পতন যাহাকে বলি

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪৭
জগতে সকল কিছুর পতনই শেষ কথা। কিন্তু সেই শেষ কথার পূর্বে আরও কিছু কথা থাকিয়া যায়। ইতিহাসের দুই লাইনের মধ্যিখানে যেইভাবে লুকিয়ে থাকে আরও অকথিত কথা, পতনের পূর্বাপরেও তাহার গৌরব বা অগৌরবের কাহিনী ভাসিয়া বেড়ায় বাতাসে। যাহাদের শুনিবার কর্ণ আছে, তাহারা তাহা শুনিতে পান বটে। সরলার্থে জগতের সকল বস্তুগত পদার্থেরই পতন হইবে, কিন্তু মানুষের বোধগত জগতে পতনের ব্যাখ্যা ও ভাবনা পতনের মতো এত সরল নহে। পতন সরল। ঘটিবেই বলিয়া তাহা সরল ও স্পষ্ট। কবি ওমর খৈয়ামের ভাবনায়—‘প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে’ একদিন। মহাকালের করাল ও অনতিক্রম্য থাবায় বিলীন হইয়া যাইবে সকল বস্তুগত অর্জন। আর মানুষের মানস জগতের পতনের সর্বাধিক সহজ উদ্ধৃতি হইল—‘অহঙ্কার পতনের মূল’। প্রকৃতিকে উদাহরণ করিয়া এইরূপ অহঙ্কারের চিত্ররূপ পাই মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর ‘রসাল ও স্বর্ণলতিকা’ কবিতায়—যেখানে রসাল (আম গাছ) অহঙ্কারে গরীয়ান ছিল তাহার বৃহত্ অবয়ব ও বিস্তৃতি লইয়া, কিন্তু কালঝড় আসিয়া তাহাকে ভূপাতিত করে, অথচ বাঁচিয়া যায় নিরহঙ্কারী-নগণ্য স্বর্ণলতিকা। বস্তুগত কিছু বা শক্তিমত্তার অহঙ্কার কি মানুষকে কখনো-সখনো ভীত করিয়া তোলে না? পৌরাণিক কাহিনীতে আছে, হাঁটুজলে মানুষ ডুবিয়া মরিছে ভয়ে। আচমকা সে মনে করিয়াছিল তাহার পায়ের তলায় আর মাটি নাই। অহঙ্কার মানুষকে অলীক ভয়ে অস্থির করিয়া তোলে। পায়ের তলায় দাঁড়াইবার জমি থাকিলেও ভ্রম হয় যে, তাহা চোরাবালি। এই সত্য আমরা কোথায় খুঁজিয়া না পাইব? রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাহা বোধকরি অধিক হারে দৃশ্যমান। প্রকৃতপক্ষে উত্থানের প্রথম ধাপ হইতেই যিনি বুদ্ধিমান তিনি এই সত্য মনে রাখেন—পতন একদিন হইবেই। এই অমোঘ সত্যকে শিরোধার্য করিয়া শুধু মনে রাখিতে হইবে তাহা যেন ‘অগৌরবের’ না হয়; কোনো ধৃষ্টতা বা অহংবোধ আসিয়া যেন ত্বরান্বিত এবং গৌরবশূন্য না করে পতনের পরিমণ্ডলকে। ‘ইন্দ্র-পতন’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যেমন বলিয়াছেন—‘তারে স্বর্গের আছে প্রয়োজন, যারে ভালোবাসে মাটি’—সেই মাটি অর্থাত্ দেশ ও জাতিকে কেহ ভালো না বাসিলে তাহার ইহকাল-পরকাল সকল কালেরই অগৌরব পতন ঘটে। জগতের সকল ধর্মগ্রন্থও নৈতিকতার প্রশ্নে একসুরে কথা বলিয়াছে। আমরা আরও একটি দৃষ্টিকোণ হইতে ‘পতন’কে দেখিতে পারি। বলা হইয়া থাকে, এই জগত্ তরঙ্গায়িত চক্রাকারে চলিতেছে। তরঙ্গ একবার উঠিলে, সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছিল, তারপর পড়িল, কিছুকালের জন্য যেন গহবরে পড়িয়া রহিল, আবার প্রবল তরঙ্গাকার ধারণ করিয়া ওপরে উঠিল। এইরূপে তরঙ্গের উত্থানের পর উত্থান ও পতনের পর পতন চলিতে থাকিবে। মানব ইতিহাসের বিভিন্ন জাতিসমূহ উঠিতেছে আবার পড়িতেছে, উত্থানের পর পতন হইতেছে; ওই পতনের পর আবার পূর্বাপেক্ষা অধিকতর শক্তিতে পুনরুত্থান হইয়া থাকে। এই তরঙ্গ গতি সর্বদা চলিতেছে। সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডেও এই সত্য ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রতিভাত। যেমন সামান্য অণুজীব—ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস—যক্ষ্মা, প্লেগ, গুটিবসন্ত, কলেরা-রূপ ধারণ করিয়া মানবজাতিকে কম নাকানি-চুবানি খাওয়ায় নাই। অথচ এই সকল বেশির ভাগ মহাপ্রতাপশীল জীবাণুর রাজত্বের পতন ঘটিয়াছে। কিন্তু সেই শূন্যস্থান শূন্য বসিয়া নাই। আসিয়াছে নূতন নূতন জীবাণু—যেমন এইচআইভি। অর্থাত্ নূতন নূতন মৃত্যুদূত সৃষ্টি হইতেছে সৃষ্টিতত্ত্বের নিজস্ব নিয়মেই। অন্যভাবে বলা যায়, কোনো পক্ষই চিরকাল বসিয়া বসিয়া শুধু মার খাইবে না—ইহাই সৃষ্টিতত্ত্বের পরম সৌন্দর্য। বলা যায়, এই সত্য সর্বজনীন। অর্থাত্ জগতের সকল প্রাণকুলই প্রতিকূলতা কাটাইয়া উঠিতে তাহার অন্তস্থ জিনগত বা মানসগত পরিবর্তন সাধন করিয়া নেয়। প্রকৃতির অন্তর্নিহিত দর্শন আমাদের সেই পরম সত্য প্রতিনিয়তই নানা উপায়ে জানাইয়া দেয় যে, এ জগতে যে যত বড় প্রতাপশালী হউক না কেন, তাহার রাজপাটে একদিন গোধূলি ঘনাইয়া আসিবেই। যাহারা অত্যাচারের শিকার এবং যাহারা শিকারী, সকলেই জন্যই ইহার ভিতরে লুকাইয়া রহিয়াছে গভীর সত্য। পতন সুনিশ্চিত—শুধু স্মরণে রাখিতে হইবে—তাহা যেন অগৌরবের না হয়। এই সত্য দর্শনের জন্য চক্ষুষ্মান হওয়া দরকার আমাদের সকলের।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন