সংলাপের মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব নহে

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১১
বিরোধ নিষ্পত্তির যতো স্বীকৃত পন্থা বা উপায় রহিয়াছে তন্মধ্যে সংলাপ বা আলাপ-আলোচনাকেই সর্বোত্তম বলিয়া বিবেচনা করা হয়। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ হইতে শুরু করিয়া গৃহবিবাদ পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই ইহা প্রযোজ্য। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন হইতে এই ধারা চলিয়া আসিতেছে। এমনকী রাজায় রাজায় যুদ্ধ কিংবা মহাযুদ্ধের ঘনঘটার মধ্যেও সংলাপের ফল্গুধারা প্রবহমান ছিল। দুইদুইটি বিশ্বযুদ্ধের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবিকে শুধু অপরিহার্যই করিয়া তোলে নাই, তাহাকে আরও বেগবানও করিয়াছে। জাতিসংঘ নামক সংস্থাটিও এই বাস্তবতারই ফসল। ইহার কারণও সহজেই বোধগম্য। সংলাপের বিকল্প হইল সংঘাত। কিন্তু সংঘাতের পরিণতি যে কাহারো জন্যই সুখকর হয় না— মানবেতিহাসের পাতায় পাতায় যেমন তাহার অজস্র দৃষ্টান্ত লিপিবদ্ধ হইয়া আছে, তেমনি প্রতিনিয়ত ঘটিয়া যাওয়া রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়া আধুনিক মানুষ স্বচক্ষেও তাহা প্রত্যক্ষ করিয়া চলিয়াছে। তাই সংঘাত পরিহার এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের উপায় হিসাবে সংলাপের দাবি এখন সার্বজনীন। কিন্তু সংলাপকে ঘিরিয়া অতিরিক্ত আবেগ কিংবা আশাবাদের আতিশয্যে ইতিহাসের অলঙ্ঘ্য কিছু কিছু সত্য যে চাপা পড়িয়া গিয়াছে— তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। উপেক্ষিত অথচ গুরুত্বপূর্ণ সেই সত্যটি হইল, অতীতেও সংলাপের মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব হয় নাই। হওয়া সম্ভবও নহে। যদি সম্ভবই হইত তাহা হইলে বিশ্বব্যাপী এতো যুদ্ধ, এতো রক্তপাতের প্রয়োজন পড়িত না। ইহার বাস্তব উদাহরণ আমাদের চোখের সম্মুখেই রহিয়াছে। দশকের পর দশক ধরিয়া ফিলিস্তিন-ইসরাইল বিরোধ চলিয়া আসিতেছে। সেই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বহু সংলাপ হইয়াছে। বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের ঝানু ঝানু কূটনীতিকরা এখনও দৌড়ঝাঁপ চালাইয়া যাইতেছেন। কিন্তু বিরোধ কি মিটিয়াছে? টানা যায় দুই পরাশক্তির মধ্যে দীর্ঘকাল যাবত্ চলমান ঠান্ডাযুদ্ধের প্রসঙ্গও। শেষাবধি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যে তাহার নিষ্পত্তি হয় নাই— তাহা সর্বজনবিদিত। কেন হয় নাই— সেই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই নিহিত রহিয়াছে আসল সত্যটি। হয় নাই এই কারণে যে, তাহা ছিল দুইটি পরস্পরবিরোধী আদর্শের বিরোধ। অনুরূপ দৃষ্টান্ত আরও আছে। এই বাস্তবতাটি উপলব্ধি করিতে হইবে যে, সংলাপ বিরোধের ক্ষেত্র অনেকটা কমাইয়া আনিতে পারে, কিন্তু আদর্শগত দ্বন্দ্ব নিরসন করিতে পারে না। নীতি বা আদর্শের বিষয়টিকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। সংলাপের সাফল্য নির্ভর করে আপস বা সমঝোতার ওপর। কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে কোনো আপস চলে না। কারণ নীতি বা আদর্শের মধ্য দিয়াই ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্রের আসল পরিচয়টি ফুটিয়া ওঠে। সেই আদর্শই যদি বিসর্জন দিতে হয় তাহা হইলে আর কিছুই তো থাকে না। আত্মপরিচয়হীন বা মেরুদণ্ডহীন হইয়া বাঁচার মধ্যে কোনো গৌরব নাই। সেই জন্যই দেশে দেশে যুগে যুগে অগণিত মানুষ নিজ নিজ আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রশ্নে হাসিমুখে জীবন উত্সর্গ করিয়াছে। এখনও করিতেছে। অতএব, প্রশ্ন যেইখানে আদর্শের— সেইখানে সংলাপ বা আপসের অবকাশ কোথায়?