এমন ‘শান্তিপূর্ণ’ ও ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ হরতাল থেকে মুক্তি চাই

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৩৬
আট শতক থেকে বাংলার মানুষ তাদের চিন্তা ও আচরণে লালন করেছে গণতান্ত্রিক বোধ। সেই থেকে ইতিহাসের সোপান বেয়ে এদেশবাসী অগ্রসর হয়েছে আধুনিক সময়ের দিকে। তখনো তাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ার সুযোগ হয়নি। পুঁথিগত বিদ্যা থেকে রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ইত্যাকার শব্দের সাথে পরিচয় ছিল না। ইতিহাস চর্চার উপায় ছিল না। তাই প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস থেকে এথেন্সের গণতন্ত্র সম্পর্কেও কোনো ধারণা পায়নি। আর আব্রাহাম লিঙ্কনদের জন্মও তো হয়নি তখনো। ফলে আধুনিক গণতন্ত্র তাদের তো অচেনা থাকবেই। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে গণতান্ত্রিক বোধ ও অধিকার বোধ বাংলার মানুষ লালন করে আসছে। ফলে অর্বাচীন রাজনীতিকরা বালখিল্যসুলভ আচরণে যখন তাদের প্রযোজিত অদ্ভুত গণতন্ত্রের কথা বলেন তখন মানুষ অসহায় বোধ করে। শান্তিপূর্ণ অথচ জনমতের প্রতিফলনের শক্তি ধারণ করা হরতাল যখন সহিংসতার দিকে যাচ্ছিল তখন হরতালের প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধীই সরে এসেছিলেন হরতাল কর্মসূচি থেকে। পাকিস্তান আমলের আন্দোলনের অগ্নিযুগে হরতাল আহবানে জনমতের প্রতিফলন ছিল বলে রাজনীতিকদের কাজ ছিল শুধু হরতাল ডাকা। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সকল কর্মযজ্ঞ স্থবির করে দিয়ে হরতালে সাফল্য এনে দিত। হরতাল সফল করার জন্য সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ঢোকাতে হতো না। হরতালের আগের দিন থেকে তাণ্ডব চালাতে হতো না। গাড়ি ঘোড়া ভাংচুর করতে আর আগুন লাগাতে হতো না। পুড়িয়ে মারতে হতো না শ্রমজীবী মানুষ আর অসহায় যাত্রীকে। ককটেল আর বোমায় আহত নিহত হতো না শিশু। স্বাধীনতা উত্তর কাল থেকে বিশেষ করে নব্বইয়ের পর থেকে সকল সবল বিরোধী দলীয় রাজনীতিকরা হরতাল অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। দিনে দিনে তা অনেক বেশি উন্মত্ত হচ্ছে। সরকারকে চাপে ফেলতে দেশের মানুষ এবং গোটা দেশটাকেই জিম্মি করে ফেলছেন। মানুষের জীবন বিপন্ন করে, সংহার করে, দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেঙ্গে ফেলে রাজনৈতিক লাভ পেতে সন্ত্রাসীর ভূমিকায় নামছেন আমাদের রাজনীতিকরা। যারা দমে দমে জনগণের নাম ব্যবহার করে জনগণের সাথেই প্রতারণা করেন। তাই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এদেশের বিপন্ন মানুষ এখন এই ভয়ঙ্কর হরতাল থেকে মুক্তি চায়। এই লেখাটি যখন মুসাবিদা করছিলাম তখন ৮৪ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিন চলছিল। আমার দৃষ্টি সীমানায় টিভিতে কোনো এক চ্যানেলে খবর চলছিল। দেখাচ্ছিল তাণ্ডব। ছাত্রদল আর শিবিরের মিছিল থেকে একের পর এক ককটেল ফুটানো হচ্ছিল। ভাংচুর করছিল যাত্রীবাহী বাস, লেগুনা, সিএনজি অটোরিক্সা। পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানো হচ্ছিল। বিশ্বরোডে আগুনে পুড়ে একটি দোতলাবাস কঙ্কালের মত দাঁড়িয়ে আছে। মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে দগ্ধ মানুষগুলো। দেশের নানা জায়গায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ। সাংবাদিকের সামনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর দিনমজুর তাদের অসহায়ত্বের কথা বলছেন। সংসার কিভাবে নির্বাহ করবেন সেই হতাশার কথা জানাচ্ছেন। পিকেটারদের ধাওয়ায় চট্টগ্রামে উল্টে যাওয়া অটোরিক্সার যাত্রী নিহত হয়েছে। হাসপাতালে তার স্বজনদের আহাজারি আমাদের হূদয়কে আর্দ্র করে তুলছে। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন দেশের অর্থনীতি কী মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। এ সময়ে জনগণের রক্ষক সরকার এবং সরকার প্রধান হরতালের নামে বিরোধী দলের অনাচারের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছেন। কোনো রাজনৈতিক সমাধানে না গিয়ে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি দিয়ে ‘আন্দোলন’ দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বারুদ আর আগুনের পথ মাড়িয়ে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আনন্দঘন পরিবেশে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন বিক্রির উত্সবের আয়োজন করছে। টিভির পর্দায় সংবাদে বৈচিত্র্য আসছে। মনে পড়লো ৭২ ঘণ্টা হরতাল ডাকার আগের সন্ধ্যার কথা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব যথারীতি সুললিত কণ্ঠে বলছিলেন তাদের এই হরতাল হবে ‘শান্তিপূর্ণ’। কোনো অশান্তি হয়ে থাকলে তার দায় নিতে হবে সরকারকে। অথচ দেশবাসী জানেন মির্জা সাহেবদের এই ঘোষণার সাথে সাথে ছাত্রদল, যুবদল, ছাত্র শিবির মাঠে নেমে গেছে। নেমে গেছে তাদের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা। ককটেল ফুটাচ্ছে, সাধারণ মানুষের নিরপরাধ গাড়ি ভাঙছে। আগুন জ্বালাচ্ছে। হয়তো দু’একজন মানুষ অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। বোমার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে। এই কঠিন বাস্তবতার দুঃসহ স্মৃতিতে হয়তো একটু হারিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাত্ সম্বিত্ ফিরে পেয়ে দৃষ্টি চলে এলো আবার টিভির পর্দায়। এবার ক্যামেরার সামনে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী। ইতোমধ্যে গ্রেফতার ও গ্রেফতার আতঙ্কে পলাতক হওয়ায় সংবাদ সম্মেলনে কথা বলায় বিএনপি নেতাদের সংকট রয়েছে। বিএনপি অফিস একলাই আগলে রেখে জনাব রিজভীই আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন। বাইরে যাই ঘটুক ভেতরে তিনি মোটামুটি ভালই আছেন। লালচে রঙ্গের একটি পাটভাঙ্গা পাঞ্জাবী পরে ক্যামেরার সামনে কথা বলছেন। তাঁর বক্তব্যে রয়েছে সরকারের দমন নীতির কথা। ‘শান্তিপূর্ণ’ হরতাল ব্যাহত করার অপচেষ্টার কথা। একই সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণের পথে নেমে আসা ধরনের শব্দাঘাত পেতে থাকলো বিপন্ন মানুষ। এই দায়িত্বশীল নেতার অফিসে তাঁর দৃষ্টিসীমার ভেতর কোনো টেলিভিশন অন করা ছিল কিনা বুঝতে পারলাম না। না হলে জনগণের কষ্ট তাঁকে ছুঁয়ে গেল না কেন। একটিবারও তিনি বোমাবাজি, ককটেল ফাটানো, গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করা, আগুনে দগ্ধ হওয়া সাধারণ মানুষ—এসব কোনো প্রসঙ্গেই এলেন না কেন। না হয় একবার বলতেন সবই দর্শকের দৃষ্টিভ্রম। মিডিয়ার এক ধরনের কারসাজি। এসব সরকারের ষড়যন্ত্র। সরকার পক্ষ সকল অপকর্ম করে তাদের শান্তিপূর্ণ হরতালকে বিতর্কিত করছে। তাদের এবং জোটবন্ধুদের কর্মী বাহিনী সুবোধ বালকের মত ঘরে বসে আছে। এরপরও একটি দায়িত্ব নিশ্চয়ই রিজভী সাহেবদের ছিল। কারণ তাঁদের ডাকা হরতালের কারণেই জনগণ ও দেশের সম্পদহানি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ আহত নিহত হচ্ছে। এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করা শোভন ও মানবিক হতো। চাই কি পাশাপাশি সরকারকে কষে আরো পাঁচটা গালিও দেয়া যেতো। অথচ তেমন কিছুই হলো না। আমার বন্ধু ফরিদ আহমদ একটি বড় পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তার কাছে জানলাম ভয়ঙ্কর আশংকার কথা। দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তির বড় ভিত্তি এই পোশাক শিল্প। দেশের প্রায় ৪৪ লক্ষ পরিবারের কর্মসংস্থান করছে এই শিল্প। এদের আশি ভাগই মহিলা শ্রমিক। দেশ উন্নয়নের বড় হাতিয়ার এই কর্মজীবীরা। এই টানা হরতালে এখন বিপর্যয়ের মুখে পোশাক শিল্প খাত। বিদেশি বায়াররা আসতে পারছেন না। তথ্য মিডিয়ার যুগে অরাজকতার খবর চলে যাচ্ছে বিশ্বময়। ইতোমধ্যে অনেক অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। এই ফাঁকে পাকিস্তান জেএসপি সুবিধা পেতে যাচ্ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির রথ বেয়ে ভারত এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের দেশের এই অব্যাহত অরাজকতার কারণে বিদেশি বায়াররা গাড়ির নিশানা ঘুরিয়ে দিচ্ছেন প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে। কিন্তু দুঃখ হচ্ছে ক্ষমতার রাজনীতির চোরাগলিতে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের অক্লান্ত রাজনীতিকরা দেশের মানুষের স্বার্থ আর দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে মোটেই ভাবতে চাইছেন না। সোনার হরিণ মসনদের দিকেই তাদের দৃষ্টি। হরতাল ডাকিয়েরা দয়া করে হরতালের আওতামুক্ত রাখেন এম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, ফায়ার সার্ভিস, গার্মেন্টস সামগ্রীর মত রপ্তানি পণ্য, সংবাদপত্র ও সংবাদ কর্মীদের গাড়ি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। আক্রান্ত হচ্ছে এম্বুলেন্স, রেহাই পায়নি লাশবাহী গাড়ী, জ্বলছে সংবাদকর্মীদের গাড়ি, বোমার আঘাতে আহত সংবাদকর্মী ছটফট করছেন হাসপাতালে। রপ্তানি পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যানে জ্বলছে আগুন। এসবের ব্যাপারে কোনো শব্দ উচ্চারণ করছেন না হরতাল ডাকিয়েরা। অথচ তিক্ত অভিজ্ঞ মানুষ জানে এই সব রাজনীতিকরা হরতাল শেষে সাংবাদিকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ হরতাল পালন করার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানাবেন। আজ দেশবাসীকে আমাদের রাজনীতিকরা এতটাই ভয়ঙ্কর জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন যে মানুষ এখন মুক্তির পথ খুঁজতে ঘর্মাক্ত হচ্ছে। আমাদের রাজনীতিকরা হরতালকে আরো বেশি সহিংস করার নতুন নতুন কৌশল আবিষ্কার ও প্রয়োগ করছেন প্রতিদিন। আবার দেশবাসীকে হতাশ ও বিস্মিত করে বারবার গণমাধ্যমে নিরলসভাবে বলে যাচ্ছেন তাদের ‘শান্তিপূর্ণ’ হরতালের কথা। ক্ষুদ্র বৃহত্ ব্যবসায়ীদের স্বাভাবিক পেশা জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে, বোমা আর আগুনের মুখে জীবন বিপন্ন করে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং ভীতিকর পরিবেশ চাপিয়ে দিয়ে লাগাতার হরতাল উদযাপন করছেন বিএনপি আর আঠারো দলের নেতানেত্রীরা। আবার হরতাল অস্ত্রের মুখে দেশবাসীকে শেকলবন্দি করে নির্দ্বিধায় মিডিয়ার সামনে এই জনগণকেই ধন্যবাদ জানাচ্ছেন ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ভাবে হরতাল পালনের জন্য। ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ আর এমন প্রতারণার শব্দ শুনতে চায় না। এমন চাপিয়ে দেয়া ভয়ঙ্কর হরতাল থেকে মুক্তি পেতে চায়। আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিকরা যদি বিশ্বাস করেন শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছেই ফিরতে হয় তবে ক্ষমতার মোহে অন্ধ না থেকে বাস্তবতার উঠোনে নেমে আসতে হবে তাদের। আজ না হোক কাল নির্বাচন তো হবেই। এখন সেই দিন নেই যে জনগণের কাছে না এসে নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দেয়া যাবে। আঘাতে অপমানে ক্ষত বিক্ষত মানুষ কি হরতাল ডাকিয়েদের উপহার দেয়া দুঃসহ যাতনার কথা ভুলে যাবে! মনে রাখতে হবে এই যাতনায় বিক্ষত মানুষের মিছিলে বিএনপি জামায়াত মনোভাবাপন্ন মানুষেরও অবস্থান রয়েছে। এমন মানবতা বিধ্বংসী হরতালে তারাও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এদের সাথেও দলীয় দূরত্ব বেড়েছে। একের পর এক হরতালের অস্ত্র ব্যবহার করতে গিয়ে বিএনপি তার জনপ্রিয়তায় অনেকটা সংকট তৈরি করেছে। তাই বাস্তবতার আলোকে বিএনপি নেতৃত্বকেই ভাবতে হবে তাঁরা এসব হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসবেন কিনা। মানুষ এখন সর্বান্তকরণে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চায়। লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন