ঘূর্ণিঝড় টাইফুন হাইয়ানের আঘাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে নামিয়া আসিয়াছে মৃত্যুভয়াল মানবিক বিপর্যয়। স্মরণাতীতকালের ভয়াবহতম এই ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হইয়া গিয়াছে মাইলের পর মাইল। ফিলিপাইনের মধ্যাঞ্চলীয় ৩৬টি প্রদেশের মানুষ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পর্যুদস্ত। যেইদিকে চোখ যায়, পথে ও প্রান্তরে লাশ আর লাশ। স্বজনহারা বিপন্ন নারী ও পুরুষের আহাজারিতে বাতাস ভারি হইয়া উঠিয়াছে। ধারণা করা হইতেছে কম করিয়া হইলেও প্রাণহানি ঘটিয়াছে দশ হাজার মানুষের। ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছেন ৪০ লক্ষাধিক মানুষ। ৩৭৯ কিলোমিটার বেগে বহিয়া যাওয়া টাইফুনের পাশাপাশি ১০ হইতে ৪৫ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের ফলে বিপর্যয়ের মাত্রা বাড়িয়া গিয়াছিল বহুগুণে। সেইসাথে ছিল অঝোর ধারায় বর্ষণ। ফিলিপাইনের এই দুর্যোগের সাথে তুলনা চলে কেবল ২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামির। ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট সেই বারের সুনামিতে ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশে নামিয়া আসিয়াছিল অভাবিতপূর্ব মানবিক বিপর্যয়। প্রসঙ্গত বলা আবশ্যক যে, টাইফুন ঝড়ের একটি প্রকার হাইয়ান। ফিলিপাইনের উপকূলীয় এই অঞ্চলটি এমনিতেই ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। প্রতিবত্সর গড়ে ২০টি টাইফুন এতদাঞ্চলে আঘাত হানিয়া থাকে। গত সেপ্টেম্বরে উসাগি নামের টাইফুন এইখানে আঘাত হানিয়া গিয়াছে। এই বত্সর কমপক্ষে ২৩ বার এইখানে ঝড় হানা দিয়াছে। আর এই হাইয়ানের আঘাতটি ২৪তম। মোটকথা ফিলিপাইনের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ঝড়-ঝঞ্ঝার সহিত লড়াই করিয়াই বাঁচেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হইতে কিভাবে বাঁচিয়া থাকিতে হয় তাহা তাহাদের অজানা নহে। কিন্তু টাইফুন হাইয়ানের আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, মানুষের অতীতের অভিজ্ঞতা তেমন কোনো কাজে আসে নাই। সংহারি ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কাড়িয়া নিয়াছে অসংখ্য জীবন। যাহারা বাঁচিয়া আছেন তাহারা নিপতিত হইয়াছেন চরম বিপন্ন দশায়। তাহাদের বসতবাড়ি ধসিয়া ভাসিয়া গিয়াছে। উদ্ধারকর্মীরা বিপদাপন্ন মানুষের ত্রাণকাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়াছেন। কিন্তু যতদূর জানা যায় উপদ্রুত অঞ্চলে এমন অনেক দুর্গম জনপদ রহিয়াছে যেখানে ত্রাণ পৌঁছানো সহজ নহে।
এইকালে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অনেক উন্নতি সাধিত হইয়াছে। আবহাওয়াবিদগণ ঝড়ের পূর্বাভাস দিতে পারেন সহজেই। কোথা হইতে উত্পন্ন হইয়া কোনদিকে কত বেগে ঝড় বহিয়া যাইতেছে, ঠিক কোথায় উহা আঘাত হানিতে পারে—তাহা আগেই বলিয়া দিতে বিজ্ঞান আজ আর অপারগ নহে। তাহা সত্ত্বেও শেষ বিচারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাককে মানুষ পুরোপুরি করায়ত্ত্ব করিতে পারে নাই। মানুষের জ্ঞান ও সক্ষমতাকে পশ্চাতে ফেলিয়া প্রকৃতি হানিয়া যায় করাল ছোবল। এইখানটায় মানুষ বড়বেশি অসহায়। অর্থে-বিত্তে, জ্ঞানে গরিমায় সুউচ্চ যেইসব দেশ বা জাতির শির, তাহারাও প্রকৃতির কাছে অসহায়। তাহার পরও মানুষ বাঁচে, বিরূপ প্রকৃতির সাথে যুঝিয়াই মানুষ অস্তিত্ব রক্ষা করিয়া চলিয়াছে। এইখানেই মানব জীবনের সার্থকতা।
অপ্রতিরোধ্য ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে ছিন্নভিন্ন ফিলিপাইনের বিপন্ন মানুষের বেদনা আমরাও উপলব্ধি করি গভীরভাবে। স্বজনহারা মানুষ, যাহারা বিয়োগ বেদনায় কাতর, আমরা অনুভব করি তাহাদের মর্মবেদনা। আমরাও, বাংলাদেশের মানুষ, বিরূপ প্রকৃতির আঘাতে বহুবার বিপর্যস্ত হইয়াছি। বছর কয়েক আগে প্রলয়ঙ্করী সিডরে এইখানে জীবনহানি ঘটিয়া গিয়াছে তিন সহস্রাধিক মানুষের। ফিলিপাইনের দুর্যোগকবলিত মানুষ এই বিপর্যয় দ্রুত কাটাইয়া উঠুন এই আমাদের আজকের প্রার্থনা।
