু সুযোগ দিয়েছিলেন যেগুলো ব্যবহার করলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে বেশ লাভবান হতে পারতো, লাভবান হওয়ার সুযোগ এখনো তাদের আছে। প্রধানমন্ত্রীর ২৮ অক্টোবরের আমন্ত্রণে বেগম খালেদা জিয়া অংশ নিলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতোই। এখন প্রধানমস্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের যে কোনো পদে যাওয়ার যে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন তাতে যাওয়ার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি নতুন করে অন্য রকম হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি কী সরকারকে একদলীয় নির্বাচন করার কোনো ফাঁদে পা দেয়ার পরের পরিস্থিতি নিয়ে ভাবছে, নাকি অন্য কোনো চিন্তা-ভাবনা রয়েছে তা বাইর থেকে বোধগম্য হচ্ছে না। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি কারপক্ষে যাবে নির্দলীয় নাকি সর্বদলীয় সরকারের তা বোঝা যাবে অল্প কদিন পরই। সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।  লেখক : অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন