রা জ নী তি

প্রয়োজন দেশবাসীর বজ্রনিনাদ

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪৮
নির্বাচনকালীন সরকারের স্বরূপ কি হবে এবং তার নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে তা নিয়ে এখনো সমঝোতায় উপনীত হওয়া গেল না। সরকার তার প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনায় অটল। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, এসব বিষয়ে সমঝোতা না হলে সেরূপ নির্বাচনে সে অংশগ্রহণ করবে না। সে ধরনের ‘একতরফা’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত সে হতেও দিবে না। অন্যদিকে সরকার বলছে, কেউ আসুক আর না আসুক, তার ফর্মুলাতেই যথাসময়ে নির্বাচন হবে। দু’পক্ষই ‘নট নড়ন-চড়ন’। অতএব অচলাবস্থা। এই অচলাবস্থা আজ দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যেক চরম অনিশ্চয়তা ও বিপদের সম্মুখীন করেছে। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আর ৭৫ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। তা করতে না পারলে সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি হবে এবং অনিশ্চয়তা এক বিপজ্জনক অবস্থায় উপনীত হবে। বিতর্কের আপাত বিষয়টি হলো নির্বাচনকালীন সরকার। নির্বাচনকালে ‘সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী’ সরকার নাকি ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক’ সরকার থাকবে, তা নিয়ে দু’পক্ষের বিতর্ক। দু’পক্ষই নিজ অবস্থানে অনড়। এ নিয়ে অনবরত সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে। ডজন-ডজন মানুষের মৃত্যু ঘটছে। সংঘাত-সংঘর্ষের ফলে ইতোমধ্যে নাগরিক জীবনে যে দুর্যোগ চলছে, সমঝোতা না হলে তা আরো ঘনীভূত হবে। কিন্তু সেরূপ অশুভ পরিণতি এড়ানোর জন্য দেশের বড় দুটি বুর্জোয়া দলের কোনো আন্তরিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ এখনো নেই। গত ২৭ অক্টোবর থেকে জাতীয় নির্বাচন অভিমুখে কাউন্টডাউন বা দিন গণনা শুরু হয়ে গেছে। সংবিধানে ২৭ অক্টোবরের ৯০ দিনের মধ্যে, অর্থাত্ ২৪ জানুয়ারির আগে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতোমধ্যে তার ১৫ দিন পার হয়ে গেছে। এই ১৫ দিনের বিএনপি টানা ৬০ ঘণ্টা করে দুই দফায় হরতাল করছে। গতকাল থেকে আরেক দফা শুরু হয়েছে ৮৪ ঘণ্টার হরতাল। বস্তুত হরতাল শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগে থেকেই জামায়েতের প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী ক্যাডারদের সহায়তায় বোমাবাজি, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি সহিংস ঘটনা শুরু হওয়ায় চার দিন-চার দিন করে মোট আট দিন দেশে চরম অরাজক ও হিংসাত্মক সন্ত্রাসী পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করা ও দৈনন্দিন জনজীবনকে অসহনীয় অচলতায় নিক্ষেপ করার পাশাপাশি বাছাই করে করে মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনের সদস্য, সরকারি প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে, ফেরি, বাস-ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ইত্যাদিকে টার্গেট করে বোমা-আগুন নিক্ষেপ করা হচ্ছে। সকলেই বুঝতে স্বক্ষম যে, এসব ঘটনা মোটেই গণরোষের বহিঃপ্রকাশ নয়। এগুলো সবই ফরমায়সী ‘এ্যাকশন’। একটি ‘পরিস্থিতি’ সৃষ্টিই এসবের একমাত্র উদ্দেশ্য। বিশেষ ধরনের ‘রিপোর্টের’ একটি ফাইল প্রস্তুতের আয়োজন করার উদ্দেশ্যেই এসব কাজ। এই ‘রিপোর্ট’ বিদেশি শক্তিধর দেশগুলোকে তাদের পক্ষে আনার জন্য প্রয়োজন। সেজন্যই যাবতীয় ‘এ্যাকশন’। সরকার বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার শুরু করেছে। কিন্তু জামায়েত