হরতালে হরতালে নাকাল হচ্ছে মানুষ। উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা ও আশংকায় পেরেশান মা-বাবা, নারী-পুরুষ, শ্রমিক, অভিভাবক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও শিশু। প্রতিনিয়ত আশংকায় পথ হারিয়ে ফেলবে না তো বাংলাদেশ? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির হঠকারিতা, অরাজনৈতিক পদক্ষেপ ও অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগের নীতি বাংলাদেশের জন্য কোন বিপর্যয় ডেকে আনবে না তো? মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির সহিংসতা, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র জয়ী হয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করবে না তো? নানা মহলে নানা প্রশ্ন!
আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ এখন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখন প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি অর্থনৈতিক খাত, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ১৭.৯১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাক শিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ত্রিশ লক্ষের অধিক মহিলা শ্রমিক তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত রয়েছেন যা একদিকে মেয়েদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে নারী ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ ২০১২ সালে ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে বিশ্বব্যাংক গত বছরের ২০ নভেম্বর তাদের এক ভাষ্যে আশা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন দেশীয় চাহিদার ৯৭ শতাংশ মেটানোর পরও বিশ্বের ৮৩টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে যার মধ্যে রয়েছে এ্যামেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো। ২০১২-১৩ অর্থবছের বাংলাদেশের সফটওয়্যার রপ্তানি ১০০ মিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। চামড়াশিল্প, সিরামিকস, গ্লাস, সিমেন্টসহ নানা শিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া আউট সোর্সিংয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকে ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটাররা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে বিশ্ব জয় করার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভারত, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা কর্মকর্তাদের সুনামের কারণে জাতিসংঘও বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।
অর্থনৈতিকভাবে এত এত সম্ভাবনাময়, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দৃপ্তপদে এগিয়ে চলা, তরুণ ক্রিকেটার ও সেনা কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক সুনামে প্রশংসিত, শ্রমিক—কৃষক—ব্যবসায়ী—উদ্যোক্তা ও মেধাবী উচ্চ শিক্ষার্থীদের কর্মচঞ্চলতায় মুখরিত এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ আজ হরতালে হরতালে জেরবার। বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু কী করে সেই স্থিতিশীলতা আমরা নিশ্চিত করব? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী জাতীয় সংসদের নির্বাচন হবে। সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী তার পূর্ববর্তী অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন করার প্রস্তাব দেন। এতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রণালয় বা প্রধান বিরোধী দলকে তাদের পছন্দমত মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের কয়েকদিন পর বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাব দেন। ২৫ অক্টোবরের সমাবেশ থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ২৬ অক্টোবরের মধ্যে সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান, নইলে ২৭ অক্টোবর থেকে ৬০ ঘণ্টার একটানা হরতালের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীকে ফোন করেন, তাদের মধ্যে ৩৭ মিনিট কথা হলেও হরতাল প্রত্যাহার হয়নি, পরবর্তীতে প্রধান দুই দলের মধ্যে কোন সমঝোতাও হয়নি। ৬০ ঘণ্টার হরতালে ১৫টি প্রাণ ঝরে গেছে, অসংখ্য মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছে। ৪ নভেম্বর থেকে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ডাকে আবারও ৬০ ঘণ্টার হরতাল হয়ে গেছে। এখন আমরা আছি ৮৪ ঘণ্টার আরেক দফা হরতালের বিপদসংকুল উপত্যকার মধ্যে; আমরা কেউ জানি না, বোমা বিস্ফোরণে কখন কার হাত বা পা উড়ে যাবে, কখন বাবার সামনে ছেলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাবে, কখন হরতাল সমর্থনকারী মহিলা কর্মীরা চলন্ত রিকশা উল্টে দেবে, আর রিকশা থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থর থর করে কাঁপতে থাকবেন অশীতিপর এক বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধা। গত বছরের শেষদিক থেকে মুক্তিযু্দ্ধ বিরোধী জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর আক্রমণসহ নানারকম তাণ্ডব, সন্ত্রাস, হত্যা, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে বাংলাদেশকে একটা মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছে।
শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর, সকল দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রাখা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং বিরোধীদল বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের মধ্যে যে মতভিন্নতা ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং সেই অবস্থানজাত সহিংসতা ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, মারপিট ও হানাহানি, তার পেছনে রয়েছে আরেক যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সদিচ্ছায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন জামায়াত, আল-বদর ও আল-শামস নেতাদের ৭১-এর মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করেছে, তখন জামায়াতে ইসলামী, ছাত্র শিবির ও তাদের দেশি-বিদেশি মিত্ররা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার নিয়ে মাঠে নেমেছে এ বিচারকে বানচাল করার জন্য। এব্যাপারে জামায়াত কম-বেশি সমর্থন পাচ্ছে বিএনপি ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে এবং ওই সমর্থনের জোরেই এখনও জামায়াত তাদের তাণ্ডব চালিয়ে যেতে পারছে, নইলে পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোর যে জামায়াত-শিবির বিরোধী অব্যাহত অভিযান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জনগণের যে নিরংকুশ সমর্থন এবং মুক্তিযুদ্ধের হন্তারক বাহিনীর সমর্থকদের প্রতি মানুষের যে ঘৃণা তাতে করে জামায়াত-শিবির এতদিন টিকে থাকতে পারত না। সেজন্য দৃশ্যপটের উপরিভাগে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের যে দৃশ্যমান আন্দোলন, তার পেছনে রয়েছে গোলাম আযম, নিজামী ও কাদের মোল্লাদের বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। আর এ কারণেই বাংলাদেশে রক্তগঙ্গা বয়ে গেলেও জামায়াত-শিবির তাতে পিছপা হবে না। কিন্তু বিএনপির মত উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মধ্য ডানপন্থী একটি দল ও তার নেত্রী কেন জামায়াতের মত জঙ্গী, সহিংস ও ফ্যাসিস্ট সংগঠনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছেন এবং তার দল কেন বার বার জামায়াতের ফাঁদে পা দিচ্ছে, তা প্রতিনিয়ত নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তাহলে কি বিএনপির কাছে নির্বাচন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ৭১—এর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রক্ষা করা?
কার্যকর ও ফলপ্রসূ গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলের কোন বিকল্প নেই। সেজন্য আমার একান্ত চাওয়া বিএনপি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে থাকুক (অথবা তারা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থন পায়, তাহলে সরকার গঠন করুক)। তবে সরকারি দল বা বিরোধী দল যে অবস্থানেই থাকুক বিএনপিকে অতি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়তে হবে। আমরা চাইব না, নির্বাচনে জিতে বিএনপি আবার তাদের গাড়িতে পতাকা তুলে দিক, যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বেই বিশ্বাস করে না। আর বঙ্গবন্ধু কন্যার জন্য শুভ কামনা, কেননা তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেই মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া শেষে অনেকগুলো মামলার রায় আমরা পেয়ে গেছি। দৃশ্যমান দৃশ্যপটের উপরিভাগে নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে যে পাল্টাপাল্টি হচ্ছে তার পেছনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ শক্তির যে সংগ্রাম চলছে, সেই যুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয় হবে বলে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করছি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক,আইন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]
