কিলিখবো? দেশের খবর দশের খবর ভালো নয়। মনে হয় দেশ পূর্ণ চন্দ্র গ্রহণের দিকে এগুচ্ছে। পূর্ণ সূর্য গ্রহণের উপমা আর টানলাম না। তাহলে আশা করার কিছু থাকে না। সদ্য সমাপ্ত তিনদিনের হরতাল নামক সন্ত্রাসের ঘা দেশের বুক থেকে না শুকাতেই বিএনপি আবার প্রথমে ৭২ ঘন্টা, তারপর টানা ৮৪ ঘন্টার হরতাল ডেকেছে। আর এই হরতাল ডাকার নামে যা হয়, হরতালের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ শুরু হয়ে যায়। এবারও তাই হয়েছে। আজ (রবিবার) ‘দশ দিগন্তের’ পাঠকেরা যখন এই লেখাটি পড়বেন, তখন হয়তো আগের দিনের ধ্বংসযজ্ঞের কথা জেনে তারা শঙ্কিত হয়ে আছেন।
বিএনপি (জামায়াতের সহযোগিতায়) আবার দাবি আদায়ের নামে সন্ত্রাস সৃষ্টিতে নেমেছে; অন্যদিকে সরকার এই সন্ত্রাস দমনের নামে ধর-পাকড়ে নেমেছেন। ইতিমধ্যেই বিএনপি’র শীর্ষ স্থানীয় নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ, এম.কে আনোয়ার, বেগম জিয়ার ব্যবসায়ী উপদেষ্টা আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস এবং জামায়াত ঘেঁষা ব্যারিস্টার রফিক গ্রেফতার হয়ে গেছেন। বিএনপি’র কোনো কোনো শীর্ষ নেতা আত্মগোপন করেছেন।
শুক্রবার রাতে লন্ডনে বাংলাদেশী মহলে ব্যাপক গুজব ছড়িয়ে পড়েছিলো যে, বেগম খালেদা জিয়া গৃহবন্দী হয়েছেন। পরে অবশ্য জানা গেছে, খবরটা সঠিক নয়। তবে তার বাড়ির সামনে বড় রকমের পুলিশ পাহারা রয়েছে। অর্থাত্ সরকার ও বিরোধী দল দু’পক্ষই কনফ্রন্টেসনে নেমে গেলেন। শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়ার মধ্যে টেলিফোন আলাপের (তা যতোই অপ্রীতিকর হোক) ফলে দু’পক্ষের নানা বাগ-বিতণ্ডার মধ্যেও একটা সংলাপ ও সমঝোতার যে আশা অনেকে পোষণ করছিলেন, তা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে গেল।
অথচ টেলিফোন আলাপের পরও শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বেগম জিয়ার জন্য গণভবনে আসার আমন্ত্রণ অব্যাহত রইলো। তিনি যখন খুশি যতো সঙ্গী নিয়ে আসতে চান আসতে পারেন। বেগম খালেদাও বলেছিলেন, তার তিনদিনের হরতাল ২৯ অক্টোবর শেষ হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপের জন্য আসতে পারেন। তাহলে তিনি এলেন না কেন? কেন, নতুন করে আমন্ত্রণ চাইলেন এবং বললেন, কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার পরই আলোচনায় বসা যেতে পারে? যদি বিরোধী দলের মূল দাবিই সরকার আগেই মেনে নেন, তাহলে আলোচনাটা কিসের? কেবল গণভবনে একত্র হয়ে পানভোজনের কি?
অন্যদিকে বিরোধী দল যখন নতুন করে সংলাপে বসার আমন্ত্রণ বা ডাক চাইছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী কেন সেই আমন্ত্রণ জানালেন না? তিনি যদি টেলিফোন আলাপে দেশের স্বার্থে বিরোধী দলীয় নেত্রীর এক ধরনের অশোভন ও অশালীন কথাবার্তা সহ্য করতে পেরে থাকেন, তাহলে তিনি নিজে আর আমন্ত্রণ না জানিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক বা শীর্ষ নেতাদের আর কাউকে দিয়ে এই আমন্ত্রণ জানালে ক্ষতিটা কি ছিল? এই আমন্ত্রণেও বিএনপি আসতো তা মনে হয় না। তারা পুরনো ছুতো তুলতেন, আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানো। এটা যদি হতো সরকার আলোচনায় না বসার দায়মুক্ত হতে পারতেন এবং বিরোধী দলও আজ (১০ নভেম্বর রবিবার) থেকে টানা চারদিন হরতাল ডাকার নামে সন্ত্রাস সৃষ্টির সহজ ছুতো দেখাতে পারতেন না।
এই সন্ত্রাস সৃষ্টি দ্বারা বিএনপি-জামায়াত জনজীবনে চারদিনব্যাপী উপদ্রব ও বিভীষিকা সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবে না। সরকারকে নতি স্বীকার করানো বা সরকারের পতন ঘটানো কোনোটাই তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সম্ভব করতে হলে আন্দোলনে পাবলিককে নামিয়ে গণআন্দোলন করতে হবে, যা অতীতে আওয়ামী লীগ করেছে। বিএনপি একবারও পাবলিককে মাঠে নামাতে পারেনি। তাদের কেবল ভয় দেখিয়েছে। নিজেদের এবং জামায়াতিদের সশস্ত্র ক্যাডার ও ভাড়াটে যুবক (বেশির ভাগ বেকার) দ্বারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে। সন্ত্রাস ও আন্দোলন এক কথা নয়। সন্ত্রাস দ্বারা আন্দোলনের সাফল্য অর্জন করা যায় না। দেশের ও দেশের মানুষের ক্ষতি করা যায়।
অন্যদিকে সরকার সন্ত্রাস দমনের জন্য বিরোধী দলের উপর যতোই কঠোর দমননীতি প্রয়োগ করুন তাতে কি সফল হবেন? আমার এই লেখাটি যখন পাঠকদের চোখে পড়বে, তখন হয়তো বিরোধী দলের আরও অনেক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। আরও কেউ কেউ হয়তো আত্মগোপন করেছেন। বিরোধী দলের নেত্রীও হয়তো গৃহবন্দী না হলেও পুলিশের কড়া নজরদারিতে থাকবেন। তাতে সন্ত্রাস দমন ও সমস্যার সমাধান হবে না। দমন করা গেলে ভারতে গোটা সামরিক বাহিনীর মোকাবিলায় মাওবাদী সন্ত্রাস এখনো চলতে পারতো না। এই ধরনের সন্ত্রাস দমনের জন্য সরকারকে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানও খুঁজতে হবে। এই ব্যাপারে বিদেশি কূটনীতি যাতে পানি ঘোলা না করে সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
অবিভক্ত ভারতেও এই ধরনের অচলাবস্থা দেখা দিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে মহাত্মা গান্ধী মুসলিম লীগ নেতা জিন্নাকে তার সঙ্গে আলোচনায় বসার ডাক দিলে জিন্না বলেছিলেন, ‘আগে পাকিস্তান দাবি মেনে নিন, তারপর আলোচনায় বসবো।’ জবাবে কংগ্রেস নেতারা বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান দাবি নিয়েই তো আমাদের আলোচনা বৈঠক হবে। আগেই দাবি মানতে হলে আলোচনা কিসের?’
দুই পক্ষের মধ্যে এই বৈঠক সম্ভব করার জন্য তখন ভারতে অনেক অদলীয় জাতীয় ব্যক্তিত্ব অগ্রণী হয়েছেন। যেমন স্যার তেজবাহাদুর সাপ্রু, রাজা গোপালাচারিয়া, স্যার আকবর হায়দারি প্রমুখ। তারপরতো ব্রিটিশ শাসকদের সালিশিতেই গান্ধী-জিন্না বৈঠক হয়েছে। ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে খণ্ডিত স্বাধীনতা। জিন্না পাকিস্তান পেয়েছেন, তার নিজের ভাষায় a truncated pakistan (একটি খণ্ড খর্ব পাকিস্তান)। দু’পক্ষের পারস্পরিক আলোচনায় বিরোধের মীমাংসা হলে উপমহাদেশের এমন সর্বনাশ হতো না। এটা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের অভিমত। আমার একার নয়।
বর্তমান বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে বিরোধ যতো মৌলিক ও অনতিক্রমণীয় হোক একটি নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের (সুযোগ সন্ধানী তৃতীয় শিবির নয়) সালিশিতে দুই দলের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে এক বা একাধিক বৈঠক হলে এবং সমস্যা সমাধানের একটা সূত্র আবিষ্কৃত হলে দেশ বাঁচতো, সাধারণ মানুষ এই নিত্য বিড়ম্বনা ও ভোগান্তি থেকে বাঁচতে পারতো।
কিন্তু অবিভক্ত ভারতের এই তৃতীয় পক্ষ ও অদলীয় জাতীয় ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে এখন কোথায়? যে কয়েকজন জাতীয় ব্যক্তিত্বে উত্তোরিত হতে যাচ্ছিলেন, যেমন ড. মুহম্মদ ইউনূস, ড. কামাল হোসেন, বিচারপতি হাবিবুর রহমান (শেলী), বিচারপতি সাহাবুদ্দীন প্রমুখ কেউ তাদের অতীতের কার্যকলাপ এবং কেউ কেউ বর্তমানে পক্ষপাতিত্ব ও বিতর্কমূলক ভূমিকা গ্রহণ করার দরুন সেই মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। অতীতে ফয়েজ আহমদের মতো একজন প্রবীণ সাংবাদিক ছিলেন, যিনি দুই নেত্রীর মধ্যে সরাসরি বৈঠক করার একটা উদ্যোগ গ্রহণে সাহস ও যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন। আজ সেই উদ্যোগ গ্রহণেরও কেউ নেই, যিনি দুই নেত্রীর কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।
এই অবস্থায় বিরোধী দলের সন্ত্রাস এবং সরকারি দলের দমন নীতি কি চলতেই থাকবে? দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনা বাড়তে থাকবে জন-জীবনে? সন্দেহ নেই বিএনপি’র ঘাড়ে যতোদিন সিন্দবাদের দৈত্যের মতো জামায়াতের অবস্থান থাকবে, ততোদিন বিএনপিকে বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোগী করা যাবে না। এই অবস্থায় দেশের এবং জনগণের বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে বর্তমান সরকারকেই শান্তিপূর্ণ বিরোধ মীমাংসায় এবং যথাসময়ে সকলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এটি আমার মতো এক নগণ্য সাংবাদিকের প্রস্তাব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবেচনা করে দেখতে পারেন। আওয়ামী লীগ সরকার আবার বিরোধী দলকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানাবেন। প্রথমেই দুই নেত্রীর মধ্যে সরাসরি বৈঠক না হয়ে দু’ পক্ষেরই প্রভাবশালী সদস্যদের দ্বারা গঠিত দু’টি টিম বিরোধ মীমাংসার একটি সূত্র উদ্ভাবনের জন্য বৈঠকে মিলিত হবেন। একবারে সূত্র উদ্ভাবন করা না গেলে তারা বার বার বসবেন। শেষ পর্যন্ত সূত্রটি উদ্ভাবিত হলে তা নিয়ে দুই নেত্রী সরাসরি বৈঠকে বসবেন।
আওয়ামী লীগের টিমে প্রবীণ নেতাদের মধ্যে তোফায়েল আহমদ, সুরঞ্জিত সেন, মহাজোট থেকে রাশেদ খান মেনন, উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে হোসেন তৌফিক ইমামকে রাখা যেতে পারে। বিএনপি’র টিম খালেদা জিয়া মনোনয়ন দেবেন। তাতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম,কে আনোয়ার প্রমুখকে বেগম জিয়া রাখতে চাইলে সরকার তাদের মুক্তি দেবেন এবং আলোচনার অনুকূলে বিরোধী দলের সাড়া পেলে বর্তমান কঠোর পুলিশী ব্যবস্থাসহ দমননীতি প্রত্যাহার করবেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে মিডিয়ার সংখ্যা, শক্তি ও প্রভাব সবকিছুই বেশি। তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার বা বিরোধী দল কোনো পক্ষকে একতরফা দোষারোপ না করে দুই দলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ বিরোধ মীমাংসার জন্য কার্যকর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে শক্তিশালী জনমত গঠন ও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন। ব্রিটেনে বহু সময় বিভিন্ন ইস্যুতে মিডিয়াই ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনমত গঠন এবং জনমতের চাপ দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের মত পরিবর্তনে বাধ্য করেছেন। এমনকি সরকারকেও।
গণতন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে বিতর্ক ও আলোচনা (debate and discussion) ইউরোপের মিডিয়া বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেরাই বিতর্ক ও আলোচনার সূত্রপাত ঘটান এবং বিতর্কের মধ্য দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতটিকে সমস্যার সমাধান সূত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বহু সময় দেশের সরকার তা জনরায় হিসেবে মেনে নেন। বাংলাদেশেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মৌলিক বিরোধের ইস্যু বা ইস্যুগুলো নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে, টেলিটক শো’তে, আলোচনা সভায় সুস্থ বিতর্ক (পারস্পরিক দোষারোপ ও গালি নিন্দা নয়) চলতে পারে।
সকলকেই বুঝতে হবে, “আওয়ামী লীগ, তুই চোর”- জাতীয় কথা টকশো’তে বা আলোচনা সভায় কোনো সুস্থ বিতর্ক নয়; বরং অনাবশ্যক ও উদ্দেশ্যমূলক উস্কানি। সকল পক্ষকেই ঠাণ্ডা মাথায় যুক্তিসহ বিতর্কে ও আলোচনায় নামতে হবে এবং বর্তমানের সঙ্কট থেকে উত্তরণের একটা সমাধান সূত্র বের করতে হবে। এই সমাধান সূত্রটি সরকার ও বিরোধী দলের কাছে পেশ করতে হবে এবং তারা যাতে সেটি মেনে নেন তজ্জন্য জনমতের শক্তিশালী চাপ প্রয়োগ করতে হবে।
অনেকে আমার এই প্রস্তাবটিকে অবাস্তব ও তত্ত্বকথা মনে করতে পারেন। কিন্তু বর্তমানের অব্যাহত অনিশ্চয়তা, অরাজকতা, রক্তপাত ও সন্ত্রাসের বদলে কোনো তত্ত্ব দ্বারাও যদি একটি শান্তিপূর্ণ মীমাংসা সূত্র আবিষ্কার করা যায়, তাহলে সেই চেষ্টা কি এই সঙ্কট সন্ধিক্ষণে আমাদের সকলেরই করা উচিত নয়?
লন্ডন ৯ নভেম্বর, শনিবার, ২০১৩
