ইয়াসির আরাফাতের মৃত্যু :দেশপ্রেমের মূল্য

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৩, ২২:১৮
ইয়াসির আরাফাত মারা যান ২০০৪ সালের নভেম্বরে, প্যারিসের পার্সি সেনা হাসপাতালে। তিনি স্বাভাবিকভাবে ‘মারা’ গিয়াছিলেন বলাটা বোধহয় এক্ষণে আর যথোপযুক্ত হইবে না। সুইজারল্যান্ডের লুজানের রেডিও ফিজিক্স ইনস্টিটিউটের রিপোর্ট যাহা বলিতেছে তাহা বিষ প্রয়োগে আরাফাতকে হত্যার ধারণাকেই সমর্থন করিতেছে। এই বিষ যেনতেন পদার্থ নহে। তাহার নাম পোলোনিয়াম-২১০। পদার্থটি অতিমাত্রায় তেজস্ক্রিয়, একমাত্র কোনো পারমাণবিক চুল্লিতেই ইহা প্রস্তুত করা সম্ভব। পোলোনিয়াম-২১০-এর বিষক্রিয়া এমনই মারাত্মক যে, ইহার এক গ্রামের দশ লাখ ভাগের এক ভাগই মানুষের মৃত্যু ঘটাইবার জন্য যথেষ্ট। আরাফাতের মৃত্যুর জন্য একটি বিশেষ দেশের দিকে অভিযোগের অঙ্গুলি নির্দেশ করা হইতেছে। অথচ তাহার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে পশ্চিমা মিডিয়ায় এই মর্মে সংবাদ প্রকাশ করা হইয়াছিল যে, বয়সজনিত কারণেই এই ৭৫ বত্সর বয়সী নেতার মৃত্যু হইয়াছে। তাহাদের অনুমানের তালিকায় ছিল লিউকোমিয়া হইতে শুরু করিয়া এইডস পর্যন্ত। ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর এই অবিসংবাদিত নেতাকে যে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হইয়াছে— তাহা বারংবার বলিয়া আসিয়াছে আরাফাতের ঘনিষ্ঠ পিএলও নেতারা। এইবার সুইজারল্যান্ডের রিপোর্টে যে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় পদার্থের নাম উঠিয়া আসিয়াছে তাহা কোনো ব্যক্তি পর্যায়ের মানুষের কাছে থাকা সম্ভব নহে। একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রই এই পোলোনিয়াম-২১০ প্রস্তুত করিবার ক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখে। লুজানের ইউনিভার্সিটি সেন্টার অফ লিগাল মেডিসিনের ১০৮ পাতার রিপোর্টে বলা হইয়াছে—আরাফাতের পাঁজর, কোমরের হাড় ও দেহ সংলগ্ন মাটি পরীক্ষা করিয়া দেখা গিয়াছে তাহাতে তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম ২১০-এর পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। সুইস বিজ্ঞানীরা দাবি করিয়াছেন—এই রিপোর্টের ফলাফল ৮৩ শতাংশ ঠিক। যদি সত্যিই ইয়াসির আরাফাতকে হত্যা করা হইয়া থাকে, তবে কাহারা রহিয়াছে ইহার নেপথ্যে? একটি বিশেষ দেশ ছাড়াও নিজ দেশেও শত্রুর অভাব ছিল না আরাফাতের। সত্যিকার অর্থে বিশ্বের কোনো জাতীয়তাবাদী নেতাই অজাতশত্রু হইতে পারেন না। ঘরে-বাহিরে তাহাদের শত্রুর ইয়ত্তা থাকে না। কঙ্গোর স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা নিহত হইয়াছিলেন স্বাধীনতার পরের বত্সরেই, ১৯৬১ সালে। ১৯৭৩ সালের একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় চিলির প্রেসিডেন্ট সালভেদর আলেন্দকে। শেষ অবধি তাহাকেও বাঁচিতে দেওয়া হয় নাই। এমনকি তাঁহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদাকেও হত্যা করা হইয়াছিল বলে অভিযোগ রহিয়াছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও হত্যার শিকার হইয়াছিলেন স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বত্সরের মধ্যে। আমেরিকার প্রবাদপ্রতিম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যা করা হয় ১৮৬৫ সালে। ১৮৮১ সালে গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ হারান আমেরিকার আরেক প্রেসিডেন্ট জেমস এ গারফিল্ড। ১৯৬৩-তে প্রাণ হারান প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। তাহা ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারের নেতা বিশ্বখ্যাত মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে হত্যা করা হয় ১৯৬৮ সালে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, অহিংসবাদী মহাত্মা গান্ধীও ঘাতকের হিংস্রতা হইতে রক্ষা পান নাই। ১৯৫৯ সালে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট সলোমন বন্দরনায়েক নিহত হন। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নগো দিন দায়েম নিহত হন ১৯৬৩ সালে। এইরূপ হত্যার তালিকা দীর্ঘ হইতে দীর্ঘ হইবে। সুতরাং ইয়াসির আরাফাতের বয়স যতই ৭৫ বত্সর হউক, যতই তিনি ব্যাধি ও জরাগ্রস্ত হউন, তাঁহাকে হত্যা করিতে ব্যগ্র গোষ্ঠী ও দেশ তাহার সন্নিকটেই ছিল। কেননা তাঁহার জীবনের শেষের দিকের বত্সরগুলিতে রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা কমিয়া গেলেও তাঁহার উপস্থিতিই অনেক বড় বিষয় ছিল। তাঁহার মৃত্যুর সুবিধা পাইয়াছিল সেই সকল পক্ষ যাহারা ফিলিস্তিনির শান্তি চাহে নাই। দেশে দেশে জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতাদের এইরূপ হত্যার ষড়যন্ত্র কলঙ্কিত করে মানব সভ্যতার ইতিহাসকে। এই বর্বর প্রবণতা হ্রাস পাইবার লক্ষণ এখনও দেখা যাইতেছে না, ইহাই পরিতাপের।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন