হরতাল, রাজনীতি ও নির্বাচন

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪১
আমার নাতী তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। তিনদিনের হরতালে স্কুল বন্ধ। তাই প্রতিবেশী বন্ধুর সাথে সময় কাটাতে দু’জন এক সাথে। তারা খেলছে আর কথা বলছে। নাতী- হরতালে খুব মজার। স্কুলে যেতে হয় না, সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয় না। ‘বন্ধু, তা ঠিক, সারা বছর হরতাল হলে আরো ভাল হতো।’ ইতোমধ্যে ১০/১১ বছরের হাসু জিজ্ঞেস করে, ‘ভাইয়া হরতাল কি? প্রশ্ন শুনে হা হা করে হেসে উঠে আমার নাতী বলে, ‘দেখ হাসু কত বোকা, হরতাল কি তা বুঝে না। আরে হরতাল মানে স্কুল বন্ধ। শ্লোগান মিছিল, রাস্তায় মারামারি, Ben-10’এর মত ফায়ার, ফাইট।’ হাসুর পাল্টা প্রশ্ন, ‘কেন এমন হয়?’। প্রশ্নটি আর তারা শুনতে পারে না। আর এক বন্ধুর আগমনে আলোচনার মোড় ঘুরে যায়। আমার মাথাও ঘুরে যায় অবুঝ শিশুদের মন্তব্যে। যারা প্রবীণ উচ্চশিক্ষিত, জ্ঞানী-গুণী, রাজনীতি বিশ্লেষক তারা কি বর্তমান হরতালের অর্থ আমার নাতীর গল্পের হরতালের চেয়ে বেশি কিছু কি? এক সময় হরতাল ছিল গঠনমূলক, প্রতিবাদের মাধ্যম, গণআন্দোলনের ভাষা, ছিল মূল্যবোধের হরতাল। কিন্তু আজ? হরতালের ভাষা ও রাজনীতির একি বহিঃপ্রকাশ। হরতালেরও যে কিছু নিয়ম-কানুন আছে সে দিকে কোন তোয়াক্কা নেই, নেই কোন শিষ্টাচার বা মানবিক আচরণ। স্বাধীন দেশে বোমা বা ককটেল বিস্ফোরণে শত শত মানুষকে পঙ্গু করে দেয়া, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা, রেললাইন উপড়ে ফেলা, রেলে আগুন দেয়া, যাত্রী ভর্তি বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারা, বাস ডিপোতে আগুন দেয়া হচ্ছে। রেহাই পাচ্ছে না মুমুর্ষ রোগী কিংবা রোগী বহনকালী এ্যাম্বুলেন্স। শিশু, নারীসহ লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীরাও হরতালের প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে। হরতালে প্রতিহিংসার আগুনে মৃত পিতাকে ফিরে পাবার জন্য পাঁচ বছরের এক শিশুর আর্ত চিত্কারে আকাশ বাতাস ভারী হলেও হরতালকারীদের মনে এতটুকু দাগ কাটে না। প্রথমে ৬০ ঘন্টার হরতাল, পরে আরো ৬০ ঘন্টা এবং আবার ৮৪ ঘণ্টার হরতাল চলছে। কিন্তু এ হরতাল কাদের জন্য? কিসের জন্য? এ হরতাল কি গণমুখী হরতাল? এ হরতাল কি সাধারণ মানুষের স্বার্থে? মোটেও না। এ হরতাল ক্ষমতা দখলের হরতাল, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে হরতাল। ভয়-ভীতি, অরাজকতা সৃষ্টির হরতাল। বর্তমান রাজনীতি যেন অপসংস্কৃতির পরিচায়ক। বর্তমান রাজনীতি মনে হয় অনেকটা নীতিহীন সেবা-ধর্ম বিবর্জিত। বর্তমান রাজনীতিতে মূল্যবোধ খোঁজে পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যেন ক্ষমতার রাজনীতি শ্বাসরোদ্ধ করে রেখেছে। ফলে প্রতিনিয়ত দেখছি গুম, হত্যা, রক্তাক্ত রাজপথ, শংকিত জনপদ, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, ভুলুণ্ঠিত জনসম্পদ, পুড়ছে রাষ্ট্রের সম্পদ। অর্থ সম্পদের লোভ, আধিপত্য বিস্তার তথা ক্ষমতা লোভের মোহে সংঘাত, সহিংসতাপূর্ণ রাজনীতির যে রূপ তাতে সভ্যতা, মানবিকতা, সেবা, সহনশীলতা ত্যাগ ও আন্তরিকতা একেবারে বিবর্জিত। পরিবর্তে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, প্রতিহিংসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও দূরদর্শিতায় একটি দেশ যেমন উন্নতির চরম শিখরে উঠতে পারে তেমনি অদূরদর্শিতা ও ক্ষমতার রাজনীতিতে একটি দেশ বা জাতি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়। একটি দেশের সভ্যতা গড়ে উঠে যখন সেবা, ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে সেতু বন্ধন ঘটে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনে প্রতিষ্ঠিত হয় সভ্যতা। সভ্যতার জন্য চাই মুক্ত মন, স্বাধীন চিন্তা চেতনার প্রকাশ, সত্যকে সত্য আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার দুর্জয় শক্তি। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ, মানবিক মূল্যবোধ ও উত্কর্ষ সাধন আজ একান্ত প্রয়োজন। অরাজকতা ও হরতালের রাজনীতি, দুর্নীতির রাজনীতি, আধিপত্য বিস্তার ও ক্ষমতার রাজনীতি। প্রয়োজন জনকল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাজনীতি। সে লক্ষ্যে দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে শান্তির পথে, অগ্রগতির পথে, উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। দেশে বর্তমান নির্বাচন নিয়ে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা প্রকৃতপক্ষে অতি সাধারণ। প্রয়োজন সরকারের দলীয় ও বিরোধী দলের দু’নেত্রীর আন্তরিকতা, দূরদর্শিতা ও গণকল্যাণমুখী মনোভাব। ক্ষমতার রাজনীতিতে নয়, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ক্ষমতাই পারে মুহূর্তে এ সংকট নিরসন। সমপ্রতি সংকট নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীকে ফোনালাপের যে উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন তা আশাকরি দেশবাসী মনে রাখবে। আমি মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরো দূরদর্শীপূর্ণ উদাহরণ স্থাপন করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক যে পরিচয় আছে তা বাংলাদেশের আর দ্বিতীয় কারো নেই। আপনি অনন্য। আশাকরি নির্বাচন সংক্রান্ত সংকট নিরসনেও এক অনন্য ভূমিকা রাখবেন। সংবিধান দেশ পরিচালনার জন্য, মানুষের জন্য, যা পরিবর্তনশীল। এর দুটো দিক, একটি Legal aspect আর একটি Legitimate aspect. Legal administration is set down the law but Legitimate administration is supported by consensus, logic and reasons. সংবিধান একটি পবিত্র আমানত। এ আমানত সংরক্ষিত হয় জনগণের কল্যাণে। আবার জনগণের কল্যাণে, বিশেষ সংকট নিরসনে, set guidelines দিয়ে সবসময় সম্ভব হয় না বলেই অবস্থার প্রেক্ষিতে consensus, logic এবং reasons কে প্রাধান্য দিতে হয়। যা হোক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপর সংকট সমাধানের অগাধ বিশ্বাস রেখে নির্বাচনের একটি সহজ সমীকরণ উপস্থাপন করছি। নির্বাচনকালীন সরকারের সহজ সমীকরণ:সর্বদলীয় + নির্দলীয় = নিরপেক্ষ। ব্যাখ্যা:ক) সরকার দলীয় সংসদ সদস্য = ৩ জন, বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য = ৩ জন, নির্দলীয় সংসদ সদস্য= ১ জন, মোট সর্বদলীয় = ৭ জন। খ) আইন ও বিচার বিভাগ থেকে মনোনীত = ১ জন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে = ১ জন, শৃঙ্খলা ও প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে = ১ জন, অর্থ ও বাণিজ্য বিভাগ থেকে = ১ জন, সেবা, NGO / গণমাধ্যম = ১ জন, মোট: নির্দলীয় = ৫ জন। এ ৫ জন সদস্য মনোনয়নে প্রথমেই বিরোধী দলীয় নেত্রী ২ জনকে মনোনয়ন দেয়ার পর সরকার দলীয় নেত্রী ৩ জনকে মনোনয়ন দেবেন। সরকার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে (সম্মানপূর্বক) একজন অতিরিক্ত মনোনয়নের ক্ষমতা রাখবেন। নির্দলীয় ৫ জন সদস্য নিয়মিতকরণের পর মোট ১২ জন সদস্য প্রথম অধিবেশনেই consensus এর ভিত্তিতে একজনকে প্রধান করবেন। ব্যর্থতায় মাননীয় প্রেসিডেন্ট সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিবেন। এভাবেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা সর্বদলীয়, নির্দলীয়, সর্বদলীয় এবং নিরপেক্ষ হিসাবে নির্বাচন তথা ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন করবেন। আসুন সবাই মিলে একটি সুন্দর দেশ গড়ি। লেখক: অধ্যাপক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন