আলোকপাত

আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৪৮
শিশুরা জাতির ভবিষ্যত্— একথা বলে শিশুদেরকে অপমান করা হয় নাকি বড়রা অপমানিত বোধ করেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদি তাদেরকে ভবিষ্যত্ ভাবা হয় তা হলে তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে কেন ছিনিমিনি খেলা? জেএসসি পরীক্ষার সময়সূচি জেনেও কেন হরতাল আহ্বান করা হলো? কেন তাদের পরীক্ষা পিছিয়ে গেল? শিশুদেরকেই বলি, ক্ষমা করে দিও আমার সন্তানেরা, আমরা অভিভাবক হিসেবে বড়ই অবিবেচক আর তোমরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছো। যদি পারো গড়ে ওঠো আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে। এই নিষ্ঠুর ও দায়িত্ব-জ্ঞানহীন অভিভাবকদের প্রতি বিতৃষ্ণ হও না বরং তাদের অসদাচরণকে প্রাণে ধারণ করে ক্ষয়ক্ষতির মূল্য বুঝতে চেষ্টা করবে এবং ভবিষ্যতে তোমরা এই আচরণের প্রভাব ফেলতে দেবে না কোমলমতি কোন শিশুর উপর। উল্টোপথেই না হয় শিক্ষাটা গ্রহণ করলে প্রিয় সন্তানেরা! তোমরা যে শাস্তি পাচ্ছো সেটা যেন আর কেউ না পায়। এবার বলি বড়দের কথা। বড়র তো কোন শেষ নেই। একজন ডাক্তারের কাছে গেলেও তিনি এত বড় বনে যান যে রোগীর যাবতীয় অসুখের কথা শোনার ধৈর্যটাও হারিয়ে ফেলেন। উকিলের কাছে গেলে তো কথাই নেই যেন বিচারকের চেয়েও বড়। এমনভাবেই সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বড়রা জেঁকে বসে আছেন। সাধারণ নাগরিক বড়দের চাপে বড় বিপদগ্রস্ত। দেশে সবচেয়ে বড় যে দুজন ব্যক্তি তারা হলেন, একজন জননেত্রী আর অন্যজন দেশনেত্রী। জননেত্রীর পক্ষে যেমন জনসমর্থন আছে, দেশনেত্রীর পক্ষেও তেমনি আছে। একজন জোটের নেতা, একজন মহাজোটের। সুতরাং মূল অর্থে দুজন একই প্রকৃতির তবে ধারাটা হয়তো ভিন্ন। জননেত্রী যদি জনগণের ভালবাসা দিয়ে হয়, জনগণ সকলেই দেশের অন্তর্ভুক্ত। আবার দেশনেত্রী যদি দেশের ভালোবাসা দিয়ে হয়, দেশ অবশ্যই জনগণের। আমরা তাদের কাউকে কোনভাবেই ছোট করে দেখতে পারি না। দুজনই দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকেছেন আবার বিরোধীদলেও থেকেছেন। তাদের সকল প্রকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমার মনে হয় এই অভিজ্ঞতার ব্যাপারটা তারা খুব ভালোভাবেই জানেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে কতবার কতটুকু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং কী কী ভাবে হয়েছে তা-ও অজানা নেই। হরতালে দেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হয় সে হিসেব দুজনের কাছ থেকেই পেয়েছি। এই ৮৪ ঘণ্টা হরতালের আগে যে ৬০ ঘণ্টার হরতাল হলো দুবার তাতে কতগুলো প্রাণহানি ঘটেছে, কতগুলো গাড়ি পুড়েছে, কত লোক আহত হয়েছে, কত ভাঙচুর হয়েছে তা কারোই অজানা নেই। জননেত্রীর আহ্বানে দেশনেত্রী সাড়া দিলে হয়তো এই ক্ষতিগুলো হতো না। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম তারা দুজন যে ফোনালাপ করেছেন তা নিয়ে তুমুল হইচই পড়ে গেল। বিদেশে এটাকে পুতুল নাচের সাথে তুলনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করলো। ভাবা দরকার, আমরা কি কারো নাচের পুতুল? এত বড় দুজন নেত্রী, এত বড় দুটি দল, এত বড় জোট-মহাজোট অথচ তাদের উদারতায় ঘাটতি রয়েছে কেন বুঝতে পারি না। একই দেশের নাগরিক আমরা পরস্পরের প্রতি কেন সহনশীল হতে পারি না? একটিমাত্র দেশের কথা ভেবে কেন একত্রিত হতে পারি না? শুধু ক্ষমতায় যাওয়া আর টিকে থাকাই তো বড় নয়। দেশের স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থ বা জোট-মহাজোটের স্বার্থ পরিত্যাগ করা অবশ্যই উঁচু মনের পরিচয় বহন করবে। এখনও সেটা হতে পারে। দেশনেত্রী ফোন করে বলতে পারেন জননেত্রীকে, ‘আপনি তো আমাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন একসংগে খাবেন বলে। আমি হরতাল শেষে যেকোন দিন যাব বলেছিলাম কিন্তু আপনি তো আর ডাকলেন না। তাহলে কি ধরে নেব আপনি সর্বদলীয়তেই বহাল আছেন?’ আবার জননেত্রীও পুনরায় ফোন করে বলতে পারেন দেশনেত্রীকে, আমার অনুরোধ সত্ত্বেও আপনি হরতাল প্রত্যাখ্যান করলেন না। বলেছিলেন হরতালের পর আসবেন কিন্তু কবে কখন আসতে পারবেন জানালেন না। তা হলে কি ধরে নেব আপনারা আলোচনায় বসতে রাজি নন?’ এভাবে, কোন না কোনভাবে যে-কেউই উদারতার পরিচয় দিতে পারেন নিজ থেকে ফোন করে। অথচ আমরা এই সম্ভবনা থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়েছি, যে কারণে আবারও হরতাল চলছে। আমরা তো মনে করি সর্বদলীয় না হয় নির্দলীয় হোক, নির্দলীয় না হয় একদলীয় সরকারব্যবস্থা হোক নির্বাচন সময়কালীন। তবু সহিংসতা, হানাহানি, ধ্বংসযজ্ঞ, প্রাণহানির মতো ঘটনা যাতে আর না ঘটে। আমার কাছে কেবলই মনে হয় আমাদের স্বাধীনতা গৌরবে রাখার ব্যাপারে আমরা কোনই ভূমিকা রাখতে পারিনি। এখনো একের পর এক ক্ষতি মেনে নিয়ে চলতে হচ্ছে। এ ব্যর্থতা আমাদের, স্বীকার করতেই হবে। সুতরাং দু’নেত্রীর কাছে আমাদের নিবেদন, আপনারা জনগণের নামে রাজনীতি করেন এবং বলেন জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। বিশ্বাস করুন, হরতাল ডেকে আপনারা ঘরে বসে থেকে দেখুন জনগণ আপনাদের ডাকে আদৌ সাড়া দেয় কি না। শুধু ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ আর প্রাণের ভয়ে জনগণ আপনাদের কথা শোনে। তাই, সত্যিই যদি আপনারা আমাদের কথা ভেবে থাকেন, আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যা নিষ্পত্তি করুন। লেখক:কবি ও শিশুসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন