বাংলাদেশে বার্ধক্য পরিস্থিতি

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪৮
মানব জীবন পরিক্রমার সর্বশেষ, অবশ্যম্ভাবী ও স্বাভাবিক পর্যায় হচ্ছে বার্ধক্য। কারো যদি অকালমৃত্যু না হয় তবে প্রত্যেককেই এ জীবনের স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। বার্ধক্যের আঘাত সর্বজনীন। সমাজের অনেক সমস্যাই আছে যা পাশ কাটিয়ে বা এড়িয়ে চলা যায় সন্তর্পণে বা সুকৌশলে। কিন্তু জন্মের সাথে মৃত্যুর যেমন সম্পর্ক, বেঁচে থাকলে বার্ধক্যের সাথেও তেমন। জীবনে এর ব্যত্যয় ঘটানোর অবকাশ সৃষ্টিকর্তা রাখেননি। বিংশ শতাব্দীতে চিকিত্সা বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি, সচেতনতা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন মৃত্যুহারকে যেমন হ্রাস করেছে তেমনি মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। ফলে বিশ্ব সমাজে বয়স্কদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫০ সালে জাতিসংঘের দেয়া এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৬০ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সী জনসংখ্যার পরিমাণ তখন ছিল বিশ্বে ২০ কোটি, ১৯৭৫ সালে এ সংখ্যা ৩৫ কোটি এবং ২০০০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯ কোটি। ২০১০ সালে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৭০ কোটি এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হবে ১১০ কোটির ঊর্ধ্বে। অর্থাত্ ১৯৭৫ সালের তুলনায় এ বৃদ্ধির হার শতকরা ২২৮ ভাগ। অথচ এ সময়কালে বিশ্বে মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে শতকরা ১০২ ভাগ। প্রতি মাসে ১ মিলিয়ন (৬০ বছর বয়সী) প্রবীণ মোট প্রবীণ জনসংখ্যার সাথে যোগ হচ্ছে। বিশ্বে জনসংখ্যায় প্রবীণ জনসংখ্যার হার ২০০০ সালে ছিল ১০ শতাংশ এবং বর্তমানে প্রায় ১২.৫ শতাংশ। বিশ্বের প্রবীণ জনসংখ্যার এই হার বেড়ে ২০২৫ সালে ১৫.০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ২১.০ শতাংশে পরিণত হবে। জাতিসংঘের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০০০ সালে বিশ্বের প্রবীণদের শতকরা ৬২ জন বাস করছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। ২০২৫ সালে এদের হার উন্নীত হয়ে শতকরা ৭১ জন হবে। আর ২০৫০ সালে বিশ্বের প্রবীণদের প্রায় ৮০ শতাংশের বাস হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। এ সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে জাতিসংঘ বার্ধক্যকে মানবজীবনের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে এ সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর ০১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালন করে আসছে। ২০১১ সালের আদমশুমারীতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটিতে যা মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ। জাতিসংঘের সর্বশেষ বিশ্ব জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী দেশের প্রবীণদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০২৫ সালে হবে ১৭.৬২ মিলিয়ন (মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশ) এবং ২০৫০ সালে ৪৩.০২ মিলিয়ন যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হবে বলে মনে করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোন অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ হতে ১২ ভাগ প্রবীণ হলে ঐ জনসংখ্যাকে বার্ধক্য জনসংখ্যা ধরা হয়। সে হিসেবে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে বার্ধক্য জনসংখ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ও চিকিত্সা বিজ্ঞানের উন্নয়নের ঢেউ বাংলাদেশেও মানুষের গড় আয়ুষ্কালে এনেছে এক অভাবনীয় পরিবর্তন। ১৯২১ সালে যেখানে বাংলাদেশে গড় আয়ু ছিল মাত্র ২০.৯ বছর, ১৯৫০ সালে ৩৭ বছর, ১৯৯০ সালে ৫১.৮ বছর এবং বর্তমানে প্রায় ৬৯ বছর। প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১৯৫০-১৯৫৫ সালে ১.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০০০-২০০৫ সালে হয় ২.৯ শতাংশ যা ২০৪৫-২০৫০ সালে হবে ৩.১ শতাংশ যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২০০০-২০০৫ সালে ছিল ২.১ শতাংশ যা কমে ২০৪৫-২০৫০ সালে হবে ০.৭ শতাংশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শিশু বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। ফলে মোট সংখ্যা শিশু জনসংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে প্রবীণরাই জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হয়ে পড়বে। শুধু সংখ্যায় এরা দ্রুত বাড়ছে তাই নয়; এদের অধিকারগত প্রয়োজন মেটানোর মতো পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সমতা ক্রমেই গভীর সংকট এবং তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। বার্ধক্য বাংলাদেশের জন্যে এক ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বার্ধক্য সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি একেবারেই নগণ্য। একবিংশ শতাব্দীর প্রবীণদের জটিল সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের নিতে হবে বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি। দরিদ্র, দুঃস্থ ও অসহায় প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্যে ১৯৯৮ সালে বয়স্ক ভাতা চালু করা হয়। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ৩০০ টাকা করা হয়েছে আর ভাতা প্রাপ্তদের সংখ্যা ২২.৫০ লাখ। বিদ্যমান বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধি করে দরিদ্র প্রবীণদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করা। অতিসমপ্রতি সরকার বার্ধক্য সমস্যাটি অনুধাবন করে প্রবীণ পিতা-মাতার ভরণপোষণে সন্তান-সন্ততির আইনগত বাধ্যবাধকতা নির্ধারণে পিতা-মাতা ভরণপোষণ বিল-২০১৩ অনুমোদন করেছে যার কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার। প্রবীণ দারিদ্র্য-পীড়িত পরিবারসমূহে সহজ শর্তে/বিনা সুদে কৃষিঋণ/আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে ঋণ প্রদান ও রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা যাতে দরিদ্র পরিবারসমূহ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠে। এছাড়া কর্মক্ষম প্রবীণের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে দেশে চলমান ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ত করা। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও সেবাদানের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, দরিদ্র প্রবীণদের জন্য স্বল্পমূল্যে/বিনামূল্যে ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে ওষুধ প্রদান, চিকিত্সা উপকরণ সরবরাহ ও বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। প্রবীণ বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, তা দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা। প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয়ভাবে সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করার লক্ষ্যে তাদেরকে ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করা এবং তত্সহ গণপরিবহনে হ্রাসকৃত ভাড়ায় প্রবীণদের আসন সংরক্ষণ করা। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ই-মেইল[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন