অনিবার্য পরিণতির মুখোমুখি

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৪
দু’দফা ৬০ ঘণ্টা হরতালের পর ৮৪ ঘণ্টা হরতালের ডাক দেয়ার পরই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র ৫ শীর্ষ নেতাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের ‘গণগ্রেফতার’ যেন পরিস্থিতিকে আরো অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আরো অধিক মাত্রায় জ্বালাও-পোড়াও ভাংচুরের মচ্ছব শুরু হয়ে গেছে। যখন ছুটির দিনেও ক্লাস-পরীক্ষার কসরত করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে তখন বিষয়টি শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সর্বস্তরের মানুষকে আরো হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘পরাজয়ের ঝুঁকি’ থেকে রক্ষার আগাম সতর্কতার লড়াই। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল কিংবা বিরোধী দল যে পক্ষেরই জয়ী হবার সম্ভাবনা তৈরি হোক না কেন; যখন ‘জয়ের আত্মবিশ্বাস’ কিংবা ‘পরাজয়ের উত্কণ্ঠা’ তীব্রতর হয়ে উঠে তখনই শুরু হয় বাঁকা পথের রাজনীতি। বিবাদমান পক্ষদ্বয় আগাম অনুসিদ্ধান্তে এসেছে-আমার জয় কেড়ে নেয়া হবে অথবা আমার এত সহজে হেরে যাওয়া ঠিক হবে না। তাই এক পক্ষ জননিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে ক্রমাগত ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দিয়ে নাগরিকদের নাজেহাল করে যাচ্ছেন। অন্য পক্ষ ‘সংবিধান’ ও ‘নির্বাচনী আইন’ বিশেষ উদ্দেশ্যে রদবদল করে এখন পরিবর্তিত আইন ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মরণপণ লড়াই করে যাচ্ছে। এতে কে কি বললো সেটা শোনা বা বিবেচনা করার মতো ‘পরিস্থিতি’ আপাতত তাদের নেই। ফলে পিষ্ট হচ্ছে জনগণ-দূর হচ্ছে না সংকট। ‘সংলাপ’ সুস্থ ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। কিন্তু বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সংলাপের চেয়ে ‘সদিচ্ছা’ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। নতুন করে ‘গণগ্রেফতার’ ও ‘দমননীতি’ সমঝোতার পথে দৃশ্যমান নিভু নিভু প্রদীপটিকেও ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হল। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল যখন রীতিমতো ‘দলীয় টিকিট’ বিক্রি শুরু করে দিয়েছেন সে মুহূর্তে ‘বিতর্কিত’ নির্বাচন কমিশনের আজ্ঞাবহ তত্পরতা ‘একতরফা’ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’কে আরো দৃশ্যমান করে তুলছে। দু’টি প্রধান রাজনৈতিক শিবির থেকে পরিস্থিতিকে যেভাবে দেখা হচ্ছে বা এর ‘সম্ভাব্য পরিণতি’ সম্পর্কে যা ভাবা হচ্ছে তা রীতিমতো আত্মঘাতী বা লোমহর্ষকও বটে! পারস্পরিক ‘সহনশীলতার’ বিষয়টি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক উভয়ের কাছে। বিরোধী দল সম্ভব হলে ‘যে কোন পথে’ দাবি আদায়ে সচেষ্ট। সরকার ‘ঐতিহাসিকভাবে’ অর্পিত দায়িত্ব পালনে যে কোন ব্যবস্থা নিতে হলেও ‘আত্মরক্ষা’ করতে পিছপা হবে না। ‘নিরবচ্ছিন্ন’ উন্নয়নের জন্য আরো এক টার্ম ‘নিরবচ্ছিন্ন ক্ষমতায়’ থাকার স্বার্থে তারা বিরোধী দলের জোট ও ভোট ‘বানচাল’ করতে যে ‘কথিত’ মাস্টারপ্ল্যান করেছে তার ‘কার্যকারিতা’ অনেক ক্ষেত্রেই ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হতে থাকলে মূল সংবিধানের ‘স্পিরিট’ এর সাথে ৪র্থ সংশোধনীর ‘এসিড’ লেগে ঝলসে যেতে পারে গণতান্ত্রিক যাত্রার ‘ভাগ্য’। আমাদের ‘নাগরিক সমাজ’ হয় বিভক্ত হয়ে আছেন নতুবা আমরা বিভক্ত দৃষ্টিতে দেখছি। কোন মৌলিক বিষয়ে ‘সহমত’ পোষণ করার সংস্কৃতি প্রায় অনুপস্থিত। দেশের ‘মুরুব্বি’ বা ‘সর্বজন শ্রদ্ধেয়’ এমন একশত জনের একটি তালিকা আমরা করতে পারি অনায়াসেই। কিন্তু সংকট উত্তরণের বিষয়ে কেউ-ই নিজের মতাদর্শ বা অবস্থানের ঊর্ধ্বে কোন ‘চূড়ান্ত’ সিদ্ধান্ত দিতে চাইবেন না। যদিও ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ইস্যুতে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সিনিয়র ও বরেণ্য আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত ‘এমিকাস কিউরী’গণ এর পক্ষে মতামত দেয়া সত্ত্বেও আলোচিত বিভক্ত রায়টি দেয়া হয়। আবার ‘অতি উত্সাহী’ সরকার তা ‘সুবিধামতো’ কাজে লাগিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। যার বিক্রিয়ায় আমরা আজও ক্ষত-বিক্ষত। সরকার যদি ‘চূড়ান্তভাবে’ সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকেন তাদেরকে ‘আরেক টার্ম’ ক্ষমতায় থাকা অপরিহার্য-তাহলে তা জনগণকে খোলাসা করা দরকার। অহেতুক ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’ বা আইনের দোহাই দিয়ে আর ‘প্রহসন’ না করাই শ্রেয়। প্রধান দু’টি শক্তির লড়াই ছাড়া বর্তমান বাংলাদেশে কোন নির্বাচন ‘গ্রহণযোগ্য’ হবে না। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাকি বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা ছাড়া বাকি ১০ জন উপদেষ্টা বিএনপি থেকে দেয়া হলেও কোন লাভ হবে না। সুতরাং আর চিন্তা করে ‘১ মিনিট’ সময়ও নষ্ট না করে ‘প্রধান উপদেষ্টার’ গ্রহণযোগ্য সমাধান করে জাতিকে ‘অধিকতর’ সংকট থেকে মুক্ত করার বিনীত অনুরোধ জানাই। সকলের অংশগ্রহণে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উত্সবের জন্য একটি ‘চূড়ান্ত সদিচ্ছা’ উপহারের অভিপ্রায় জানাই। অন্যথায় অনিবার্য পরিণতির দিকে অব্যাহত যাত্রাই আমাদের নিয়তি। লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ই-মেইল:[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন