অস্তরাগেও শুরুর শচিন

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৩, ২১:১৯
১৯৮৯ সালের কথা। করাচিতে চলছে পাকিস্তান-ভারত টেস্ট সিরিজ। পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ বোলিং আক্রমণ সামলাতে টেস্ট শুরুর আগে নেটে নিজেদের ঝালিয়ে নিচ্ছেন ভারতীয় দলের খেলোয়াড়রা। অনুশীলন শেষে সবাই একে একে নেট থেকে বেরিয়ে আসছেন। তবে তখনও একাগ্রচিত্তে অনুশীলন করে চলেছেন ষোল বছর বয়সের এক ‘কিশোর’। এই কিশোরের ব্যাটিং তৃষা যেন মিটছিলই না। অসীম ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়ে সে ব্যাটিং করেই চলেছে! এদিকে গ্রাউন্ডসম্যানরা পড়েছেন দারুণ বিপাকে। টেস্টের জন্য উইকেট প্রস্তুত করতে হবে তাদের। কিন্তু, এই কিশোরের তো উইকেট ছাড়ার লক্ষণই নেই! শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ভারতীয় দলের ম্যানেজার চান্দু বোর্দের শরণাপন্ন হলেন তারা। বললেন, ‘আমাদের টেস্টের জন্য উইকেট তৈরি করতে হবে। দয়া করে আপনার ছেলেটাকে মাঠ ছাড়তে বলুন।’ এই গল্পের পরে কেটে গেছে চব্বিশ বছর। বোর্দের অনুরোধে সেদিন ওই কিশোর বালক নেট ছাড়তে রাজি হয়েছিলেন কিনা আমাদের জানা নেই। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, দুই যুগের ব্যবধানও ক্রিকেটের প্রতি তার মাত্রা ছাড়ানো ভালবাসায় এতটুকু মরচে ধরাতে পারেনি। সময়ের বিবর্তনে কিশোর থেকে আধুনিক ক্রিকেটের রাজাধিরাজে পরিণত হওয়া টেন্ডুলকারের ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে শেষ অনুশীলন সেশন প্রমাণ করলো সেটাই। ব্রায়ান লারার মতো প্রতিভা কিংবা ম্যাথু হেইডেন, ক্রিস গেইলদের মতো আসুরিক শক্তি হয়তো তার নেই। তবে ক্রিকেটকে ভালবেসে দিনের পর দিন একই আবেগ নিয়ে সেই প্রথম দিনের মতো অধ্যবসায় আর পরিশ্রম চালিয়ে যাওয়া কেবল তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। শচিনকে আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে এ ব্যাপারটিই। আজ মুম্বাইয়ে শুরু হতে যাওয়া তার ২০০তম এবং বিদায়ী টেস্টের আগে এই ব্যাটিং কিংবদন্তি সতীর্থদের সঙ্গে গতকাল বুধবার নিজের শেষ অনুশীলনে হোম গ্রাউন্ড ওয়াংখেড়েতেও সেই পুরনো রূপটাই দেখালেন। নির্ধারিত সময়ের একচুল এদিক সেদিক না করে সকাল ঠিক ৯.৫৫ মিনিটে ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি বেয়ে মাঠে নেমে আসলেন তিনি। যেমনটা এর আগেও এসেছেন বহুবার। পঁচিশ বছর আগে এই মাঠেই মাত্র পনের বছর বয়সে রঞ্জি ট্রফি অভিষেক। এরপর ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় তো বটেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও শচিন বহুবার নেমেছেন শেষ টেস্টের ভেন্যু হিসেবে বেছে নেয়া এই মাঠটিতে। স্টেডিয়ামের মাঠকর্মীরাও তাই বহুদিনের পুরনো। তাকে নামতে দেখেই তাই এগিয়ে এলেন অনেকে। এরপর খুবই সংক্ষিপ্ত কিন্তু দারুণ উষ্ণ এক অভিবাদন পর্বও মঞ্চস্থ হলো মাঠের মাঝখানে। বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় রেকর্ডের বরপুত্রের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দিলেন তারা। শচিনও তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে সময় নিলেন না একটুও। বিদায়ী টেস্টের প্রতিটি মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত ফটো সাংবাদিকদের একজনকে ডাকলেন। মাঠকর্মীদের সাথে বন্দী হলেন একই ফ্রেমে। প্রায় পৌনে এগারটার দিকে দুই সহকর্মী সঞ্জয় প্যাটেল এবং কাশি বিশ্বনাথনকে নিয়ে মাঠে এলেন বিসিসিআই সভাপতি এন শ্রীনিভাসন। আলোচনা শুরুর আগে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন শচিনকে। এরপর যথারীতি সেই ব্যাটিং। প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে শেষবারের মতো মাঠে নামার আগে একাগ্রচিত্তে সামলে গেলেন বোলারদের। দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ চোয়াল আর চোখে-মুখে বরাবরের মতোই হার না মানা মানসিকতা। বোঝাই যাচ্ছে শেষ টেস্টেও দারুণ কিছু করেই বিদায় বলতে চান ক্রিকেট মহানায়ক।