স্বাধীনতার পর থেকে আজঅবধি কতগুলো হরতাল হলো এ দেশে ? সংখ্যাটি সঠিকভাবে এ মুহূর্তে বলা দুষ্কর। তবে গত সপ্তাহে একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকায় প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হরতাল নিয়ে করা এক গবেষণা তথ্যানুযায়ী ৪১২ দিন, এ সপ্তাহের ৪ দিন যোগ করলে তা দাঁড়ায় ৪১৬ দিন। এ হরতালের পরিসংখ্যান জাতীয়ভাবে পালিত হরতালের। স্থানীয়ভাবে হরতালের পরিসংখ্যান যোগ করলে তা হয় ১৭০০ দিন। গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর থেকে হরতালের যে নতুন ধারার সংস্কৃতি চালু হয় অর্থাত্ হরতালের আগের দিন, দুপুরের পর থেকে হরতালকে সার্থক করার কাজটি সম্পন্ন করে হরতাল আহবানকারী দল। ভয়-ভীতি ও আতংক সৃষ্টির উন্মত্ততায় ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও’র মধ্যদিয়ে শুরু হয় হরতালের আমেজ আরো ১২ ঘন্টা আগে থেকে। সেই হিসেব কষতে গেলে তাল-গোল পাকিয়ে যাবে হরতালের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করতে। কত পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয় একটি হরতালে? সেটি নির্ণয়ে শুধু পোশাক, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের অংকই দাঁড়ায় ১০৫০ কোটি টাকা। বাকি সব খাত যুক্ত হলে দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। টাকার অংকে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা যাবে না কিন্তু বিপুল পরিমাণ ক্ষতি করছে কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন- হরতালে কর্মবিমুখতায় নষ্ট হয় কর্মঘন্টা, উত্পাদন ক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ হ্রাস পায়, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ইত্যাদি। দুঃসহ পরিস্থিতির ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ সংখ্যাতত্ত্বে স্থান না পেলেও যা অপরিমিত দায়ভার তৈরি করে তেমন অনেক ঘটনাও রয়েছে। যেমন- এবারের হরতালে যে ২১ লাখ পরিবারে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার্থী রয়েছে তাদের অবর্ণনীয় হতাশা ও আতংক এবং আগামী ২১ নভেম্বর থেকে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা সে সকল ৩০ লাখ পরীক্ষার্থী পরিবারের অজানা আশংকা। তেমনি যাদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রায় চলে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পেমেন্ট তারা যখন নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লাইট ধরার জন্য ৩ দিন আগে এয়ারপোর্টে যেয়ে মানবেতর দিন কাটায় সে দীর্ঘশ্বাস পরিমাপের নয়। শুধু কি তাই ? হরতালে এমন কিছু ক্ষতি হয় যা পৃথিবীর কোন পাল্লা-পাথরেই মাপা যাবে না। ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটের বিছানায় কান পেতে অসহ্য মরণ যন্ত্রণার চিত্কার বুকে নিলে, সে বুক কষ্টে যত ভারি হয়ে ওঠে, সে ভার বইতে পারে এমন কোন দাড়িপাল্লা বিশ্বে আছে কি ? আদরের পুত্রকে সঙ্গ দিতে, বেড়াতে বের হয়ে নিজের চোখের সামনে পুত্রকে গাড়ির ভিতরে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হতে দেখলেন যে বাবা, তার বুকের ভেতরে কষ্টের যে আর্তনাদ আর হাহাকার গুমরে মরে সেটা পরিমাপের মত বিজ্ঞান পৃথিবীতে আদৌ কি তৈরি হবে? আমাদের দেশে এ যাবত্ যত হরতাল পালিত হয়েছে তার ৯৫ থেকে ৯৮ ভাগই হয়েছে রাজনৈতিক অভিলাষে। বাকি অংশটুকু হয় অর্থনৈতিক না হয় জনস্বার্থে। সেখানেও ছিল রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা। সরকার যখন জনগণকে উপেক্ষা করবে, নীতি নির্ধারণীতে জনস্বার্থকে বিবেচনায় আনবে না তখন জনগণ প্রতিবাদ জানাবেই। প্রতিবাদের অধিকারেই আসে হরতাল। এদেশে অনেক হরতাল তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকাও রেখেছে। স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা সংগ্রাম ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনগণের সম্পৃক্ততায় অনুষ্ঠিত হরতালগুলোর ভূমিকাও ছিল অসাধারণ। কিন্তু তার প্রেক্ষাপট ও প্রেক্ষিত ছিল ভিন্ন। সে হরতালে মানবতা লুণ্ঠিত হয়নি। সাধারণকে নিষ্পেশন ও নিগ্রহের স্বীকার হতে হয়নি। অপমৃত্যু বরণ করতে হয়নি। ১৯৯৬ সাল থেকে যতগুলো হরতাল আজ পর্যন্ত হয়েছে তার সবটাই বর্তমান বিরোধী দল ও সরকারি দল দ্বারা সংগঠিত এবং তা দ্বৈত দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার অন্ধ অহম ও ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে। জনগণের কোন দুর্ভোগ লাঘব করার জন্য যেমন- নিরাপদ সড়কের দাবিতে, ধর্ষকের বিচারের দাবিতে, নির্মম হত্যার প্রতিবাদে, দুর্নীতি দমনে, সন্ত্রাস রোধে কোন দলই কি হরতাল ডেকেছে বা কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পেরেছে ? এ ধরনের ঘটনায় কতটুকু সোচ্চার সরকার বিরোধী দল ও দু’য়ের মাঝে আমরা সাধারণ জনগণের দল? হরতালের সংস্কৃতিতে যে হিংস্রতার কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে ইতিমধ্যে সে ফোকরে সারা বাংলার পুরো শরীর জুড়ে আক্রান্ত হয়েছে মরণব্যাধি। এ থেকে নিস্তারের পথ ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে পড়ছে। নেতা যাবে নেতা আসবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় যে মাধ্যম সেই তৈরি পোশাক রপ্তানির বিরাট অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোর বাজার হাতছাড়া হতে যাচ্ছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এ সুযোগ হাতছাড়া করছে না ভারত। সঠিক পলিসি নির্ধারণের অভাবে আর হরতালের ঘোরপ্যাঁচে ৩০/৪০ ভাগ উত্পাদন কম হওয়ার কারণে যে বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ তা কি আর সহজে ফেরত আসবে ? অর্থনীতির চাকা ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে তার মধ্যে হরতাল যে বিপর্যস্ততা বাড়াচ্ছে এ খাতে, কোন এক কাক ডাকা ভোরে যদি দেখি বিদেশি ব্যাংক এসে সারা বাংলায় শাখা পরিচালনা করে, দক্ষভাবে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে, আর আমাদের দেশীয় ব্যাংকগুলোর ঝাঁপি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তা হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এভাবে গার্মেন্টস, বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য ব্যবসায়িক খাত সবই যদি হারিয়ে যায় আমাদের আর কোন উপায় থাকবে কি? হরতাল ও দ্বৈত দ্বন্দ্ব আমাদের সেদিকেই ঠেলছে, সাথে হয়তো যুক্ত হচ্ছে অশনি কোন হাত। আসুন তাই আর দেরি না করে ভালো মানুষে ঠাসাঠাসি, প্রচুর সম্ভাবনাময় এই দেশটাকে অন্ধকার থেকে তুলে আনি আলোর রাজ্যে। বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দলের হাতেই আমাদের ১৬ কোটি জনতার ভাগ্য নির্ধারিত। এ মুহূর্তে অন্য কোন উপায়ান্তর আমাদের হবেও না। সেই কারণে সরকার ও বিরোধী দলের দ্বৈত মিলনের আকুতি জানিয়ে নিষ্পেষিত জনগণ ও সুশীল সমাজ সম্মিলিতভাবে একটি হরতাল আহবান করি ও সমর্থন করি। যে হরতাল ধ্বংসযজ্ঞের নয়। বরং শান্তি স্থাপনের। যেখানে আমাদের স্লোগান এবং সংগ্রাম হবে সরকারি ও বিরোধী দলের দ্বৈত মিলন। আর এর মধ্যে নিহিত আমাদের সুষ্ঠু জীবনধারায় ফিরে আসা। না হয় সারাবাংলা পরিণত হবে একটি সমৃদ্ধ নরকঙ্কাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে।
লেখক : ব্যাংকার
[email protected]
