অবশেষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ অচলাবস্থার সাময়িক অবসান ঘটিয়াছে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা গত শুক্রবার আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়াছেন। তবে আন্দোলনের সহিত সংশ্লিষ্ট সাধারণ শিক্ষক ফোরামের পক্ষ হইতে ইহাও স্পষ্টভাবে জানাইয়া দেওয়া হইয়াছে যে রাষ্ট্রপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়া আন্দোলন প্রত্যাহার করা হইয়াছে। তাহাদের বাধিয়া দেওয়া সময়সীমার মধ্যে রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হইলে তাহারা আবারও সোচ্চার হইবেন। ইতিমধ্যে সেই আলামতও স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। অতএব, সংকট যে কাটিয়া গিয়াছে তাহা বলা যাইবে না। সরকারের তরফ হইতে সমাধানের চেষ্টা আগেও হইয়াছে। কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। বস্তুত বর্তমান উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার পর হইতেই শিক্ষকদের একাংশ তাহার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালাইয়া আসিতেছেন। আন্দোলনের অংশ হিসাবে অব্যাহতভাবে ক্লাসবর্জনসহ দফায় দফায় ধর্মঘট, ঘেরাও, বিক্ষোভ হইয়াছে। অবরুদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে উপাচার্যকে। একপর্যায়ে তাহা হাতাহাতি, থানা-পুলিশ ও আদালত পর্যন্ত গড়াইয়াছে। বিপন্ন শিক্ষার্থীরা তাহাদের শিক্ষাজীবন রক্ষার্থে শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের নিকট অনেক আকুতিমিনতি জানাইয়াছেন। একপর্যায়ে বাধ্য হইয়াছেন রাস্তায় নামিতে। কিন্তু কোনো পক্ষের মধ্যে কোনো প্রকার নমনীয়তা ও সমঝোতার মনোভাব পরিলক্ষিত হয় নাই। আর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদের চরম এই অসহিষ্ণুতার খেসারত দিতে হইয়াছে ছাত্রছাত্রীদের। তাহাদের শিক্ষাজীবন হইতে ঝরিয়া গিয়াছে মূল্যবান কয়েকটি মাস— যাহা সহজে পূরণ হইবার নহে।
রোগ সারাইতে হইলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রোগের প্রকৃত কারণটি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। তাহা না করিয়া জোড়াতালি দিয়া সমস্যা সমাধানের চেষ্টা স্থায়ীভাবে কোনো সুফল বহিয়া আনিবে বলিয়া মনে হয় না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবত্ যেই অচলাবস্থা চলিয়া আসিয়াছে তাহাকে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিবার অবকাশ নাই। ইতোপূর্বে স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ঘটনা ঘটিয়াছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতাও খুব একটা ভিন্ন নহে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে দিনের পর দিন আন্দোলন হইয়াছে। অচল হইয়া পড়িয়াছে শিক্ষা কার্যক্রম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখাই যাহাদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য সেই শিক্ষকদেরই সেইখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিতে দেখা গিয়াছে। শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধই যে এই ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করিয়াছে তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। ভুক্তভোগীদের অনেকেই বলিয়াছেন যে ইহা চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি মাত্র। রাজনীতিকীকরণের পরিণাম যে কোনো ক্ষেত্রেই শুভ হয় না তাহা নূতন কথা নহে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ইহার ব্যতিক্রম ঘটিবার কোনো কারণ নাই। প্রসঙ্গত লক্ষণীয় যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্যের পদকে কেন্দ্র করিয়া ক্ষমতার যে তিক্ত লড়াই প্রত্যক্ষ করা যাইতেছে তাহা শুধু ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রচলিত ছকের মধ্যে আবদ্ধ নাই। অনেক ক্ষেত্রে তাহা অন্তর্দলীয় কোন্দলের চাইতেও জটিল রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। সেই জটিলতার চরিত্রটি অনুধাবন করিতে হইলে নীতিনির্ধারকদের সর্বাগ্রে নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হইতে হইবে। পরিহার করিতে হইবে উগ্রপন্থার নিকট আত্মসমর্পণ তথা নিজেদের আদর্শ ও বিশ্বাসের সীমা অতিক্রমের আত্মঘাতী প্রবণতা। সর্বক্ষেত্রে নীতি ও আদর্শ বিসর্জনের এবং জোরপূর্বক সিদ্ধান্ত চাপাইয়া দেওয়ার যেই অশুভ প্রতিযোগিতা চলিতেছে তাহা অব্যাহত থাকিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিদ্যমান অচলাবস্থা নিরসনের সকল উদ্যোগ-আয়োজনই বিফলে যাইতে বাধ্য।