ও হেফাজতের মাঠ কাঁপানো, বর্তমানে বাইরে থাকা, নেতৃবৃন্দ ও ফিল্ড কমান্ডারকে একই কায়দায় গ্রেফতার করা হচ্ছে না। অথচ বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু ও বিপদ হলো তারাই। বিএনপি’র এই কর্মকৌশলের ষোল আনা সুযোগ নিচ্ছে জামায়েতে ইসলাম। তাদের সন্ত্রাসী ক্যাডারদের প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য মাঠে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এ্যাসল্ট, রিট্রিট, এ্যামবুশ, হিট এন্ড রান ইত্যাদি লড়াইয়ের ময়দানের কৌশল, বোমা-গ্রেনেড নির্মাণের কারিগরি জ্ঞান, সেইফ-হাউজ নেটওয়ার্ক, কমান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থাপনা, কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ইত্যাদি প্রস্তুতির ড্রেস রিহার্সেলের জন্য তারা বিএনপির ছত্রচ্ছায়ায় কাজ করে যাচ্ছে। একাত্তরে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাদের শীর্ষ নেতারা আজ দণ্ডপ্রাপ্ত বা বিচারের সম্মুখীন। তারা তা বরবাদ করতে মরিয়া। বিচার ও দণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া বিনষ্ট করার জন্য তারা যে কোনো মূল্যে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন্ন করতে চায়। সমঝোতার পথকে রুদ্ধ করতে তারা সবচেয়ে বেশি তত্পর। এটি সর্বজন স্বীকৃত যে, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বর্তমানে অনেক কমে গেছে। কতোটা কমেছে তা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও আগের মতো জনসমর্থন যে তার নেই, সেকথা তাদের নেতাকর্মীরাও অস্বীকার করে না। এই সরকারের ‘সুকর্ম’ দ্বারা মানুষের ৫ বছর আগের সমর্থনকে তারা সংরক্ষণ করতে পারেনি। বরঞ্চ ‘কুকর্মের’ পাহাড়ের কারণে অনেক মানুষ আওয়ামী লীগ থেকে তাদের মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া সাধারণ মানুষের কথা হলো ‘আমার ভোটে যদি সরকার না বদলালো, তাহলে কি ভাবে বুঝবো যে আমার সে ভোটের দাম আছে?’ গণতন্ত্র সম্পর্কে পিছিয়ে থাকা এ ধরনের সহজ-সরল বুঝের কারণেই আমাদের দেশে ‘এ্যান্টি-ইন্কাম্বেন্সির’ উপাদান অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বেশির ভাগ এমপিরা অবস্থাটা টের পাচ্ছে। তাদের অনেকেই জানেন যে, ওয়াক ওভারের ‘একতরফা’ নির্বাচন ছাড়া তাদের পুনঃনির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই সব দলের অংশগ্রহণে যাতে নির্বাচন না হয় এবং সেজন্য যেন সমঝোতা না হতে পারে, তেমন অবস্থা তৈরিতে তারা সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী। বিএনপি ও এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যে এবং তাছাড়া কথিত সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন মহলে একটি শক্তি আছে যারা মনে করে যে ওয়ান-ইলেভেনের মতো হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে আগানো যাবে না। এসব শক্তি রাজনৈতিক কাঠামোকে বিনষ্ট করে দেশকে বিরাজনীতিকরণের পথে নিয়ে যেতে চায়। সমঝোতা না হলে যেরূপ অচলাবস্থা ও সংঘাতের পরিস্থিতি চলতে থাকবে তা অগণতান্ত্রিক শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দিবে। তাই মুখে নানা কথা বললেও, তাদের একান্ত বাসনা ও চেষ্টা হলো সমঝোতা না হওয়ার দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়া। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এধরনের বিভিন্ন শক্তি নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা যেন না হতে পারে সেজন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু যে চিন্তা থেকেই এই পথ গ্রহণ করা হোক না কেন, তার শেষ পরিণতি হলো ‘গণতন্ত্রহীন’ ও ‘গণতান্ত্রিক অধিকারহীন’ এক কালো অধ্যায়। গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এদেশের শ্রমজীবী মানুষ ও তাদের রুটি-রুজির সংগ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, ছাত্র-যুব-নারী— তথা আপামর দেশবাসী। চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হবে গণতন্ত্র ও প্রগতির অগ্রযাত্রার সংগ্রাম। বাধাগ্রস্ত হবে সাম্রাজ্যবাদের লোলুপ থেকে জাতীয় স্বার্থরক্ষার লড়াই। শ্রমিক শ্রেণীকেই তাই সবচেয়ে আগুয়ান হয়ে অচলাবস্থার বিরুদ্ধে ও সমঝোতার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নের সাথে সকলের অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কর্তব্যটি, ও সে কারণেই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টি বর্তমানে অনেকটাই সমার্থক হয়ে পড়েছে। ‘সমঝোতা চাই, অচলাবস্থা ও সংঘাত চাই না’— এটি এখন মূর্তভাবে হয়ে উঠেছে গণতন্ত্রের পক্ষের সব শক্তির জন্য আবশ্যিক রণধ্বনি। সেই সাথে ‘সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ নির্মূল কর’— এই আওয়াজ এখন গণতন্ত্রকামীদের জন্য সবচেয়ে বড় কতর্ব্যে পরিণত হয়েছে। এই দুই কর্তব্যকে পৃথক বলে গণ্য করে একটির জন্য অন্যটিকে গৌণ জ্ঞান করা বা একটির বিরুদ্ধে সংগ্রামে জোর দিয়ে অন্যটির বিরুদ্ধে সংগ্রামকে স্থগিত রাখার অর্থ হবে অগণতান্ত্রিক-সাম্প্রদায়িক-ফ্যাসিবাদকে মদদ দেয়া। গণতান্ত্রিক শক্তির সামনে এই মুহূর্তের নির্দিষ্ট ও মূর্ত প্রধান রণধ্বনি যেখানে ‘সমঝোতা ও অসাম্প্রদায়িকতা’ সেক্ষেত্রে গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির সামনে এখন প্রধান রণনীতিগত শ্লোগান হলো ‘সমঝোতা ঠেকাও, অচলাবস্থা ও সংঘাত গভীরতর কর’ এবং ‘সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তিকে নিয়ে খেলা করো’। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এই দ্বিমুখী বিভাজন স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ, বিএনপি অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক শক্তি ইত্যাদি সবার মাঝেই ‘সমঝোতা’ ও ‘সংঘাত’ এই দুই পরস্পরবিরোধী প্রবণতা ও রাজনৈতিক তত্পরতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমঝোতা প্রয়োজন বটে, কিন্তু বর্তমান মুখোমুখি অচলাবস্থায় তা অর্জন করা কি সম্ভব? এ প্রশ্ন অনেকেরই। এ প্রসঙ্গে বেশ দৃঢ়তা নিয়েই বলা যায় যে, সদিচ্ছা থাকলে সমঝোতা খুবই সম্ভব! ক্ষমতায় আসার পর এরশাদ বলতেন যে তাকে কেউ ফেলতে পারবে না, কারণ তার বিরোধীরা কখনোই এক হতে পারবে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দূরত্ব হলো উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর ব্যবধানের মতো। কিন্তু সেরূপ জটিল অবস্থার মাঝেও সমঝোতার প্রক্রিয়ায় সেই উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুকে একসাথে রাজপথে নামানো গিয়েছিল, তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন সম্ভব হয়েছিল, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচারপতি শাহাবুদ্দীনের নাম এরশাদের অন্তর্বর্তীকালীন উত্তরাধিকার হিসাবে একমত হয়ে নির্ধারণ করে স্বৈরশাসনের অবসান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ ও ওয়ান-ইলেভেনের মতো ‘হস্তক্ষেপের’ আশংকাকে সাধারণ বিপদ হিসেবে বিবেচনা করে এখন তবে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সমঝোতা সম্ভব হবে না কেন? সমঝোতা খুবই সম্ভব, তবে সে জন্য সদিচ্ছা থাকাটা হলো প্রাথমিক শর্ত। দেশবাসী দেখছে যে সেই সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। ফলে তাদের ‘সংঘাত নয়, সমঝোতা চাই’—এর প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। এতে তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের ভূমিকাকে আরো সোচ্চার করার বদলে তারা নিজেদেরকে আরো গুটিয়ে নিচ্ছে। সদিচ্ছা না থাকলে তারও ‘দাওয়াই’ আছে। জনমত ও গণতত্পরতা দিয়েও অনেক সময় কাউকে যে একটি কাজ করতে বাধ্য করা যায়, ইতিহাস আমাদেরকে সে শিক্ষা দেয়। সদিচ্ছার অভাবের সমস্যা সমাধানের এটিই সম্ভাব্য পথ। কিন্তু জনগণকে উদ্বুদ্ধ, সংগঠিত ও সক্রিয় করার জন্য যে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োজন তার উপস্থিতি দুর্বল হওয়ায় এই ‘দাওয়াই’ যথেষ্ট শক্তিশালীভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী উভয়ই তাদের বক্তৃতায় হরহামেশাই সমঝোতা ও সংলাপের কথা বলছেন। কিন্তু যেটি এক্ষেত্রে লক্ষ্য করার বিষয় তা হলো, তারা উভয়ই বলছেন যে, “এই হলো ‘আমার’ প্রস্তাব— আসুন এই প্রস্তাব নিয়ে সংলাপ করি ও সমঝোতায় আসি”। তারা কি এভাবে কথাটি বলতে পারতেন না যে, “আমার একটি প্রস্তাব আছে, আপনারও একটি প্রস্তাব আছে, আরো দশটা দলের দশটা প্রস্তাব আছে— আসুন ‘সবগুলো’ প্রস্তাব নিয়ে সংলাপ করে সমঝোতায় আসি”। এভাবে বললে ও এ ধরনের মনোভাব নিয়ে চললে সমঝোতায় পৌঁছার কাজ সহজ হতো। এই প্রস্তাব থেকে কিছু উপাদান আর এই প্রস্তাব থেকে কিছু— এভাবে সব প্রস্তাব থেকে উপাদান নিয়ে একটি নতুন ও উন্নত সমাধান সূত্রও বের করা হয়তো সম্ভব হতো। আলোচনায় বসলে হয়তো সমাধানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতো। হয়তো তাতে সহজেই সকলের একমত হওয়া সম্ভব হতো। যেমন ধরা যাক— নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ও তার প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার এক্তিয়ার যদি সাংবিধানিকভাবে সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে দেয়া হয় তাহলে তার দ্বারা সরকারি ক্ষমতা খাটিয়ে ভোটকে প্রভাবিত করার সুযোগ হয়তো বন্ধ করে দেয়া সম্ভব। এটিকে শুধু আরপিও দিয়ে নির্বাচনকালে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হাতে অর্পণ করার বিষয় করে রাখলে হবে না, সেটিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকার ৯০ দিন সময়কালে মন্ত্রিসভা ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে একেবারে সীমিত করার বিষয় করতে হবে। হয়তো সমঝোতা সূত্র খুঁজে পাওয়ার জন্য আলোচনার প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত আরো অনেক ক্ষেত্র উদঘাটিত হতে পারে। সদিচ্ছা থাকলে সংলাপকে সমঝোতায় পৌঁছার উপায় হিসেবে নেতা-নেত্রীরা বিচেনা করতো। ‘গ্যালারী শো’ দ্বারা পাবলিকের কাছ থেকে পয়েন্ট অর্জনের মাধ্যম হিসেবে সংলাপকে ব্যবহারের চেষ্টা হতো না। দুই নেত্রীর ফোনালাপ বা ক্যামেরার সামনে মুখোমুখি বসার আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে পর্দার অন্তরালের আলাপ-আলোচনা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ হতে পারে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সেভাবেই সমঝোতাকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে। আমি নিজে সেসব কাজের একেবারে গভীরে ও খুঁটিনাটিতে জড়িত ছিলাম। সমঝোতাই যদি আন্তরিকভাবে কাম্য হয় তাহলে কে কাকে আগে ফোন করলো, বা কে কার ডাকে বৈঠক করতে গেল ইত্যাদি প্রটোকলের বিষয়গুলোকে প্রধান বিবেচ্য করে তোলা হবে কেন? সময় বয়ে যাচ্ছে। ‘সংঘাত নয়, সমঝোতা চাই’ আওয়াজ নিয়ে ব্যাপক জনগণের সোচ্চার কণ্ঠ ও ভূমিকাই এখন শেষ রক্ষার পথ রচনা করতে পারে। অন্যথায় সমূহ দুর্গতি আসন্ন। লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন