স্মরণ

স্মরণের জানালায় হুমায়ূন আহমেদ

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৫৩
কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় গুণ তিনি অনায়াসে লিখতে পারতেন। যে কোনো বিষয় নিয়ে, যে কোনো পরিবেশে, যে কোনো সময় তিনি লিখতে পারতেন এবং সেসব লেখা মানুষকে আলোড়িত করতো। তাদের মন ছুঁয়ে যেত। তার লেখা নিয়ে আলোচনা শুধু নয়, দিনের পর দিন মিটিং, মিছিল সমাবেশ পর্যন্ত হতো। জীবদ্দশাতেই এরকম কিংবদন্তীতুল্য খ্যাতির অধিকারী হওয়াটা যে কোনো লেখকের জন্য এক পরম পাওয়া। তবে এখানেই শেষ নয়। তার লেখা নিয়ে এখনো, তার মৃত্যুর পরও তার পাঠক মহলে যথারীতি আলোচনা, সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। বাস্তব জীবন কাহিনী নয়, তিনি লিখতেন গল্প। কিন্তু সেই গল্প তিনি এমন দরদ দিয়ে লিখতেন যে, মানুষ তা পাঠ করে অভিভূত হয়। তাকে বাস্তব জীবনের আলেখ্য মনে করে। টিভি দর্শকদের জন্য লেখা তার ধারাবাহিক নাটকের চরিত্রের পরিণতি কি হবে সে নিয়েও মানুষ উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা দেখিয়েছে। তার সৃষ্ট বাকের ভাই চরিত্র নিয়ে ঢাকার রাজপথে মিছিল হয়েছে। তার হিমু চরিত্রকে অনুকরণ করে বহু মানুষ। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি যে শুধু বিপুলসংখ্যক পাঠক তৈরি করতে পেরেছিলেন, তা কিন্তু নয়; তিনি এসব মানুষের সঙ্গে তার চিন্তা-চেতনার সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। লিখন শৈলী কতটা মর্মস্পর্শী, আর কতটা হূদয়গ্রাহী হলে পরে মানুষ এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। শব্দ ও বাক্যের পরতে পরতে তিনি এতটাই আবেগ আর মমতা ছড়িয়ে গেছেন যে, তার চরিত্রকে মানুষ জীবনের বিকল্প মনে করে এবং তাকে ভুলতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। টিভি নাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও তিনি ছিলেন বিস্ময়কর সাফল্যের অধিকারী। তার পৈতৃক বাড়ি আমাদের নেত্রকোনার কেন্দুয়াতে। এই শেষোক্ত কারণেও তার কাজের প্রতি আমার যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। আজ ১৩ নভেম্বর হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে তাকে নিয়ে এই সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের পাশাপাশি সবার সঙ্গে শেয়ার করার মতো একটি ছোট্ট স্মৃতি আছে আমার। সেটাই এখানে বলতে চাচ্ছি। আমার একথা শুনে তিনি পুনরায় শান্ত ও সহজ হন। আমাকে তার লেখা বই অটোগ্রাফসহ উপহার দেন এবং বলেন যে, ও কিছু না। প্রাথমিক ক্ষুব্ধ আচরণের জন্য কিছুটা অনুতাপের সুরে তিনি বলেন, এটা তুমি মনে রেখো না। এটা পার্ট অব লাইফ। লেখক এবং মানুষ হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আমার আগ্রহ এভাবে আরো তীব্র হয়। কিন্তু আমার জন্য আরো বড় চমক অপেক্ষা করছিল। এর মাত্র মাস দু’য়েক পরই তিনি শাওনকে বিয়ে করেন। খবরটা দেশের সকল গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হতেও সময় লাগেনি। এই কাহিনীর উপসংহারে যে কথাটা বলা জরুরি সেটা হলো, সকল ক্ষমতা ও শিক্ষা-দীক্ষা এবং অর্জন ও সফলতার পরও মানুষ আসলে মানুষই থেকে যায়। তার ভালো কাজ থেকে যেমন তেমনি তার ভুল-ত্রুটি থেকেও অনেক কিছু শেখা যায়। হুমায়ূন আহমেদের ভালো দিক, মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়া, তার হূদয়ে জায়গা করে নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আমাদের মতো, সাধারণ মানুষের পক্ষে তার মতো এরকম বিশাল আয়তনের শক্তির অধিকারী হওয়া কতটা সম্ভব সে নিয়ে তর্ক হতে পারে; তবে যা নিশ্চিতভাবে সম্ভব সেটি হলো, ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও আমরা যদি সকল আন্তরিকতা দিয়ে চেষ্টা করি তাহলে ভালো কাজের মাধ্যমে কোনো না কোনো মানুষের মন জয় করতেই পারি। হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করে এই শিক্ষাটাই আমরা নিতে পারি। সেক্ষেত্রে আমাদের কাজের পরিসরটা ছোট হতে পারে কিন্তু তার পরিণতিটা হবে বড়। কেননা সকল বড় কাজের নেপথ্যে থাকে অনেক ছোট ছোট চেষ্টা ও অর্জনের যোগফল।  লেখক : প্রযুক্তি সম্পাদক ও প্রধান, প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগ, ব্রি, গাজীপুর ১৭০১ ই-মেইল: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন