শচিন টেন্ডুলকার আগামীকাল বৃহস্পতিবার মুম্বাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও নিজের ২০০তম টেস্ট খেলার মধ্যদিয়ে আবেগঘন বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। ২৪ বছরের রেকর্ড ভাঙ্গা গড়ার এই ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানবেন তিনি টেস্টটি খেলে। টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রান করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ১০০ সেঞ্চুরির মালিক টেন্ডুলকারের এ ম্যাচ দেখতে তার সাবেক সতীর্থরা, এক সময়ের প্রতিপক্ষ ক্রিকেটারদের কেউ কেউ এবং সর্বোপরি তার মাও উপস্থিত থাকবেন ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় এই তারকা তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারটি উদযাপনের জন্য গত সোমবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কথা বলেন। নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ৪০ বছর বয়সেও খেলতে পারার নেপথ্যে যে কারণগুলো সেসব বিষয়ের উপর আলোকপাত করেন টেন্ডুলকার।
সাবেক ভারতীয় অধিনায়ক শচিন মুম্বাইয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি প্রতিটি পর্যায়ই ছিল ভিন্ন ধর্মী, প্রতিটি টুর্নামেন্টের জন্য আলাদা প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। প্রস্তুতি ছাড়া সব কিছু এমনভাবে করা সম্ভব ছিল না।’
নিজের ১৬ বছর বয়সে ১৯৮৯ সালে করাচিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক হওয়ার পর শত-কোটির বেশি ভারতীয়দের কাছে দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন টেন্ডুলকার। ২০১১ সালের বিশ্বকাপে দেশকে শিরোপা এনে দেয়া এবং দলকে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ স্থানে পৌঁছে দিতে অনন্য অবদান রাখেন তিনি।
এ পর্যন্ত খেলা ১৯৯ টেস্টে ১৫,৮৪৭ রান তোলা টেন্ডুলকারকে তার প্রতিপক্ষরাও ব্যাটিং কিংবদন্তি স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের পরই স্থান দিয়ে থাকেন। ২০০১ সালে মৃত্যুর আগে সর্বশেষ সাক্ষাত্কারে অস্ট্রেলিয়ার ব্র্যাডম্যান বলেছিলেন, বর্তমান সময়ে একমাত্র টেন্ডুলকারই ব্যাটিং স্টাইলই প্রায় তার সমকক্ষ।
ব্র্যাডম্যান ১৯৯৬ সালে দেয়া ওই সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘তার নিবিড়তা, স্ট্রোক, তার টেকনিক সবই যেন আমার মতই।’
আধুনিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে টেন্ডুলকারের সমসাময়িক কয়েকজন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে একজন ব্রায়ান লারাও ভারতীয় এ ব্যাটসম্যানের বিদায়ী ম্যাচ দেখতে ছুটে এসেছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক এই ব্যাটিং তারকা বলেন, ‘যখনই আমি ক্রিকেট নিয়ে কথা বলি, সেসময় টেন্ডুলকারের কথা বলি। আপনারা বক্সিংয়ের ক্ষেত্রে যেমন মোহাম্মদ আলী এবং বাস্কেটবলে মাইকেল জর্ডানের কথা বলেন ঠিক একইভাবে ক্রিকেটে শচীনের কথা বলি আমি।’ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল গত সপ্তাহ থেকেই শচিনের উল্লে¬খযোগ্য মুহূর্তগুলো প্রচার করছে। ভারত জুড়ে যখন তাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি চলছে, সেসময়ে দেশটির বিভিন্ন শহরের মোড়ে মোড়ে টানানো হয়েছে শচিনের বিলবোর্ড, স্থাপন করা হয়েছে তার মুর্যাল। টিকেটে ছাপা হয়েছে তার ছবি। সব কিছু জুড়েই যেন টেন্ডুলকার।
শচিনের নিজ শহরের বাসিন্দা এবং ‘শচিন সুপারফ্যান’ দাবি করা যোতিন যোশি বলেন, ‘মূলত আমার কাছে সব কিছু মানেই শচিন কারণ আমার জীবন জুড়েই ক্রিকেট।’ বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘আমরা যেমনটা বলি- ক্রিকেট আমার ধর্ম এবং শচিন আমার ঈশ্বর। সুতরাং সব কিছুই আবর্তিত হয় শচিনকে ঘিরে।’ এমনকি বর্তমানে ভারত সফরে থাকা ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লসও শচিন উন্মাদনায় পড়েছেন। শচিনের বিদায়ী টেস্ট সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তিনি একজন মাস্টার। আমি তার খুবই সুখকর অবসর কামনা করি।’ শচিনের বৃদ্ধা মা রজনী প্রথমবারের মত স্টেডিয়ামে আসবেন ছেলের খেলা সরাসরি দেখার জন্য। আয়োজকরা এ জন্য ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে তার বিশেষ হুইল চেয়ারটি তোলার জন্য ‘র্যাম্প’ এর ব্যবস্থা করেছে। তার উপস্থিতি ছেলের অমঙ্গল হতে পারে ভেবে কুসংস্কারে বিশ্বাসী রজনী কোন দিন ছেলের খেলা দেখতে মাঠে যাননি।
এতসব রেকর্ড ভাঙ্গাভাঙ্গির মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে শচীনের ফর্মটা যে ভাল যাচ্ছে না সেটা নজর এড়ায়নি। টেস্টে তার যে ৫১টি সেঞ্চুরি আছে তার সর্বশেষটি এসেছে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। ভারতের সাবেক সফল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী এ প্রসঙ্গে বলেন ‘লিটল মাস্টার’ যে এরপরও দলে জায়গা বজায় রেখেছেন সেটা তিনি টেন্ডুলকার বলেই। টেন্ডুলকারের ক্যারিয়ারের একটা বড় সময়জুড়ে তার অধিনায়ক থাকা গাঙ্গুলীর মতে তার সাবেক দল সঙ্গীর অসাধারণত্ব নিয়ে কোন সংশয় নেই।
