গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে সহিংসতা কিংবা সংঘাত কাম্য নয়। সংবিধান মোতাবেক দেশের নির্বাচনের সময় যতই এগিয়ে আসছে রাজনৈতিক সংকট ও সহিংসতা ততোই ঘনীভূত হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও সংলাপের ইতিবাচক একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর একগুঁয়েমির ফলে সেটি পরিপক্কতা পায়নি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক টেলিফোনে বিরোধী দলের নেতাকে সংলাপের লক্ষ্যে যে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তা শর্ত সাপেক্ষে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় সেই প্রচেষ্টা একধাপ পিছিয়ে যায়। সংলাপে অংশগ্রহণ না করে হরতালের রাজনীতির জের ধরে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়াও বিএনপির প্রথম সারির আরো কিছু নেতার বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বাসা ও বিএনপি কার্যালয়ের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিএনপির অনেক নেতা গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপন করেছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, বরং ক্রমেই তা সংঘাত-সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জনমনে আশঙ্কা বাড়ছে, তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের অনমনীয় মনোভাবে একদিকে সর্বদলীয় সরকার ও অন্যদিকে নির্দলীয় সরকারের দাবি। আর এই দাবি নিয়েই বিরোধী দল সংলাপের পথ পরিহার করে একের পর এক হরতাল কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। দুই দফা ৬০ ঘণ্টার হরতালের পর এবার শুরু হয়েছে ৮৪ ঘণ্টার হরতাল। এসব হরতালে যেমন বাড়ছে সহিংসতা ও সংঘাত তেমনি দেশের সাধারণ মানুষের জনজীবনও বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিটি হরতালেই মানুষ মৃত্যুর ঘটনা খুব স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। হরতালের আগের দিন সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের যে ঘটনাগুলো ঘটে তাতে মানুষের জনজীবন এমনভাবে বিপর্যস্ত হয় যা এক কথায় অবর্ণনীয়। হরতালের ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সেবাখাত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষা নিয়ে শুরু হয়েছে অনিশ্চয়তা। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো হারিয়ে ফেলছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্মান শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষাগুলো স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সেশনজটের কবলে পড়তে হচ্ছে। ফলে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। কিন্তু কেন এই অনিশ্চয়তা?
এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপে বসার কয়েকদফা আহ্বান থাকা সত্ত্বেও সেটি সফল হয়নি। এতে দুই দলেরই দায় আছে বলে রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা মনে করছেন। বিএনপি সংলাপের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে হরতালের পথ বেছে নিয়ে সংঘাত সৃষ্টিতে তত্পর হয়েছে, অন্যদিকে সরকার হার্ড-লাইনে অবস্থান নিয়ে ধর-পাকড়ের নীতি অবলম্বন করছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে দুই ধরনের কার্যকলাপই প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে বিগত দিনের রাজনীতি বিশ্লেষণ করে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বিরোধী দলগুলো সবসময়ই সংকটের সমাধান রাজপথে করতে চায়। কিন্তু সমাধানের এ পথটি গণতন্ত্রে বাস্তবসম্মত নয়। গণতন্ত্রে সহনশীলতা, সমঝোতা এবং সংলাপের কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে। উন্নত দেশগুলোর গণতন্ত্রে সহিংসতা পরিহার করে সংলাপ এবং সমঝোতার পথকেই বেছে নেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর অতিবাহিত হলেও প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের রাজনীতিই এ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে সহনশীলতা পরিহার করে প্রতিহিংসার পথই বেছে নেয় যা জনগণের কাছে মোটেও কাম্য নয়। প্রতিহিংসা কেবলই প্রতিহিংসারই জন্ম দিতে থাকে।
সরকারি দল বর্তমান সংবিধান মোতাবেক ক্রমেই নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ১০ নভেম্বর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়েছে। এর পরেই গঠিত হবে সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকার। এবং যেকোনো সময়ই ঘোষিত হবে নির্বাচনী তফসিল। কিন্তু এখন পর্যন্তও বিরোধী দল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে না এসে রাজপথেই রয়ে গেছে। নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে অংশগ্রহণের জন্য ইতিমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকবার বিরোধী দলকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তারা সরাসরি এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে দেশে হরতালের নামে সহিংসতা, নাশকতা এবং মানুষ পুড়িয়ে মারার এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। কিন্তু কেন এমন কর্মসূচি?
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে আলোচনার দরজা খোলা আছে। যেকোনো সময় আলোচনা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বেশির ভাগ জনসভায় একই বক্তব্য দিচ্ছেন যে, আলোচনার জন্য সরকার প্রস্তুত। কিন্তু আলোচনা না হওয়ার কারণ কী? এর উত্তর খুবই স্পষ্ট যে, উভয় জোটের অনড় অবস্থান। শর্ত দিয়ে সংলাপ হয় না। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্টত নির্দলীয় সরকারের শর্তে আলোচনার পরিবেশ চায়। কিন্তু নির্দলীয় সরকারের দাবি সরকার মেনে নিলেই কি সেটি সহজে বাস্তবায়ন সম্ভব? বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাতে সহজে একজন ব্যক্তিকে সকল দল কর্তৃক গ্রহণযোগ্য নির্দলীয় হিসেবে মেনে নেবে না।
একটি বিষয় খুবই সুস্পষ্ট যে, সংবিধান মোতাবেক যথাসময়ে নির্বাচন করা না গেলে দেশে এক চরম সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। আলোচনার উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও সরকার ও বিরোধী দল আলোচনায় বসার ব্যাপারে একমত হতে পারেনি। ইতিমধ্যেই ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিআইয়ের পক্ষ থেকে সমঝোতার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কার্যত সেটিও ভেস্তে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের শরিকরা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর বিএনপি ও ১৮ দলের শরিকরা নির্বাচন বর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই সরকারি দলের মন্ত্রীরা পদত্যাগপত্রও জমা দিতে শুরু করেছেন। আর বিরোধী দল ক্রমেই সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে। গত ৭ নভেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশের আটজন কূটনীতিক বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাথে দেখা করে নির্বাচন বর্জন না করার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার পক্ষেই মতামত ও যুক্তি উপস্থাপন করেছেন বলে গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও গত ৯ নভেম্বর শনিবার বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মাঝে গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে সংঘাতমূলক রাজনৈতিক প্রবণতা অব্যাহত থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য। যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মাঝে গঠনমূলক সংলাপের পরিবর্তে আমাদের অব্যাহতভাবে সংঘাতমূলক কার্যক্রম দেখতে হচ্ছে। এটি আমাকে হতাশ করেছে। কারণ, বাংলাদেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ মনে করে, দুই দল সংলাপের মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হবে।’
প্রকৃতপক্ষে দেশের কোনো মানুষই চায় না বাংলাদেশের আসন্ন সংসদ নির্বাচন প্রস্তুতি এমন সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাক। জনগণ চায় সংলাপের মাধ্যমে সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান। সংলাপের মাধ্যমে একটি সমঝোতায় উভয় দল পৌঁছালে তা দেশের মানুষের জন্য মঙ্গলকর হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত অনড় অবস্থানই দেশের রাজনীতিতে অনিশ্চিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ জানে না এর শেষ কোথায়। বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ দেখে একথা বলা যায় যে, শেষ পর্যন্ত সংলাপ হয়ত হবে না। রাজনীতির মাঠে সৃষ্টি হতে পারে নতুন নাটকীয়তা।
এ কথা পরিষ্কার যে, দেশ একটি ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। কারণ বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রতিরোধের মুখেও বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এমনটা ধরে নিয়েই সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য কমিশন সচিবালয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির একতরফা নির্বাচনে মাঠ পর্যায়ে কী ঘটেছিল, সেসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কীভাবে করা যায়, সে লক্ষ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে কমিশন সূত্রে জানা যায় যে, তারা এখনও আশাবাদী যে, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে কমিশন তাদের আহ্বান জানাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বেশিরভাগ দল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বর্জন করেছিল। তত্কালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, ফ্রিডম পার্টিসহ কয়েকটি দল নিয়ে নির্বাচন করেছিল। তবে সেই সরকার মাত্র দেড় মাস স্থায়ী ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন পাস করে বিএনপিকে আবার নির্বাচন দিতে হয়েছিল। দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে টানাপোড়েনের শুরু হয়েছে ঠিক এর উল্টো কিন্তু একই ধরনের টানাপোড়েন ছিল বিগত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে। যদিও সেবারের নির্বাচন হয়েছিল সম্পূর্ণভাবে একতরফা কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট একটু আলাদা। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলও ভিন্ন। কাজেই এ নির্বাচনে বিরোধী জোট অংশগ্রহণ না করলেও সম্পূর্ণভাবে একতরফা নির্বাচন হবে না। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী স্বল্পমেয়াদি যে সরকার সৃষ্টি হয়েছিল এবার সেরকম পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক কম। সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের মাধ্যমে এবার যারা ক্ষমতায় আসবে তাদেরকে অতি সহজে ক্ষমতা থেকে নামানো যাবে না বলেই মনে হয়।
এছাড়া আজ যারা নির্দলীয় সরকারের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছে আগামীতে ক্ষমতায় এলে তারা কি নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবে নাকি বিদ্যমান কোনো এক ধরনের সম্ভাব্য সমঝোতাকেই বহাল রাখবে? ক্ষমতার রাজনীতি, শর্তের রাজনীতি, সহিংসতার রাজনীতি এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি বরাবরের মতোই এখনও দেশে বিদ্যমান রয়েছে। রাজনীতিবিদরা নিজস্ব দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদকে প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে না তুলে ক্ষমতায় টিকে থাকার কিংবা ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখেন। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজনৈতিক সংকট, সংঘাত এবং অচলাবস্থা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। দেশের জনগণ সংঘাত দেখতে চায় না। সব দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক এবং গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকুক এটাই সকলের কাম্য। এক্ষেত্রে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অযথা ধর-পাকড়ের নীতি যেমন সরকারকে পরিহার করা উচিত, ঠিক তেমনি বিরোধী দলেরও উচিত হরতালের মতো সহিংস কর্মসূচি পরিহার করে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার লক্ষ্যে সংলাপের পথ বেছে নিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]
